রেললাইন কেটে নাশকতা

আপডেট: ডিসেম্বর ১৫, ২০২৩, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

অরপরাধীরা যাতে রেহাই না পায়

বুধবার ভোরে দুর্বৃত্তরা রেলের লাইন কেটে দিলে ঢাকাগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এই দুর্ঘটনায় ট্রেনটির প্রায় অর্ধেক লাইনচ্যুত হয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলেও একজনের মৃত্যু ও ১০ জন আহত হন। ট্রেনের গতি কম থাকায় হতাহতের সংখ্যা কম। অন্যথায় ঘটতে পারতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এই ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় আলোচনা হচ্ছে। ভয়ঙ্কর এই নাশকতার ঘটনায় একইসাথে মানুষের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভয় জাগানো এ খবর রেলযাত্রীদের জন্য তৈরি করেছে এক অনিশ্চয়তা। নিরাপদ ট্রেন ভ্রমণের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ওই লাইনের অন্তত ২০ মিটার অংশ কেটে রাখা হয়েছিল। রাতের আঁধারে নির্জন এলাকায় কেউ বা কয়েকজন লোক এ কাজ করেছেন। পরে পুলিশ জানায়, অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাস শিখা দিয়ে লাইনের উভয় পাতই কেটে ফেলা হয়। রেলের পাত এমনিতে ভীষণ শক্ত থাকে। সাধারণ কোনো যন্ত্র দিয়ে সেটি কাটা কঠিন। তবে এ গ্যাস শিখা দুই হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা উৎপন্ন করে। ফলে লাইনটি কাটা সম্ভব হয়েছে। দুর্নাঘটনাস্থলের আশপাশে গ্যাস দুটি সিলিন্ডার পাওয়া যায় গেছে।

কোনোই সন্দেহ নেই এই নাশকতা নির্মম, নিষ্ঠুর এবং খুবই পরিকল্পিত। একসাথে অনেক মানুষের নির্মম মৃত্যুই এই নাশকতার উদ্দেশ্য। বিন্তু দুর্ঘটনার সময় ঘন কুয়াশা থাকায় ট্রেন অপেক্ষাকৃত ধীরে চলছিল। ফলে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এই নাশকতাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটা যে নৃশংস পরিকল্পনার অংশ তা স্পষ্ট। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্থ করাই এর উদ্দেশ্য। সে প্রবণতাও এখনও প্রতীয়মান। নৃশংস নাশকতার পরিকল্পনা এখানেই শেষ নয়- একই দিন অন্য একটি নাশকতা ঘটনা ঘটানোর তথ্য সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। নীলফামারীর ডোমারে রেললাইনের ৭২টি ফিসপ্লেট খুলে নাশকতার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার রাত ১০টার দিকে উপজেলার বাগডোকরা প্রধানপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ডোমার-চিলাহাটিতে প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

নাশকতার দুটো ঘটনাই এক অর্থে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু অন্যভাবে এটাকে অসফলও বলা যাবে না। কেননা এই নাশকতার ঘটনা দেশের মানুষের মধ্যে ভয়-আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। এখন ট্রেন ভ্রমণের কথা উঠলেই আতঙ্কের বিষয়টি সামনে চলে আসবে।

তবে এ নাশকতা নতুন কিছু নয়-  ২০১৩ সালে ব্যাপকমাত্রায় নির্বাচন প্রতিরোধের নামে ব্যাপকভাবে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়েছে। সে ধরনের কর্মকাণ্ড এখনও থেমে নেই। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালে হরতাল-অবরোধ অব্যাহত আছে। এই কর্মসূচির মধ্যেই নাশকতাও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। ২৮ অক্টোবর থেকে বিরোধী দলের টানা আন্দোলনের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় পৌনে চারশ গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। আগুন দেয়া হয়েছে একাধিক ট্রেনেও। তবে রেল লাইনে নাশকতার ঘটনা এই প্রথম।

তবে একটা প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক যে, পূর্বের নাশকতা ও সন্ত্রাসী ঘটনার কোনো বিচার হয়নি কেন? অপরাধীরা সব সময় নেপথ্যে থেকে গেছে। ওইসব অপরাধের শাস্তি হলে নাশকতার ঘটনার লাগাম টেনে ধরা যেতো। ঘটনা ঘটার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়, তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হয় না। কিন্তু বুধবারের রেল লাইনে নাশকতার ঘটনা ভয়ঙ্কর কিছুর ইঙ্গিত দেয়। এই অপরাধের সাথে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সাথে কী উদ্দেশ্যে এই নাশকতা, কে বা কারা এর সাথে জড়িত, কারাই বা এর পরিকল্পনাকারী এ বিষয়ে দেশবাসী জানতে চায়। অপরাধীদের মূল উৎপাটন করতে নাশকতা ও সন্ত্রাসের মূল উপড়ে ফেলতে হবে। সময়টা এখনই।