লিখন শৈলীর বিবর্তন

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ

সাইফুদ্দীন চৌধুরী


আদিম মানব গোষ্ঠী সুদূর প্রাচীনকালে তাদের জীবনযাত্রার কাহিনী লিপিবদ্ধ করে গেছে গাছের বাকলে, পাথরের উপরে, পশুচর্মের উপরে এবং অন্যান্য মাধ্যমে। সেকালের মানুষেরা উদ্বুদ্ধ হতো মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, সামাজিক মূল্যবোধের, সমাজের মঙ্গলামঙ্গল কাজকর্মে এবং অতি প্রাকৃতে। পরিবারের সবাই যাতে সমাজে কিছু না কিছু অবদান রাখতে পারে সেজন্য ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দেয়া হতো। সন্তান-সন্ততিকে সব সময়ে সমাজের পরিবারের আত্মীয়-স্বজনের, ক্ল্যানের ও ট্রাইবের যাতে ভালো হয় তাই শিক্ষা দেয়া হতো। তবে এই শিক্ষা লিখিত পদ্ধতির ছিল না। লিখিত পদ্ধতির পড়ালেখা তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তখন লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়া হতো উপদেশ, পরামর্শ, আলাপ, আলোচনার মাধ্যমে। খেলাধুলা ও পারিবারিক বিভিন্ন প্রয়োজনের খাতিরে শিশুরা অনেক কিছু শিক্ষা করতো। বয়ঃপ্রাপ্তির পর বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের উপদেশ, পরামর্শ দেয়া হতো, কাহিনী শোনানো হতো। এই মানুষেরা একে অপরকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতো। নানা রকমের গৃহস্থালি শিল্পোপরকরণ তৈরি, মৃৎপাত্র প্রস্তুত, বস্ত্র বয়নের কাজ করার সময় মেয়েরা মেয়েরা কিংবা পুরুষেরা পুরুষেরা একে অপরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতো। সন্ধ্যার পর অন্ধকার গাঢ়তর হলে তখন তারা আগুনের কু-লী জ্বালিয়ে গালগল্পে জায়গাটি মুখর করে তুলতো। এই ভাবে প্রাগৈতিহাসিককালের সেই মানুষেরা একে অপরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতো, নতুন নতুন অবস্থা ও ব্যবস্থার কথা শুনে। এই ছিল সেই আদিম মানুষের লেখাপড়া ও অভিজ্ঞতা অর্জনের ভিত্তি।
লিখন শৈলীর প্রচলন ছাড়া যে সভ্যতার বিস্তার সম্ভব নয়, সে কথা ঠিক নয়। তবে একথা সত্য যে, লেখার আবিষ্কারের ফলে সভ্যতা দ্রুততর হয়েছে। এই লেখা আবিষ্কার নিয়ে নানা লোকবিশ্বাস দেশে দেশে ছিল। আয়ারল্যান্ডের লোকদের বিশ্বাস ছিল, তাদের কৃষিদেবতা ওভগোমিওস, স্ক্যান্ডিনেভীয়নদের ধারণা ওদিন দেবতা, মিসরবাসীদের ধারণা তথ দেবতা এবং গ্রীকদের ধারণা ক্যাডামাস দেবতা তাদের মধ্যে লিখার প্রবর্তন করেছিল।
প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ তো ছিল ছোট ছোট কৌমে বিভক্ত এদের সবদিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে চলতে হতো। এসময় তারা মুখের ভাষা দিয়েই নিত্য দিনের কাজকর্ম মোটামুটি চালিয়ে নিত। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যখন কৌমের আয়তন ক্রমান্বয়ে বেড়ে গেল; তখন খাদ্যের জন্য কেবলমাত্র প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা সম্ভব হলো না। কৌমের প্রয়োজনে তারা শুরু করলো পশু পালন, কৃষি এবং গৃহস্থালি শিল্পের। অবস্থার এই পরিবর্তনের কারণেই পার্শ্ববর্তী কৌমগুলির মধ্যে শুরু হলো পণ্য বিনিময় প্রক্রিয়া। কৌমের প্রয়োজনেই শুরু হয় গণনা করে হিসাব-নিকাশ করা। এই সময় থেকেই সংখ্যা সম্পর্কে মানুষের ধারণা সৃষ্টি হয়, সংখ্যা হিসেবে তারা কিছু কিছু চিহ্ন ব্যবহার করতে শুরু করে। এই চিহ্নে ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন উপকরণ। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু এবং পশ্চিম আফ্রিকার আদিবাসীদের মধ্যে গণনার উপকরণ হিসেবে দড়ির মধ্যে গাঁট বাঁধার প্রথা চালু ছিল। খ্যাতনামা গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডেটাস লিখেছেন যে, পারস্য স¤্রাট দানিয়ুস এ ধরনের কৃৎকৌশল ব্যবহার করতেন। প্রাচীন মিসরীওদের মধ্যেও গাঁট বাঁধার রীতির প্রচলন ছিল। অষ্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার লোকেরা গণনার উদ্দেশ্যেই এক ধরনের খাঁজকাটা লাঠি ব্যবহার করতো। এই লাঠির মাধ্যমে তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সংবাদ বা নির্দেশাদি পাঠাতো। বলা যায়, লেখার ক্রমবিকাশের ইতিহাসের এটিই প্রথম পর্যায়।
লেখার ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো চিত্রাঙ্কন। এই চিত্রাঙ্কন রীতিরও শুরু হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগে, যখন আদিম মানুষ ছবি আঁকত গুহার দেয়ালে, প্রস্তর খ-ের গায়ে, হাড়ের উপর এবং হাতির দাঁতের উপর। এই চিত্রকর্ম কখনও শত্রু নিধনের দৃশ্য, কখনও পশু শিকারের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। মুখের কথা দিয়ে এই সব স্মৃতিকে ধরে রাখা যেত না বলে তার চিত্রের মধ্যে দিয়ে তা ধরে রাখতো। অনেক সময় ক্রিয়াকর্মের ওপর যাদুশক্তি সঞ্চয় করবার উদ্দেশ্যও নিহিত থাকতো ওই চিত্রাঙ্কনের ভিতর। সেই সময় আদিম মানুষের কাছে আরেকটা বড় প্রয়োজন ছিল এই রেখা, চিত্র বা চিত্রলিপির যার মাধ্যমে দূরের লোকদের কাছে সহজে সংবাদ পাঠানো যেত। কখনও ওই চিত্রলিপি আন্তঃকৌম চুক্তি সম্পর্কিত দলির রচনার মাধ্যম চিত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই চিত্রলিপি পরবর্তী পর্যায়ে চিত্র প্রতীক বা ভাবচিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এগুলিকে বলা যায় চিত্রের সঙ্কেত রূপ।
বলাবাহুল্য, এ চিত্রলিপিতে চিত্রিত মূল প্রাণীর বা বস্তুর সঙ্গে সাদৃশ্য খুব অল্পই থাকতো। তবে এই সঙ্কেত চিহ্নগুলির মধ্য দিয়েই দর্শকদের মনে মূল প্রাণী বা বস্তু সম্পর্কে ধারণা জন্মাত। এইভাবে ক্রমান্বয়ে চিত্রলিপিগুলি মূলের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় এবং এক সময় ওই প্রতীক চিহ্নগুলি বিবর্তিত হয়ে শব্দ বা শব্দাংশের প্রতিনিধিত্ব শুরু করে। এভাবেই একসময় চিত্রলিপি পরিণত হয় ধ্বনিলিপিতে। আর এই ধ্বনিলিপি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে বর্ণমালার। একথা সত্য যে, চিত্রলিপি বর্ণমালায় উত্তরণ ঘটতে সময় লেগেছে অনেকÑ প্রক্রিয়ার পর্যায়গুলিও ছিল খুব দুঃসাধ্য রকমের। সবাই চিত্রলিপি থেকে বর্ণমালায় পৌঁছতে পারেনি। মিসরীয়রা লিপির ক্রমবিকাশের ধারায় বর্ণমালা অব্দি পৌঁছতে পারেনিÑ তারা গ্রীকদের কাছ থেকে বর্ণমালা আত্মীকরণ করেছিল। চিনা এবং জাপানিরা আজ পর্যন্ত কোন বর্ণমালাই আবিষ্কার করতে পারেনি। তারা লেখাপড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ধ্বনিলিপির সাহায্যে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা চেহারার বর্ণমালা দেখে মনে হতে পারে, বিভিন্ন দেশে পৃথক পৃথক বর্ণমালা উদ্ভাবিত হয়েছিল। আমাদের মনে হয় কথাটি ঠিক নয় (যদিও বিষয়টি এখনও গবেষণা সাপেক্ষ)। সম্ভবতঃ আদি একটি কেন্দ্র থেকে এটি পর্যায়ক্রমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেই আদি বর্ণমালা ছিল প্রাচীন সেমিটিক সভ্যতার দান। ফিনিসীয় বণিকরা তাদের পণ্যের সাথে ওই বর্ণমালা পৃথিবীর নানা দেশে রফতানি করেছে। গ্রীক জাতি ফিনিসীয় বণিকদের কাছ থেকে যে বর্ণমালা পেয়েছিল, প্রতœতত্ত্বে এর বহু প্রমাণ আছে। গ্রীকদের কাছ থেকে প্রাচীন রোমানরা ওই বর্ণমালা নিয়ে তাতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে ২৬টি রোমান হরফের প্রচলন করে। বলাবাহুল্য, সেই রোমান হরফই বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার সমস্ত ভাষার বর্ণমালা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের এই উপমাহাদেশে প্রাচীন যুগের চিত্রলিপি, প্রতীকলিপি বা ধ্বনিলিপির কোন নমুনা পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে মোহেন-জোদারো এবং হরপ্পায় পাওয়া গেছে এক ধরনের অক্ষর সংবলিত সীলÑ যা উপমহাদেশের প্রাচীনতম লিপি হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু এই সীলের আজ অব্দি পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। আমাদের অনুমানে এই ‘সীল’ থেকেই খরোষ্ঠী হয়ে প্রাচীন ভারতীয় লিপি ব্রাহ্মীলিপির উদ্ভব হয়েছে। আর আজ একথা সর্বজন বিদিত যে এই ব্রাহ্মীলিপি থেকেই এসেছে বাংলা বর্ণমালা। একটি কথা এখানে বলে রাখি তা হলো, স¤্রাট অশোকের শাসন আমলে প্রচলিত এই ব্রাহ্মীলিপির একটি প্রাচীন নমুনা একদা আবিষ্কৃত হয়েছিল বগুড়া জেলার মহাস্থান প্রতœপীঠ থেকে আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে।