রোহিঙ্গা সমস্যা ধর্মীয় না সম্পদ কুক্ষিগত করা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭, ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


রোহিঙ্গা বিষয়টি আবার দেশের সকল স্তরে, সকল মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবারের ন্যায় গত আগস্ট মাসে রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে আবারও নৃংশংসতার শিকার হয়েছে। চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল মেশিনারিজ সেনাবাহিনী যখন দানব হয়ে ওঠে সেখানে সাধারণ নাগরিকদের জীবনধারণ করা দুঃসাধ্য। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী নাসাকা ও সেনাবাহিনী বর্বরোচিত নৃশংস হামলা চালাচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা বিরল। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে কী ঘটছে, সেই সমস্ত কাহিনী পর্যন্ত বিশ্ব গণমাধ্যম গুলি সুস্পষ্টভাবে জানে না। মিয়ানমার সরকার বিশ্বের কোনো গণমাধ্যমকেই রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। বিশ্বের গণমাধ্যমগুলি এরকম ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে কী করছে? তার দৃশ্যত কোনো প্রতিবাদ দেখা যায় না। বিশ্বের সকল গণমাধ্যমের উচিত মিয়ানমারের অন্যান্য সংবাদ বর্জন করা। গোটা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় রোহিঙ্গা বিষয়টি বিষফোড়ে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া জুড়ে প্রতিবাদী আলোচনা সভা, বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, কিন্তু রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিকার দেখা যায় না।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইস বুক ব্যবহারকারীরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায়। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি এক প্রকার ঘৃণা এবং বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ স্ট্যাস্টাসও দিচ্ছেন অনেকেই। তাছাড়া অনেকে ফেইসবুক ব্যবহারকারী শারীরিকভাবে মোকাবেলা করতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের সাথে যে সংঘর্ষ চলছে তা কি ধর্মীয় দাঙ্গা? মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলেও মুসলমানরা বাস করছেন। এরকম ভাবে ধর্মীয় প্রলেপ দেয়ার পেছনেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্বার্থ অন্তর্নিহিত। মিয়ানমারের এই বিষয়টি তাদের দেশের জাতিগত বিদ্বেষ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক একটি চক্র রোহিঙ্গা বিতাড়ন বিষয়টি ধর্মীয় প্রলেপ দিয়ে মূলঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহ করার প্রয়াস চালাচ্ছে।
মিয়ানমারের উদ্ভুত পরিস্থিতি আজ হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় নি। এটা বহুদদিন আগে রোপিত একটি বৃষবৃক্ষের ফল। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে দুইটি সম্প্রদায়ের বাস ছিল প্রাচীনকাল থেকে- একটি মগ, অন্যটি রোহিঙ্গা। মগেরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্ভি আর রোহিঙ্গারা মুসলিম। তবে ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৪৩০ সাল থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা প্রদেশটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওয়াফা এ রাজ্য দখল করে মিয়ানমারের অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে সমগ্র মিয়ানমার অর্থাৎ তৎকালীন বার্মা বৃটিশ শাসনাধীন হয়ে যায়। বৃটিশরা তৎকালীন বার্মায় ১৩৯ টি জাতিগোষ্ঠির তালিকা প্রস্তত করে আর সেই তালিকা থেকে বাদ পড়ে রোহিঙ্গাদের নাম। একটি সূত্র থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের শেষ লগ্নে রোহিঙ্গা সমস্যাটির সৃষ্টি হয়েছিল রোহিঙ্গাদের দ্বারাই। ১৯৪৬ সালে রোহিঙ্গারা বৃটিশদের নির্দেশনানুযায়ী বৌদ্ধ-মুসলিম সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়। বৃটিশদের ধারণা ছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বেযুদ্ধে জাপানিদের জয়কে স্বাগত জানাতে পারে আরাকানের বৌদ্ধরা। সেই ধারণার আলোকে বৃটিশরা ১০ মাইলের একটি বাফার জোন নির্দিষ্ট করে সেখানকার অভিবাসী রোহিঙ্গাদের লেলিয়ে দেয় বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে। কথিত আছে যে, সেই সময় এক সপ্তাহের রোহিঙ্গা নৃশংসতায় প্রায় ১০ হাজার বৌদ্ধ নিহত হয়। বৃটিশ প্ররোচনায় রোহিঙ্গা জনপদকে প্রথম এভাবেই রক্তের প্রান্তর গড়ে তোলে রোহিঙ্গরাই। এই রক্তাক্ত হাঙ্গামায় বৌদ্ধদের হাতে ৫ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ হারায়। আর এভাবেই দুই ধর্মপালনকারী জনগোষ্ঠির মাঝে বিবাদের সূত্রপাত শুরু যা আজও বিদ্যমান। ওই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতার সংঘর্ষের বীজ বৃটিশরাই রোপায়িত করে রেখে যায়। আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর বার্মা বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করলেও গণতন্ত্রের এই যাত্রা বেশিদূর এগুতে পারেনি। গণতন্ত্রের আমলে মিয়ানমারের পার্লামেন্ট রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। নে উইন মিয়ানমারের রাজনীতি থেকে গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেয়। যার ধারা আজও পর্যন্ত বিদ্যমান। বৃটিশদের করা ১৩৯ টি জাতিগত সম্প্রদায়ে রোহিঙ্গাদের নাম না থাকায় তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করে নেয় সামরিকজান্তা মিয়ানামারের ১৯৪৬ সালের ঘটনার পর থেকে মগ ও রোহিঙ্গা দুই গ্রুপের মধ্যে বারবার সংঘর্ষ হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির আদিবাসীরা নানা নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার। তবে সারা দুনিয়ার আদিবাসীর নিগৃহনের হিসাবে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর অন্যতম নিগৃহিত জনগোষ্ঠি কারণ গত ষাট বছর যাবত এই গোষ্ঠির ওপর চলছে পাশবিক অত্যাচার। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের ফলে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্ব হারায়। তারা নিজভূমে হয়ে যান কারাবন্দি। মিয়ানমারে ১৩৯ টি জাতি তাদের নাগরিকত্বর স্বীকৃতি পেয়েছে একমাত্র রোহিঙ্গা ব্যতিত। কেন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পেল না? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক নানা ধরনের সম্মেলন বিশ্বে হচ্ছে তাছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আলোচনা অনুষ্ঠিতও হচ্ছে নিয়মিত তাহলে কেন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ক বিষয়টির নিষ্পত্তি হলো না। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকার বিষয়ক চার্টারের স্পষ্ট বলা আছে প্রতিটি মানুষের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়। ১৯৮২ এই দক্ষিণ এশিয়া বা পূর্ব এশিয়ার অঞ্চলে ধর্মকে কেন্দ্র করে বা ধর্মীয় ইস্যুতে কোনো সংঘাত হয়নি। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণের ফলে মিয়ানমার মানবাধিকার লংঘন করেছে। ১৯৬২ সালের পর থেকে নানা কায়দায় মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলছে। মিয়ানমার সরকার গণতন্ত্র ও রোহিঙ্গা অধিকারসহ কতিপয় বিষয়ে মানবাধিকার পরিপন্থি কাজ করে আসছে ১৯৬২ সাল থেকে। উল্লিখিত বিষয়গুলির প্রতিকারের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সমুহ তখন কি কোনো প্রতিবাদ করেছিল? বা আজও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সমুহের উল্লেখ করার মত কোনো ভূমিকা আছে কি? রোহিঙ্গা ইস্যুটি ধর্মীয় মোড়কে নিয়ে এর কোন প্রকার প্রতিকার করা যাবে না।
রাখাইন প্রদেশের ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলটি মিয়ানমারের সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদের এলাকা। এখানার ভূ অভ্যন্তরে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ আর এই সম্পদকে ঘিরে রয়েছে নানা কূট রাজনৈতিক চাল। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কোন রাষ্ট্রই রোহিঙ্গা বিষয়ের সমাধানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে না। রোহিঙ্গা অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে যতদূর জানা গেছে, মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং বিপণন করার কাজে ৬০ ভাগ লিজ নিয়েছে চিন এবং পাকিস্তান আর বাকি ৪০ ভাগ ভারতের কোম্পানি। সুতরাং পুরো বিষয়টিকে যারা একটি ধর্মীয় আবরণে ঢাকছেন তারা একটু ভাবছেন না, পাকিস্তান নিরব কেন? হিসাবে দেখা যায়, রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা বিশ্ব করপোরেটের রোষানলে পতিত।
২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা অঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে বেশির ভাগ তরুণকে হত্যা করেছে এবং তরুণীদের ধরে নিয়ে গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যানুযায়ী জানা যায়, এ বারে শরণার্থী হিসাবে যারা বাংলাদেশে আসছে তার বেশিরভাগই বৃদ্ধ ও শিশু।
বাংলাদেশ সরকার এর মধ্যেই কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় দিয়েছে। এমনতিই বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি তারপর এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামলানো একটু কষ্টসাধ্য বিষয়। রোহিঙ্গা বিষয়ে পশ্চিমা দাতা গোষ্ঠি এবার সরব। বাংলাদেশকে আর্থিক সহযোগিতার করার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল ইতোমধ্যেই অর্থ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ধরনের আর্থিক সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অঞ্চলটি করপোরেট পুঁজিওয়ালাদের লালসার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে তাই রোহিঙ্গারা আজ উদ্বাস্ত। এই উদ্বাস্তুতা বিষয়টির সমাধান না করে, দান বা অনুদান দিয়ে রোহিঙ্গা বিষয়ক সংকটকে আরো ঘনীভুত করাই হবে। আন্তর্জাতিক মহল বিশেষের দান অনুদানের ফলে বাংলাদেশে সাময়িক অর্থপ্রাপ্তি ঘটবে কিন্তু দীর্ঘ স্থায়ী একটি সমস্যার স্থায়ী রূপ নিবে এই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা। বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় অস্থিরতা লেগেই আছে, এই উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা নানা কায়দায় তিনজেলায় বসতি ঘরে তুলবে। যা বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতি রূপ নিবে। কোটি কোটি টাকার বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে নষ্ট করে দেবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সহায়তা না করে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিয়ে গিয়ে সহায়তা করুন। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ আবাসস্থল মিয়ানমারে থাকার ব্যবস্থা গড়ে দিন।
লেখক:- কলামিস্ট