রোহিঙ্গাদের জাতিসত্ত্বা নির্মূলে মায়ানমার ।। জাতিসংঘ কতটা নিরব, কতটা সরব?

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০১৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মুলের চেষ্টা করছে মিয়ানমার। বাংলাদেশের কক্সবাজারে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কার্যালয়ের প্রধান জন ম্যাকিসিক বিবিসি বাংলার এক সাংবাদিককে এ কথা বলেছেন। জনাব ম্যাকিসিকের বক্তব্য দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশ পেয়েছে।
জনাব ম্যাকিসিকের বক্তব্য মতে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষী পুলিশ যৌথভাবে রোহিঙ্গাদের শাস্তি দিচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী পুরুষদের হত্যা করছে, তাদের গুলি করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করছে এবং এই লোকদের নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করছে।
জাতিসংঘ প্রতিনিধির বক্তব্যের মধ্যেই মায়ানমারের নৃশংসতা ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রই ফুটে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধ সংগঠনে যে সব অপরাধকে গণ্য করা হয় তার সবগুলোই মিয়ানমার বাহিনী এখন করছে। অথচ খুবই পরিতাপের বিষয় যে, এই নৃশংতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক এখনো উচ্চকিত নয়। মানবাধিকারের ধ্বজাধারি দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো রহস্যজনকভাবে নিরবতা পালন করে চলেছে। যে মুহূর্তটা সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন ওইসব পীড়িত মানুখগুলোকে রক্ষা করারÑ তখনই এ ধরনের নিরবতা মানবিক বিপর্য়য়কে নিরব সমর্থন বললে কি ভুল হবে? মানবিক বিপর্যয় নিয়েও যে রাজনীতি হয়- মায়ানমারের যুগের পর যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর চালিয়ে আসা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে।
বিশ্ব মানুষের অধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘের অনেক সাফল্য আছে। কিন্তু কখনো কখনো এই সংস্থাটির অসহায়ত্ব খুবই প্রণিধানযোগ্য। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারেও জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বিশ্ব সংস্থাটি এখনো দাঁড়াতে পারেনি। আর পারেনি বলেই দীর্ঘ ২৫ বছরেও রোহিঙ্গা শরণার্খী সমস্যাটি সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। এই সমস্যাটির সমাধান হলে আজকের রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার নৃশংসতা আমাদের দেখতে হতো না। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিজেদের দুর্বলতাই প্রকাশ করেছে।  বর্তমান সমস্যা মোকাবিলায় যেখানে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করে মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানে বাধ্য করা উচিৎ, কিন্ত তা না করে তারা বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে গ্রহণ করার জন্য।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া দূরের কথা বরঞ্চ বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পুশ ইন করার চেষ্টা করেছে মিয়ানমার। দেশটির সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক।
বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা শুধু মানবেতর জীবন-যাপনই করছে নাÑ তারা নানা ধরনের দেশবিরোধী কার্যকলাপেও জড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশি নাগরিক সেজে তারা বিদেশে গিয়েও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে চলেছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা এখন ‘গোদের ওপর ফোড়া’ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ সমস্যাই ২৫ বছর ধরে সমাধান হচ্ছে নাÑ তারপরে নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণ বাংলাদেশকেই ভয়ঙ্কর সঙ্কটের মধ্যে ফেলবে।
জাতিসংঘের প্রতিনিধির দাবি অনুযায়ী মায়ানমার সেনাবাহিনী একটি জাতিসত্ত্বাকে নির্মূলে সব ধরনের নৃশংসতা চালাচ্ছেÑ তবে কেন মায়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক স্বার্থে ছোটখাটো ব্যাপারে বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়- মিয়ানমার মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়ে যাওয়ার পরও কেন নিষেধাজ্ঞা জারি হয় না?  বিশ্ব বিবেক কেন মানবিক বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে নিরব থাকবে? জাতিসংঘকেই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। দায়সারা গোছের বিবৃতি-বক্তব্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বিশ্ব ফোরামে বিষয়টিকে দ্রুত এজেন্ডায় এনে রোহিঙ্গাদের জীবন, সম্পদ ও তাদের মাটির অধিকার সুরক্ষাই হবে এই মুহূর্তের কাজ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ