রেকর্ড ঘাটতির বাজেটের ১৫.৭% ব্যাংক ঋণ থেকে

আপডেট: জুন ৯, ২০২২, ৮:১০ অপরাহ্ণ

 

সোনার দেশ ডেস্ক:


মহামারীর দুই বছর পেরিয়ে উন্নয়নের হারানো গতি পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশায় নতুন অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ঘাটতি রেখে যে বাজেট অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রস্তাব করেছেন, তার ১৫.৭ শতাংশ তাকে যোগাড় করতে হবে ব্যাংক থেকে ঋণ করে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী কামাল।

এর মধ্যে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা তিনি রাজস্ব খাত থেকে যোগান দেওয়ার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন, যা বাস্তবায়ন করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও তার আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঘাটতির এই পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫.৫ শতাংশ।

মহামারীর আগে প্রায় এক যুগ সরকার ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু মহামারী শুরুর পর থেকে বাড়তি টাকা যোগানোর চাপে গত দুই বছরের বাজেটে তা ৬ শতাংশ এবং ৬.২ শতাংশে পৌঁছায়। এবার তা কিছুটা কমে এলেও আগের মত ৫ শতাংশের মধ্যে থাকল না।

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয় ঋণ করে। সরকার বিদেশি সাহায্য ও বিদেশি ঋণ নিয়ে, দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে ধরা করে, জনগণের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। এবারের বাজেটের পৌনে ৭ লাখ কোটি টাকা খরচ করতে হলে অর্থমন্ত্রীকে ওই অর্থের ৩৮ শতাংশই জোগাড় করতে হবে ঋণ করে।

সেজন্য বিদেশ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৮ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার মত ঋণ করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন কামাল। বিগত বছরগুলোতে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প করার তাগিদে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে বিদেশি ঋণের সুদ দিতে সরকারের রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করতে হয়। আর ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে ডলারের দর চড়ে যাওয়ায় এমনিতেই রিজার্ভ কিছুটা চাপে আছে।

ডলারের সঞ্চয় ধরে রাখতে সরকার বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি কম জরুরি প্রকল্পে অর্থায়ন বিলম্বিত করার নীতি নিয়েছে। এবারের বাজেটে বিদেশের বদলে দেশের উৎস থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও ডলার বাঁচানোর কৌশলের দিকেই ইংগিত করছে। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে, যা মোট ব্যয়ের ১৫.৭ শতাংশ।

এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন কামাল। বাজেটে সম্ভাব্য বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার পরিমাণ ধরা হয়েছে সোয়া ৩ হাজার কোটি টাকা।
ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলে অর্থনীতিতে বাইরে থেকে আসা তারল্য যোগ হয়। তাতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ে। তাছাড়া সেই ঋণের জন্য সরকারকে সুদও গুণতে হয়।

এবার দেশি-বিদেশি ঋণের জন্য ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা খরচ হবে বলে অর্থমন্ত্রী হিসাব ধরেছেন, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। আবার মন্দার দিনে ওই বাড়তি টাকার যোগান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনতে পারে, তাতে স্থবির অর্থনীতিতে গতি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়, মুস্তফা কামাল সেই আশাই করছেন। তার এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন।’

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং বা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বাংলাদেশের বর্তমান বিদেশি ঋণে ‘অস্বস্তিকর’ কিছু না দেখলেও সামনে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের দেখতে হবে, এই ঋণ কতটা উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, কতটা ফল বয়ে নিয়ে আসে।”

আবার ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে তখন ব্যাংকের তারল্যে চাপ বাড়ে। তাতে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, বিনিয়োগ কমে যায়, প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যায়।
আবার সঞ্চয়পত্র থেকে ঘাটতি অর্থায়ন বেশি হলে সরকারকে বেশি সুদ দিতে হয়; কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সেটা মূল্যস্ফীতির উপরে চাপ ফেলে।

সব দিক বিবেচনা করে সেলিম রায়হান বিদেশ থেকেই বেশি ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সরকারকে।
গেল অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ৭৬ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা হয়।

আর ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১২ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা ৯১ হাজার ৮১২ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
গেল অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০ কোটি কোটিতে নামিয়ে আনতে হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ