লালপুরের পদ্মার চরে সবুজ ফসলে কৃষকের হাসি

আপডেট: মে ২৬, ২০২১, ৯:৪৫ অপরাহ্ণ

লালপুর প্রতিনিধি:


লালপুরের নওসারা-সুলতানপুর চরে আঙ্গুরের বাগান পরিচর্যা করছেন কৃষক নাহিদ হোসেন

নাটোরের লালপুরের বিলমাড়িয়ায় পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা চর সবুজে ভরে উঠেছে। প্রমত্ত পানির স্রোত আর ভাঙ্গনের গর্জন নেই এখানে। হাজার হাজার বিঘা জমিতে শোভা পাচ্ছে সবুজের সমারোহ। ফুলে-ফলে ভরা ফসলের মাঠ কৃষকের মুখে হাসি আর মনে আনন্দ ছড়াচ্ছে। এক সময়ে সর্বনাশা পদ্মা নদীর ভাঙনে নি:স্ব কৃষক পরিবারগুলো সুখের স্বপ্ন দেখছে। এখানে উৎপাদিত সবজি এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে রফতানি করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সত্তরের দশকে লালপুর উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী বিলমাড়িয়া, লালপুর ও ঈশ্বরদী ইউনিয়নের ১৮টি গ্রাম সর্বনাশা পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে হাজারো পরিবার নি:স্ব হয়ে যায়। আশির দশকে পদ্মার বুকে চর জেগে ওঠা শুরু হয়। এসব চরে বাদামের আবাদ দিয়ে শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আজ ফল ও সবজিতে স্বপ্ন সত্যিকারেই সুখের আলো দেখাচ্ছে।
চরে নতুনভাবে শুরু হয়েছে বসতি। বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে বাসিন্দারা। দেখে বোঝার উপায় নেই এখান দিয়ে পদ্মা নদী প্রবাহিত ছিল।
চরের বুকে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত শরীর বটবৃক্ষের নিচে বসে শীতল হাওয়ায় জড়িয়ে নিচ্ছে কৃষক। শীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে গুড় হচ্ছে। বাঁশ বাগানের মাথার উপর দিয়ে মায়েরা কোলের বাচ্চাকে এখন চাঁদ দেখাচ্ছে। সত্যিকারের অপরূপ সাজে সেজেছে পদ্মার চর।
সরেজমিন বুধবার (২৬ মে) লালপুরের চরে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার নীমতলী, লালপুর, দিয়ার শংকরপুর, নওসারা সুলতানপুর, আরাজি বকনাই, সেকেন্দারপুর, চাকলা বিনোদপুর, রসুলপুর, মোহরকয়া আংশিকসহ সকল চরেই আবাদ হচ্ছে।
লালপুর কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পদ্মার চরগুলোতে মুলা, কুমড়া, গাজর, টমেটো, কপি, পুঁই শাক, লাল শাক, ধেড়স, ধুইমী, করোলা, পটল, বেগুন, কলাসহ নানা সবজি। চাষ করা হচ্ছে আখ, বাদাম, ধান, গম, সরিষা, মটর, মশুর, পাট নানা ফসল। নতুনভাবে শুরু হয়েছে পান চাষ। এছাড়াও গড়ে উঠেছে আম, পেয়ারা মাল্টা, বরই, বেদানা ফলের বাগান।
নওপাড়া গ্রামের কৃষক নাহিদ হোসেন (৩৫) জানান, আড়াই বছর আগে যশোর থেকে চারা এনে মাল্টার চাষ শুরু করেন। নিজের তিন বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ করছেন। এছাড়া বেদানা, সারা বছর ধরে আম, পেয়ারা, কলাসহ সব ধরণের সবজি চাষ করেন তিনি। মজনু ও মুকুলের ২০ বিঘা করে মাল্টা চাষ রয়েছে। জমির খাজনা চালু না থাকায় কৃষকের ভাগ্যে জোটে না কৃষিঋণ। সরকার বিভিন্ন সময় কৃষকদের প্রণোদনা দিলেও প্রকৃত কৃষকরা সঠিকভাবে পাই না। তিনি আরো বলেন, কৃষি কর্মকর্তারা খোঁজ খবর নেন না। তাই তারা সঠিক সময়ে পরামর্শ না পাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
পানসিপাড়ার কৃষক উজ্জল উদ্দিন (৩২), নওপাড়ার বেলাল হোসেন (২৯), গোলাম মোস্তফা (৫৫) জানান, এবারে প্রায় ৪শ কৃষক কুমড়া চাষ করেছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে কুমড়ার চারা রোপণ করা হয়। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে কুমড়ার বাজারজাত শুরু হয়। প্রতি বিঘা জমিতে কুমড়া চাষে খরচ হয় প্রায় কুড়ি হাজার টাকা। কুমড়া বিক্রি হয় ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, চরে উৎপাদিত ফসল পরিবহনের জন্য রাস্তা জরুরী। রাস্তা ভাল না হওয়ায় উৎপাদিত ফসল পরিবহনে বেশি খরচ হয়। কুমড়া মাথায় করে বাজারে আনতে ৩-৪ টাকা পড়ে যায়। পরিবহনে আনলে ২ টাকার লাগবে। চরের জমি এখন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েছে কিন্তু সরকারি কোন সহযোগিতা আমরা পাইনি।
সবজি ব্যবসায়ী আলাল উদ্দিন (৪৭), কৃষক জানবার খাঁ (৫৮), মুক্তার হোসেন (২৫) জানান, বিলমাড়ীয়া বাজারে প্রতিদিন সকাল ৫টা থেকে কুমড়ার হাট বসে। বিলমাড়িয়া, পানসীপাড়া, নওপাড়া, শহীদ আকবর আলী সড়ক (কয়লার ডহর) এলাকা থেকে বাস-ট্রাক, ইঞ্জিন চালিত ভ্যান, সাইকেলে করে চরের উৎপাদিত বিভিন্ন সবজিসহ বরই, পেয়ারা, কলা রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, খুলনা, বরিশাল অঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিয়ে যায়। বিলমাড়িয়ার মোল্লার ঘাট ও বাজার ঘাটে ব্রিজ নির্মাণ করা হলে কৃষকদের উপকার হবে। এলাকার উন্নয়নের এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শ্রমিক শাকিল হোসেন (১৮), জাহানারা খাতুন (৬২), জুবেদা (৯), শিমুল আলী (১৮) জানান, চরে ইদুরের উপদ্রব অনেক বেশি হয়েছে। সেই সাথে ফল-সবজি চুরি করে নিয়ে যায়। মাঠ পাহারার কোন ব্যবস্থা নেই।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম জানান, পদ্মা নদীর চরে কয়েক হাজার একর জমিতে সব ধরণের ফল-ফসলের চাষ হচ্ছে। প্রায় এক’শ বিঘা জমিতে মাল্টা বাগান গড়ে উঠেছে যা নাটোর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এখন চলছে এ চরে কুমড়ার মৌসুম। গতবারের চেয়ে কুমড়া চাষ কমেছে, বেড়েছে পটল ও মাল্টা চাষ। তাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের খোঁজ খবর না নেওয়ার অভিযোগ সঠিক না বলে জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ