রোজার ফজীলত

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ:


আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে সে এ মাসের রোজা রাখবে।- (সূরা আল বাকারা-১৮৫) রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা তাকওয়া পরহেজগারি অর্জন করতে পারো।- (সূরা আল বাকারা-১৮৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আল্লাহপাক এই মাসে (রমজানে) রোজা ফরজ করে দিয়েছেন এবং এর রাত্রিতে তারাবিহ সুন্নাত করেছেন। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি ইমানের সাথে সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজান মাসে রোজা রাখবে তার পূর্বকৃত সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।
‘রোজা’ ফার্সি শব্দ। আরবিতে রোজাকে সাওম বলে। সিয়াম সাওম শব্দের বহুবচন। সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ও যৌন তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলা হয়। প্রত্যেক বোধসম্পন্ন, বয়সপ্রাপ্ত (বালেগ) ও সুস্থ নর-নারীর ওপর রমজানে রোজা রাখা ফরজ। ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক বনী আদমের আমলের নেকি দশ গুণ থেকে সাত শত গুণের বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ পাক বলেন, কিন্তু রোজা ব্যতিত। কেননা রোজা আমার জন্যই আর আমি নিজে তার প্রতিদান দেব। সে আমারই জন্য আপন প্রবৃত্তি ও খানা-পিনা ত্যাগ করে। রোজাদারের দুটি খুশি। একটি খুশি ইফতারের সময় আর অপরটি তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। নিশ্চয় রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশক অপেক্ষা অধিক সুগন্ধময় ও পছন্দনীয়। রোজা দুনিয়ায় শয়তানের আক্রমণ এবং পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার ঢাল। সুতরাং যখন তোমাদের কারো রোজার দিন আসে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং অনর্থক শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, সে যেন বলে, আমি একজন রোজাদার।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোজা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে দিনে খাদ্য গ্রহণ ও কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে বাধা দিয়েছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।
রোজার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে আরও একটি হাদিস উল্লেখ করছি। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক বস্তুর জাকাত রয়েছে, আর শরীরের জাকাত হল রোজা।
হাদিস শরিফে আছে রোজাদার ব্যক্তি দুটি খুশি অর্জন করবে। একটি রোজার ইফতারের সময়, আরেকটি কেয়ামতে আল্লাহর দিদারের সময়।
রোজার নিয়তের মাসায়েল
ক্স রমজানের রোজার জন্য নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত ব্যতিত সারাদিন পানাহার ও যৌন তৃপ্তি থেকে বিরত থাকলেও রোজা হবে না। ক্স মুখে নিয়ত করা জরুরি নয়। অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে। তবে মুখে নিয়ত করা উত্তম। ক্স মুখে নিয়ত করলেও আরবিতে হওয়া জরুরি নয়। বাংলা ভাষায়ও নিয়ত করা যায়। নিয়ত এভাবে করা যায়- আরবিতে- নাওয়ায়তু বিসাওমিল ইয়াওমি অথবা বিসাওমি গাদিন নাওয়ায়তু অথবা নাওয়ায়তু আন আসূমা গাদাম মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি। বাংলায়- আমি আজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। ক্স সূর্য ঢলার (দ্বি প্রহরের) দেড় ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত রমজানের রোজার নিয়ত করা যায়। তবে রাতেই নিয়ত করা নেওয়া উত্তম। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ১ম খ-) ক্স নিয়ত করার সাথে সাথেই রোজা শুরু হয় না। বরং রোজা শুরু হয় সুবহে সাদেক থেকে। তাই নিয়ত করার পরও সুবহে সাদেকের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার ও যৌনকর্ম জায়েজ। ক্স যদি খাস করে রমজানের রোজা বা ফরজ রোজা বলে নিয়ত না-ও করে, শুধু এতটুকু নিয়ত করে যে, আজ আমি রোজা রাখব অথবা রাতে মনে মনে বলে যে, আগামীকাল আমি রোজা রাখব, তবে তাতেই রমজানের রোজা সহিহ-শুদ্ধ হবে। ক্স রমজান মাসে অন্য যে কোনো রোজার নিয়ত করা হোক না কেন, তা বর্তমান রমজানের রোজা হিসেবেই গণ্য হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রোজার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের তাওফীক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী