শবে কদরেও জেরুজালেমে সংঘর্ষ

আপডেট: মে ৯, ২০২১, ৮:০২ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের কাছে নামাজ আদায়ের সময় ফিলিস্তিনি তরুণদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো ইসরায়েলি পুলিশ

ইসরায়েল অধিকৃত এলাকা থেকে ‘সম্ভাব্য উচ্ছেদ’ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে আগের দিনের ধারাবাহিকতায় শবে কদরেও জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুসলমানদের কাছে পবিত্র রাতে সংঘর্ষস্থলের কাছেই আল-আকসা মসজিদে অনেকেই ‘ইবাদত-বন্দেগি’ করছিলেন।
সংঘর্ষের সময় ফিলিস্তিনি তরুণরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে পাথর ছুড়তে থাকে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ইসরায়েলি দাঙ্গা পুলিশকে এসময় ঘোড়ায় চড়ে শব্দ বোমা ছুঁড়তে দেখা যায়। সেসঙ্গে জলকামানও ব্যবহার করা হয়।
প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, সংঘর্ষে শিশুসহ ৮০ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে একবছর এবং ১৪ বছর বয়সী একটি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিজেদের একজন আহত হয়েছে ইসরায়েলি পুলিশের দাবি।
ফিলিস্তিনি তরুণদের ধাওয়া করে ইসরায়েলি পুলিশের গুলি আর আগুনের ঝলকানি দেখিয়ে প্রাচীন নগরী দামাস্কাস গেইটের কাছে ২৭ বছর বয়সী মাহমুদ আল-মারবুয়া বলেন, “দেখুন তারা কীভাবে আমাদের গুলি করে, আমরা কীভাবে বাঁচব?
“তারা চায় না আমরা প্রার্থনা করি। প্রতিদিনই সংঘাত হবে, প্রতিদিনই সংঘর্ষ বাঁধবে। প্রত্যেকটা দিনই এখানে সমস্যা থাকবেই।”
জেরুজালেমে ইহুদি বসতি স্থাপন করা এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা হতে পারে- এই আশঙ্কায় কয়েকদিন ধরেই শহরটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সীমান্তে অবস্থান নিয়েছেন কয়েকশ ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সেনাদের উদ্দেশ্য করে তারা জ্বলন্ত টায়ার ছুড়ে মারছে এবং বাজি ফুটাচ্ছে। গাজা থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি রকেট খোলা জায়গায় পড়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস নেতা মুসা আবু মারজুক এক টুইটে বলেন, “আমরা আল-আকসার জনগণকে সম্মান জানাই, যারা ইহুদিরাষ্ট্রপন্থীদের ঔদ্ধত্যের বিরোধিতা করেছেন। সেইসাথে ফিলিস্তিনি জনসাধারণকে তাদের ভাইদের সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
ইসরায়েল জানিয়েছে, আল-আকসা মসজিদ এলাকায় গত রাতের সংঘর্ষের কারণে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় জেরুজালেম, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং গাজায় নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উত্তেজনা দমন করতে দুই পক্ষের সঙ্গে মধ্যস্থতা করছে মিশর। শনিবারের সংঘাতের বিষয়টি শুক্রবারের চেয়ে কম আলোচিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শুক্রবার মুসলমান এবং ইহুদি দুই পক্ষেরই পবিত্র স্থান টেম্পল মাউন্ট প্লাজায় আল-আকসা মসজিদের কাছে পাথর ছুড়তে থাকা ফিলিস্তিনি তরুণদের ওপর রাবার বুলেট ছোড়ে ইসরায়েলি পুলিশ।
শুক্রবারের এই সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০৫ জন ফিলিস্তুনি এবং ১৮ জন ইসরায়েলি কর্মকর্তা আহত হন। আন্তর্জাতিকভাবে এই ঘটনার নিন্দা করে শান্তির আহ্বান জানানো হয়।
পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারা এলাকায় রাতে এই সংঘর্ষের শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া ফলিস্তিনি পরিবারগুলো সেখানে উচ্ছেদের হুমকিতে পড়েছে। ইসরায়েলি পুলিশ জানায় শনিবার বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে।
পুলিশ কমিশনার ইয়াকভ শাবতাই বলেন, ‘উপাসনার স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে’ শনিবার জেরুজালেমে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “একই সঙ্গে আমরা কোনো দাঙ্গা, আইন লঙ্ঘন বা পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষতি হতে দেব না। আমরা মুসলমানদের জন্য গুরুত্ববাহী এই দিনটিতে সবাইকে সংঘাত থেকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি।”
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গাজা উপত্যকার কাছে পশ্চিম তীরে সেনা সংখ্যা বাড়ানো হবে। সেখান থেকে ইসরায়েল সীমান্তে ফিলিস্তিনিরা আগুন ধরানো বেলুন পাঠিয়েছে। একজন সেনামুখপাত্র জানান, সেখানে পাঠানো নিরাপত্তা বাহিনীতে বেশিরভাগই হবে দমকল কর্মী।
মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারী চারটি পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য উচ্ছেদ এবং সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে চার পক্ষীয় মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, “ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে আমরা মুসলমানদের পবিত্র দিনগুলোতে সংযম অনুশীলনের এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন পদক্ষেপ এড়ানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছি।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, উপাসনার অধিকার রক্ষায় জেরুজালেমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, আল-আকসার উদ্দেশে যাওয়া মুসলমান পুণ্যার্থীদের বাসগুলোকে জেরুজালেমের পথে প্রধান মহাসড়কের ওপর আটকে দিচ্ছে পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পরলে জেরুজালেমসহ আশপাশের আরব গ্রামগুলো থেকে তরুণরা বেরিয়ে আসে।
তাদের অনেকেই জেরুজালেমের দিকে উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে পায়ে হেঁটে যাওয়া মুসলমান পুণ্যার্থীদের গাড়িতে করে পাহাড়ে উঠতে সহায়তা করেন। এসময় অনেকেই “আমাদের আত্মা এবং রক্ত দিয়ে আমরা আল-আকসাকে মুক্ত করব” স্লোগান দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, যারা দাঙ্গা বাঁধানোর জন্য যাচ্ছিল কেবল তাদেরই আটকে দেওয়া হচ্ছে। অন্য বাসগুলো যেতে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় হাতাহাতিও হয়, ফুটেজে এসময় পুলিশকে শব্দ বোমা ছুড়তে দেখা যায়।
এসব ঘটনায় আগামী কয়েকদিন উত্তেজনা বিরাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। সোমবার শেখ জারা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ নিয়ে ইসরায়েলের উচ্চ আদালতে একটি শুনানি হবে। একই দিনে ১৯৬৭ সালে মধ্য প্রাচ্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের অধিকারে নেওয়ার জেরুজালেম দিবস উদ্যাপন করবে ইসরায়েল।
ফিলিস্তিনিরা চাইছে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। ইসরায়েল দাবি করছে পুরো নগরীটাই তাদের ‘চিরন্তন’ এবং ‘অবিভাজ্য’ রাজধানী। যদিও এর পূর্ব অংশের সংযুক্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ