লারার ৩৭৫ ও ৫০১ রানের সাক্ষী যারা

আপডেট: জুন ৬, ২০২০, ২:৩০ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


১৯৯৪ সালের ৬ জুন। এজবাস্টনে বিকেল যখন সাড়ে ৫টা, থমকে দাঁড়াল যেন সময়। জন মরিসের বল বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে ব্রায়ান লারা পা রাখলেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে আগে পা পড়েনি কোনো মানব সন্তানের। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম পাঁচশ রানের ইনিংস!
লারার সেই অপরাজিত ৫০১ রানের ইনিংসের ২৬ বছর পূর্ণ হলো শনিবার। তবে লারার ক্যারিয়ারের অবিশ্বাস্য সেই সময়ের কেবল অর্ধেকই বলা হলো এতে। এই ইনিংসের মাস দেড়েক আগে যে টেস্টেও ৩৭৫ রানের বিশ্বরেকর্ড তিনি গড়েছিলেন!
লারার ব্যাটে চুরমার হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা দুই রেকর্ড। টেস্টে ৩৬৫ রানের আগের রেকর্ডটি স্যার গ্যারি সোবার্স করেছিলেন ১৯৫৮ সালে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে হানিফ মোহাম্মদ ৪৯৯ রানের ইনিংস খেলে রান আউট হয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে।
লারার অবিস্মরণীয় কীর্তি মাঠে বসে দেখেছেন, এমন কয়েক জনের স্মৃতিচারণায় পরে সেই সময়টিকে ধরার চেষ্টা করেছিল ‘উইজডেন’ সাময়িকী। সেখানে লারার দলের কোচ, পক্ষে-বিপক্ষের ক্রিকেটার, স্কোরার, সাংবাদিকদের কথা যেমন ছিল, ছিল লারার নিজের কথাও।
বব উলমার
(বলা হয়, বব উলমারই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১৯৫৯ সালে হানিফ মোহাম্মদের ৪৯৯ ও ১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৫০১ মাঠে বসে দেখেছেন। হানিফের ইনিংসের সময় ১১ বছর বয়সী উলমার গিয়েছিলেন মাঠে খেলা দেখতে। লারার ইনিংসের সময় উলমার ছিলেন ওয়ারউইকশায়ারের কোচ)
“হানিফ মোহাম্মদের রেকর্ড যেভাবে দেখেছিলাম, পুরো ব্যাপারটিই ছিল পাগলাটে। আমি তখন টনব্রিজ স্কুলে পড়ি (ইংল্যান্ডে)। বাবা কাজ করতেন করাচিতে। ঘটনাক্রমে ওই সময়টায় করাচিতে গেলাম। হানিফ যেদিন রেকর্ড গড়েন, সেদিন বাবা কাজে যাওয়ার সময় আমাকে মাঠে নামিয়ে দিয়ে যান। হানিফ তখন রেকর্ডের দিকে এগোচ্ছেন।”
“আমার বয়স তখন এগারোর মতো, খুব বেশি কিছু মনে নেই। এটুকু মনে আছে, বেশ দর্শক ছিল মাঠে। ম্যাটিং উইকেটে খেলা হচ্ছিল। আউটফিল্ড খুব বাজে ছিল। আর মনে পড়ে, কেউ একজন রান আউট হলেন (৪৯৯ রানে রান আউট হয়েছিলেন হানিফ)। ফেরার পথে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘খেলায় কি হলো?’ আমি বললাম, ‘কেউ একজন ৪৯৯ রানে আউট হয়েছে।”
“লারার ইনিংসের স্মৃতি তুলনায় যথেষ্টই তরতাজা। লাঞ্চের সময় (শেষ দিন, লারা যখন অপরাজিত ২৮৫ রানে) ব্রায়ান আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রেকর্ড কত?’, আমি বললাম, ‘৪৯৯, তুমি কি তাড়া করবে?’ ব্রায়ানের তখন জিজ্ঞাসা, ‘আমরা কি ইনিংস ঘোষণার কথা ভাবছি?’ ডারমট রিভ (অধিনায়ক) বলল, ‘অনেকটা সেরকমই ভাবনা আমাদের, দেখা যাক কোন দিকে এগোয়।’ এরপর সবাই মিলে ঠিক করলাম, ওয়ারউইকশায়ারের রেকর্ড ৩০৫ পর্যন্ত অন্তত তাকে যেতে দেওয়া হবে।”
“পরে আমি রিভকে বললাম, ‘তাকে সুযোগটা দেই, যতদূর যেতে পারেৃ।’ এতটাই একমনে ব্যাট করছিল সে, রেকর্ডটিকে মনে হচ্ছিল অবধারিত। আমার মনে হয় না, ইনিংসটির কোনো একটি শটের কথা আলাদা করে বলতে পারব। আমার স্রেফ মনে পড়ে ৫০১ করার পর তার মুখটা। পরে সে তার ফ্রন্ট ফুট পুল শটের একটি ছবিতে অটোগ্রাফ দিয়ে আমাকে উপহার দিয়েছিল। সেখানে লিখেছিল, ‘এই শট শেখানোর চেষ্টা করো কোচ, আমি তা বাঁধিয়ে রাখব।”
(সংযুক্তি: হানিফ মোহাম্মদের ৪৯৯ রানের ম্যাচে খেলেছিলেন তার ছোট ভাই অলরাউন্ডার মুশতাক মোহাম্মদ। লারার ৫০১ রানের ইনিংসের সময় মুশতাক ছিলেন বার্মিংহামেই, তার অফিসে। লারা ৪৫০ পেরিয়ে যাওয়ার পর একজনের ফোন পেয়ে তিনি মাঠে ছুটে গিয়েছিলেন, তবে ততক্ষণে খেলা শেষ। অল্পের জন্য তিনি স্বাক্ষী হতে পারেননি ইতিহাসের।)
অ্যালেক্স ডেভিস
(১৯৯০ সাল থেকে ওয়ারউইকশায়ারে স্কোরার হিসেবে কাজ করছিলেন ডেভিস। ১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও পালন করেছিলেন স্কোরারের দায়িত্ব। তাই ধারণা করা হয়, লারার ৩৭৫ ও ৫০১ রানের ইনিংসের প্রতিটি বলই দেখা একমাত্র ব্যক্তি ডেভিস)
“আমার কাজের দিক থেকে, দুটি ম্যাচ ছিল পুরো ভিন্ন। ৩৭৫ রানের ম্যাচে আমি স্কোরিং করেছি খাতা-কলমে। ৫০১ রানের ম্যাচে কম্পিউটারে ও খাতা-কলমে, একসঙ্গে করতে হয়েছে দুটিই। খাটুনি হয়েছে দ্বিগুণ। এই ম্যাচে লারা যে গতিতে রান করছিলেনৃ তার প্রতি ৫০ রানে সাংবাদিকদের ফোনে আমরা বিস্তারিত জানাচ্ছিলাম। একজন বললেন, ‘ফোনটা না রাখি, পরের ৫০ তো হয়েই যাবে এক্ষুনিৃ!’ এতটাই ব্যস্ত সময় ছিল।”
“কম্পিউটারে স্কোরিং করতে খুব সমস্যা হচ্ছিল না, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তো হচ্ছিল অনেক কিছুই। কিন্তু স্কোরশিটে জায়গার সমস্যা হয়ে যাচ্ছিল। ৩৭৫ রানের ম্যাচে সৌভাগ্যক্রমে লারার আগের দুই ব্যাটসম্যান ফিল সিমন্স ও স্টুয়ার্ট উইলিয়ামস আউট হয়ে গেছে ৮ ও ৩ রানে। স্কোরশিটে ওদের জায়গাগুলোও লারার জন্য কাজে লাগিয়েছি। কিন্তু ৫০১ রানের ম্যাচে অন্যরাও রান করছিল, তাই জায়গা খুঁজে বের করতে হয়েছে।”
“আমি যতদূর জানি, দুটি ইনিংস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা একমাত্র ব্যক্তি আমিই। ৫০১ রানের ম্যাচে শেষ দিন অনেকেই মাঠে আসেনি, সবাই ধরেই নিয়েছিল ম্যাচ নিষ্প্রাণ ড্র হবে। লারার রেকর্ড তো কারও কল্পনায়ও আসার কথা নয় (লারা দিন শুরু করেছিলেন ১১১ রান নিয়ে)। তাছাড়া, পরদিনই ওভালে ওয়ানডে কাপের সেমি-ফাইনাল ম্যাচ, সেটির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল অনেকে। ৩৭৫ রানের ইনিংসটার সময় ইংল্যান্ডের ম্যানেজার ছিলেন যিনি, ওয়ারউইকশায়ারে লারাকে চুক্তিবদ্ধ করেছিলেন যিনি, সেই মাইক স্মিথ মাঠে ছিলেন না সেদিন। আমার স্ত্রী ক্রিস্টিন, সে নিজেও ছিল স্কোরার, সাধারণত একটি বলও মিস করে না, ৩৭৫ রানের ইনিংস পুরোটাই দেখেছিল। কিন্তু ৫০১ রানের দিন ছিল না মাঠে। ওকে ফোন করে জানাইনি বলে অবশ্য আমার ওপর দিয়ে পড়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল!”
অ্যান্ডারসন কামিন্স
(ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলার। লারার দুই ইনিংস নিয়ে তার দুই রকম অভিজ্ঞতা। ৩৭৫ রানের ইনিংসে তিনি ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বাদশ ব্যক্তি, ড্রেসিং রুম থেকে দেখেছেন ইংলিশদের দুর্দশা। ৫০১ রানের ইনিংসে তিনি ছিলেন লারার প্রতিপক্ষ ডারহামে, এবার নিজেই দুর্দশার শিকার। তার বোলিং ফিগার ছিল ২৮-১-১৫৮-২)
“সিডনিতে লারার ২৭৭ রানের ইনিংসটি (১৯৯৩ সালে) দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম, যাবতীয় রেকর্ড ভাঙার সামর্থ্য তার আছে। সে ছিল এমন একজন, যে সবসময় সেরা হতে চাইত। সেরা হতে চাইলে তো রেকর্ডের চূড়ায় থাকতে হবেই!”
“ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে লারা দারুণ ফর্মে ছিল। ৩৭৫ রানের ইনিংসটার উইকেট ছিল একদমই নিষ্প্রাণ, সে পণ করেছিল বড় কিছু করার। আমার মনে হয় না, ইংলিশদের করার খুব বেশি কিছু ছিল। যে ধরনের সামর্থ্য তার ছিল ও যে প্রতিজ্ঞা নিয়ে নেমেছিল, তাকে আউট করা কঠিন ছিল।”
“সে শুরু করেছিল ধীরে ধীরে, কিন্তু খুব আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল শুরু থেকেই। খুব বেশি বল মিস করেনি। মাঠে ফাঁক খুঁজে বের করার ক্ষমতা তার সহজাত। সময়ের সঙ্গে আরও ভালো খেলছিল। তার ডাবল সেঞ্চুরি পর্যন্ত রেকর্ডের কথা আমার মাথায় আসেনি। পরে আমরা সবাই চাচ্ছিলাম, সে যেন এটা করতে পারে। আমরা আগেই সিরিজ জিতে গেছি। জানতাম, রেকর্ডটি সে খুব করে চায়।”
“৫০১ রানের ম্যাচে আমরা শুরুতে তার বিপক্ষে খুব ভালো বল করেছিলাম। সুযোগও সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। প্রথম বলেই তাকে আউট করতে পারতাম। সে যে ধরনের ব্যাটসম্যান, আমি জানতাম যে শর্ট বল পেলে সে মারার চেষ্টা করবে। প্রথম বল ঠুকে দিলাম, তার ব্যাটের মাথায় লেগে আমার দিকেই এলো বল। কিন্তু অল্পের জন্য হাতে পেলাম না। ১২ রানের মাথায় বোল্ড করলাম লেগ স্টাম্প ইয়র্কারে। কিন্তু এবার ‘নো বল।’ ১৮ রানে ক্যাচ পড়ল উইকেটের পেছনে। ঘণ্টা দেড়েক উইকেটে কাটানোর পর সে দুর্দান্ত খেলতে শুরু করল।”
“এরপর তাকে থামানো কঠিন ছিল। আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর একজনকে আটকানো সহজ নয়। মাঠের বাউন্ডারিও বেশ ছোট ছিল। তবে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তার স্ট্যামিনা দেখে। তার সামর্থ্য আছে, এটা জানতাম। কিন্তু এত লম্বা সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা ও ক্রমাগত শট খেলা যাওয়া ছিল অসাধারণ ব্যাপার।”
“আমার মনে হয় না কেউ বলবে যে রেকর্ডটি আমরা তাকে উপহার দিয়েছিলাম। কেউ হাল ছাড়েনি, ঝিমিয়ে পড়েনি। আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছি তাকে থামাতে।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ