রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ কি আদৌ হবে ?

আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


সম্প্রতি বাংলাদেশ বার্মা সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজিবি কোস্ট গার্ড পুলিশ সদা সতর্ক বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী নৌকায় করে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে প্রায় গত তিনমাস ধরে। প্রতিদিনই বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মীরা এদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ প্রায় ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এদের ভবিষ্যত কী হবে তার কোন সঠিক নির্দেশনা দিতে পারছে না আর্ন্তজাতিক মহল। ফেরত পাঠিয়ে দেয়া উদ্বাস্তুদের ভাগ্যে কী ঘটছে তা কেউ বলতে পারবে না। কারণ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়টা যে কতটা অমানবিক তা বিশ্বের সর্বমহলই অনুমেয় কিন্তু প্রতিকারে কোন ব্যবস্থা কেউ নিচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের আদি ইতিহাস সম্পর্কে যা জানা যায়, সপ্তম -অষ্টম শতাব্দিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উদ্ভব হয়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বর্তমান রাখাইন স্টেটের উত্তরাংশে বসবাস করা একটি জনগোষ্ঠি। রাখাইন প্রদেশটির এক সময়ের নাম ছিল আরাকান। প্রাচীন এই আরকান নামটি পরির্বতিত হয়ে রোহিং প্রদেশ হয়। এই প্রদেশে দুইটি সম্প্রদায়ের বসবাস একটি মগ আরেকটি রোহিঙ্গা। মগেরা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী আর রোহিঙ্গারা মুসলিম। রোহিং বা রাখাইন স্টেটের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠি হলো রোহিঙ্গা। ইতিহাস পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, অষ্টম শতাব্দিতে আরবদের আগমনের মধ্য দিয়ে আরাকানে মুলমান বসবাস শুরু হয়। আরব বংশোদ্ভুত এই জনগোষ্ঠিরাই রোহিঙ্গা। ধর্ম বিশ্বাসে এরা অধিকাংশই মুসলমান। এই অঞ্চলের বসবাসরত মুসলিম জনপদই পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বিভিন্ন মতাদর্শ থেকে জানা যায় যে, প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচীয় মুসলমান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চাটগায়ে, রাখাইন, বার্মিজ, আরকানি, বাঙালি প্রভৃতি জাতির সংমিশ্রন ঘটে রোহিঙ্গা প্রদেশে। ত্রয়োদশ শতাব্দিতে রোহিঙ্গারা একটি পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। রোহিঙ্গা নামকরণে নানা কথা প্রচলিত আছে যেমন, অষ্টম শতাব্দিতে আরব বণিকদের জাহাজ  সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়েছিল আর ঝড় থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নেয়া লোকজন বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি, সেই থেকে রোহিঙ্গা শব্দটি এসেছে। আরকান রাজসভায় বাঙালি সাহ্যিতিক কবিদের খুব সমাদর ছিল। ওই রাজসভার বাঙালি লেখকরা রাজ্যটিকে রোসাং বা রোসাঙ্গ বলে অভিহিত করেছে। পরির্বতী সময়ে নানা প্রক্রিয়ায় এর নাম রোহিঙ্গায় পরিণত হয়েছে। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত বর্তমান  মিয়ানমারের ২২ হাজার বর্গমাইল এলাকাটি  ছিল স্বাধীন রোহিঙ্গা রাজ্য। ১৭৮৯ সালে বার্মার রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করলে তা তৎকালীন বার্মার অন্তর্ভুক্ত হয়। তারপর বৃটিশ অধীন হয়ে যায় অঞ্চলটি।  ১৯৪৮ সালে বার্মা বা মিয়নমার স্বাধীনতা লাভ করলে তা মিয়ানমারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। তবে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত বিরোধ সৃষ্টি করে বৃটিশরা। বৃটিশদের সেই পুরানো কৌশল জাতিকে ‘বিভক্ত কর এবং শাসন কর’ পদ্ধতির মাধ্যমে। বৃটিশ শাসনাধীন বার্মায় ১৩৯টি ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠিকে সংখ্যালঘু হিসাবে অভিহিত করে একটি তালিকা প্রকাশ করে তৎকালীন সরকার। তালিকাভুক্ত সংখ্যালঘুদের বার্মার  নাগরিক হিসাবে  রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়। এই তালিকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির নাম ছিল না। পরবর্তী সময়ে আর এই তালিকা রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্তও করা হয়নি। ফলে রোহিঙ্গা বার্মায় উদ্বাস্তু হিসাবে চিহ্নিত হয়। প্রায় ছয় যুগের বেশি সময় চলমান এই অমানবিক বিষয়টি নিরসনে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি আর্ন্তজাতিক সংস্থাগুলোর তরফ থেকে। মানবাধিকারের নিয়মানুসারে, কোন দেশে কোন ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করলে সে দেশের নাগরিক হিসাবে গন্য হবে। ন্যূনতম এই ধারাটি আমলে নিলেও দেখা যায়, বর্তমানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা যে জনগোষ্ঠি আছে তারা সবাই জন্মসুত্রে মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমার সরকার নাকি এদেরকে বাঙালি মুসলমান হিসাবে আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদসূত্র থেকে জানা যায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটি বিষয়। ধর্ম পালনকারী হিসাবে এই অমানবিক বিষয়টি বিবেচনায় না নেয়াটাই ভালো- কারণ তাহলে সাম্প্রদায়িকতাটা আরো বেশি ঘোলাটে রূপ ধারণ করে। জাতিসংঘসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে অনুরোধ করছেন এই শরণার্থীদেরকে আশ্রয় দেয়ার জন্য, বাংলাদেশকে এ ধরনের অনুরোধ করাটা ঠিক না। বাংলাদেশ কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। মিয়ানমারের বিষয়টি মিয়ানমারে নিষ্পত্তি না করে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ করাটাও একটা হীন কূটকৌশল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপিও সরকারকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে রোহিঙ্গারা মুসলিম এই হিসাবে বাংলাদেশ সরকারকে আশ্রয় দেয়ার আহবান বিএনপির। রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে  রাজনীতির ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের কোন কৌশল হিসাবে নিচ্ছে বিএনপি। রোহিঙ্গা বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে দেখার কারণে অমানবিক বিষয়টির সঠিক সমাধান হচ্ছে না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ১৯৪৮ সাল থেকে। এই দীর্ঘ সময় এই সমস্যাটি নিরসনের নামে যা করা হচ্ছে তাতে নিরসনের চাইতে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি করতে দেখা যায়, অনেক মহলকে ব্যস্ত থাকতে। তবে মিয়ানমারে জাতিগত সংঘাত নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। অর্ধশতাব্দী ধরে চলতে থাকা জাতিগত দাঙ্গা বর্তমানে আরো বেড়েছে। বিগত  থেইন সেইনের সরকার ৮ টি জাতিগোষ্ঠির সাথে একটি সমঝোতা করে চলমান দাঙ্গা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে এই সমঝোতাটা কতটুকু স্থায়ী  হবে তা দেখার বিষয়। দেশটি পরস্পর দাঙ্গায় লিপ্ত রয়েছে প্রধান প্রধান ১১ টি জাতিগোষ্ঠি। তাছাড়া কিছু কিছু ছোট ছোট জাতির মাঝেও জাতিগত দ্বন্দ্ব এখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। গত  নির্বাচনে অনেকে প্রদেশের জনসংখ্যা কম এমন ধর্মাবলম্বনকারীরা ভোটার হতে পারেনি। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা অন্যতম। মিয়ানমারে ৪১ লক্ষ মুসলমান ধর্মালম্বী ভোটার ভোট দিতে পারেননি তাই তাদের কোন প্রার্থীও ছিল না। অনেকেই মনে করেন, গত নির্বাচনে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। অংসান সুচির দল বিজয়ী হয়েছে। সুচি কি দেশের মানুষের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে আইনি কাঠামো রয়েছে তা আদৌ গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়। পার্লামেন্টের মোট আসনের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য। সামরিক বাজেট এবং তার আয় ব্যয় সম্পর্কিত কোন বিষয়ে সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাছাড়া দেশেটির প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন সেনা সদস্যরা, এই মন্ত্রণালয়গুলোতে সাধারণ পার্লামেন্ট সদস্যরা মন্ত্রী হতে পারবে না। এটা সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত একটি সরকার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। মিয়নমারের সংবিধান মতে সংবিধান সংশোধন করতে হলে কমপক্ষে চার ভাগের তিন ভাগ সদস্যর সম্মতি লাগবে। অংসান সুচির দল গত নির্বাচনে ৩৪৮ টি আসন পেয়েছে আর সংবিধান সংশোধন করার জন্য দরকার ৪৯৮ টি আসনের। তবে সেনা বাহিনীর বাইরে বিভিন্ন ছোট ছোট প্রাদেশিক দল ১০০ টি আসন পেয়েছে। অংসান সুচি কি সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিবেন ? মিয়ানমারে কি সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র আসবে? যদি সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র আসে তাহলে বিবাদমান সংকটের সমাধান হবে। ভারত নানা জাতি গোষ্ঠির ভাষা ও ধর্মের বসবাসকারী মানুষের একটি আবাস স্থল। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা পরিস্থিতি বার্মার চেয়ে হাজার গুণ ভালো। আর এই ভালো থাকার কারণ ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। বিদ্যমান সংবিধানে মিয়ানমারে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পাবে না। সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মিয়ানমার যদি আসতে না পারে তবে চলমান সহিংসতা নিরসন সম্ভব না। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমার সরকারকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করার জন্য চাপ দেয়া। জাতিসংঘসহ বিশ্বের যে সকল মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে তাদের উচিত মিয়ানমারের সর্বাগ্রে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালু করার পদক্ষেপ নেয়া। কারণ মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কারণেই রোহিঙ্গারা নির্যাতিত। বিশ্ব নেতৃত্বের উদাসিন্যতা ও খামখেয়ালিপনার কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি গত পৌণে একশ বছরেও মিমাংসা হয় নাই। তাছাড়া ১৯৮২ সালে যখন বার্মায় আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। তখন বিশ্বসম্প্রদায় কেন নিরব ছিলেন? ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সামরিক জান্তার অত্যাচারে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। তারপর প্রতিবছরই কোন না কোনভাবেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটছে তবে ২০১২ সালে ব্যাপক সংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলাদেশে। যা বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে থাকে। এ ধরনের  অনাহুতদের অনুপ্রবেশের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃংখলা মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়।  তাই বাংলাদেশ সরকার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন কিন্তু এই কঠোরতা দেয়াল ভেঙ্গে শুনা যাচ্ছে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কি রোহিঙ্গা ইস্যুটি কি জিইয়ে রাখছেন আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়। এটাও কি ভূ-রাজনীতির কোন কৌশল ? ছয় যুগের বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে আর্ন্তজাতিক মহল আদৌ কী কোন কার্যকরি  পদক্ষেপ নিবেন কিনা তা এখন দেখার বিষয়।
লেখক : কলামিস্ট