লোকসানে উত্তরাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ পল্লী বিদ্যুৎ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৭, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



লোকসানে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। বেড়েই চলেছে প্রতি অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ। অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ পথে বিদ্যুৎ চুরি এবং অবাধে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খোয়া যাওয়ার কারণে সমিতিগুলোতে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘অবাধ’ দুর্নীতি।
‘না লাভ না ক্ষতি’-নীতিতে পথচলা শুরু করে সমিতিগুলো। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সমিতিগুলো লোকসান ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ বলে মনে করেন বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা। বর্তমানে সমিতিগুলো পিডিবির ঋণ ও সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে চলছে। আর লোকসানের কারণে বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর লাভের মুখ দেখেনি রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। জেলার ছয়টি উপজেলায় এক লাখ ৯১ হাজার ৮৮৭ সংযোগ রয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে রাজশাহী পবিসের লোকসান ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। ২০১৩-১৪ তে লোকসান ১৯ কোটি ১২ লাখ ২৪ হাজার ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে লোকসান হয় ১৯ কোটি ১৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। গ্রাহক ও জনবল বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজশাহী পবিসের লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এদিকে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সমিতির লোকসান ১৬ কোটি ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের ৭৮টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে লোকসানে রয়েছে ৬৩টি। এ অর্থবছরে সমিতিগুলো ৫২০ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। এসব সমিতির অধিকাংশই রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। দেশের সবচেয়ে লোকসানি পবিস হচ্ছে বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এরপরেই রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, ঠাকুরগাঁওসহ আরো কয়েকটি সমিতির স্থান।
এদিকে প্রতিবছর বিপুল লোকসানের কারণ সম্পর্কে রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া সমিতির কর্মকর্তারা বলেন, তারা পিডিবির কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় লোকসান বাড়ছে। এ ছাড়া সরকারের অগ্রাধিকার এই খাতকে এগিয়ে নিতে দ্রুত লাইন সম্প্রসারণ ও সংযোগ বাড়াতে গিয়ে লোকসান বাড়ছে।
তবে পিডিবির এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো লাইন সম্প্রসারণ ও সংযোগের ক্ষেত্রে কোনো নকশা অনুসরণ করছে না। আর চুরিও হচ্ছে অবাধে। এর ফলে লোকসান বেড়ে চলেছে। রাজশাহী পবিসের জেনারেল ম্যানেজার এসএম মোজাম্মেল হক বলেন, বেশি দামে পিডিবি থেকে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকপর্যায়ে বিক্রি করতে গিয়েই এই লোকসান।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। মাত্র সোয়া লাখ গ্রাহকের এই সমিতি আগের বছরগুলোতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লোকসান দেয়। সমিতির জিএম হাসান শাহনেওয়াজ বলেন, তার সমিতি এলাকায় সেচ সংযোগ বেশি হওয়ায় সিস্টেম লসে আছে।
অপরদিকে দেশের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে লোকসানের দিক থেকে শীর্ষে বগুড়া পবিস। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বগুড়া পবিসের লোকসান ৪৮ কোটি ১২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ এই হিসাবকে পুরোটাই লোকসান বলতে রাজি নন।
তিনি বলেন, প্রতি বছরই স্থাপনা খাতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ২০১৮ সালের আগে লাভ-লোকসানের হিসাব এভাবে দেখা যাবে না।
অন্যদিকে, নাটোরের দু’টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির লোকসানের পরিমাণ আকাশছোঁয়া। নাটোর পবিস-১ এর লোকসান ২৬ কোটি টাকা ও নাটোর পবিস-২ এর লোকসান ১৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠিত নাটোর পবিস লাভের মুখ দেখেনি। ২০০৯ সালে নাটোর পবিসের সিস্টেম লসের হার ছিল ১৪ দশমিক ১ ভাগ। ২০১৬ সালেও সিস্টেম লস ১৩ দশমিক ৯ ভাগে রয়েছে। নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম বেলাল হোসেন জানান, বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি ও সিস্টেম লস না কমায় সমিতি লোকসান দিচ্ছে। তিনি গ্রাহকপর্যায়ে দাম বাড়ানোর দাবি করেন।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাটোরের দু’টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় রয়েছে কুষ্টিয়া থেকে রাজশাহীর বিস্তীর্ণ এলাকা। দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে নাটোর আর বগুড়া সমিতির অধীনে। এ কারণে লোকসানের দিক থেকে এ দু’টি সমিতি শীর্ষে রয়েছে।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর লোকসানও কমেনি। গত অর্থবছরে পাবনা পবিস-২ এর লোকসান ২৭ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির লোকসান ২৬ কোটি টাকা। এদিকে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রতি মাসে অর্ধকোটি টাকা লোকসান গুনছে। গত অর্থবছরে এই সমিতির লোকসানের পরিমাণ ছিলো ১৫ কোটি টাকা।