শব্দের চেয়েও ৭ গুণ বেশি গতিতে ছুটেছে ‘আমেরিকান এক্স-১৫’

আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০২২, ১:০২ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


বাতাসের গতিতে নয়, তার থেকেও বহু গুণ বেশি জোরে ছুটতে পারত। চিরাচরিত বিমানের মতো দেখতে নয় বরং অনেকটা বুলেটের আকারে তৈরি এ যান আসলে একটি রকেট। যার সঙ্গে লাগানো ছিল ককপিট। আর তাতে বসেই চালক উড়িয়ে নিয়ে যেতেন ‘নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫।’ দক্ষ পাইলটের হাতে পড়লে প্রায় সাত গুণ গতিতে ছুটতে পারতো বিমানটি।

নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫ বিমানটি আসলে রকেটচালিত সুপারসনিক বিমান। এক্স-প্লেন সিরিজের অংশ হিসেবে এটিকে যৌথভাবে তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এবং নাসা।

আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে প্রথম আকাশে উড়েছিল ‘নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫।’ এখন পর্যন্ত মানবচালিত বিমানের মধ্যে এই সুপারসনিক বিমানটি সবচেয়ে দ্রæতগতিতে ছুটতে পারতো বলে জানা যায়।

১৯৫৯ সালে প্রথম যাত্রা শুরু করে এই সুপারসনিক। এরপর ৯ বছরে ১৯৯টি ফ্লাইট টেস্ট করা হয় বিমানটির। বিমানটিকে সঠিকভাবে চালানোর জন্য ১২ সদস্যের দক্ষ একটি দল গঠন করা হয়।

যাদের মধ্যে চাঁদে পা রাখা প্রথম মানব নীল আর্মস্ট্রংও ছিলেন।
বিমানটির চালক বিল ডানা বলেন, ‘এটাই হল ‘আসল’ বিমান যা ওড়ে।’
নাসা-র আর্মস্ট্রং রিসার্চ ফ্লাইট সেন্টারের প্রধান ইতিহাসবিদ ক্রিস্টিয়ান গেলজার বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি গতি, সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা এবং সবচেয়ে বেশি ভয় এই তিনটি অনুভূতি একসঙ্গে হতো বিমানটি উড়ানোর সময়।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে পরীক্ষা মূলকভাবে ৬০টি বিমান তৈরি করে মার্কিন বিমান বাহিনীও নাসা। ১৯৫২ সাল থেকে এর উৎপাদন শুরুর সময় এক্স-১৫ সুপারসনিকের গতি ছিল ঘণ্টায় ৭০০ মাইল। গতি ছিল শব্দের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি।

গেলজার বলেন, ‘গতির লক্ষ্যে পৌঁছতে ঝুঁকিও কম ছিল না। এ ধরনের বিমানকে সাধারণ বিমানের তুলনায় আরও উঁচুতে উ়ড়াতে হতো। ভূপৃষ্ট থেকে আড়াই লাখ ফুট উঁচুতে ওড়ানোই লক্ষ্য ছিল আমাদের। আর সেটি যে বড়সড় ঝুঁকি নেওয়া, তা বলার চলে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাশিরায় সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ু যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এই বিমান তৈরির জন্য গবেষণা শুরু হয়।’
জানা গেছে, বিমানের গতির মতোই এর উড়ানোর পদ্ধতিও ছিল ভিন্ন। অন্য বিমানের মতো এটি রানওয়েতে দৌঁড়ে আকাশে উড়ত না।

বরং এটিকে বি-৫২ বোম্বার বিমানের সহায়তায় আকাশে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো।
গেলজার বলেন, ‘দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ড বিমান ঘাঁটি থেকে নেভাদা বা ইউটা-র দিকে ঘণ্টায় ৬০০ মাইলেরও বেশি গতিবেগে উড়ে যেত বি-৫২ বোম্বার বিমান।

এ সময় বিমানটির পেটের নিচে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকত এক্স-১৫। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৫ হাজার ফুট উঁচুতে যাওয়ার পর এক্স-১৫’কে আকাশে ছেড়ে দেওয়া হত। এরপরই ৫০ ফুট লম্বা সুপারসনিক বিমানটির ইঞ্জিন চালু করতেন পাইলট।’

বিমানের মতোই এর জ্বালানীও ছিল অভিনব। তরল অক্সিজেনের সঙ্গে অ্যামোনিয়ার মিশ্রণ ব্যবহার করা হত জ্বালানী হিসেবে।
আর পাঁচটা বিমানের থেকে যে এটি আলাদা, তা বোঝা যায় মিল্ট টমসন নামে এই বিমানটির অপর এক পাইলটের কথায়।

তিনি বলেন, ‘এটাও অন্য বিমানগুলোর মতই আকাশে ভাসত। তবে যখন উপরে উঠতে শুরু করত, তখন মনে হত এটি কারো পরোয়া করে না। যে ক’টা বিমান উড়িয়েছি, তার মধ্যে একমাত্র এই বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে স্বস্তি পেতাম।’

রানওয়েতে নামার ক্ষেত্রেও ভিন্ন চরিত্র দেখা গিয়েছিল এ সুপারসনিকের। রানওয়ে ছোঁয়ার জন্য বেশির ভাগ বিমান ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতিতে প্রস্তুতি নেয়। তবে এক্স-১৫ তা শুরু করত ২০ হাজার ফুট উঁচুতে।

প্রায় ২০০টি উড়ানে মাত্র দু’বার জরুরি অবতরণ করতে হয়েছে এই সুপারসনিককে। ১৯৬৭ সালে দুর্ঘটনায় পড়লে মাইকেল অ্যাডামস নামে বিমানটির এক চালক নিহত হন।
ওই দু’টি দুর্ঘটনাকে বাদ দিলে এক্স-১৫’ মাত্র ৯ বছরের জীবদ্দশায় তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে আকাশের পথ ছেড়ে দেয় নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫। তবে অবসর নেওয়ার আগের বছর একটি রেকর্ড গড়ে নেয় বিমানটি। যা আজও অক্ষত। সে বছর এই সুপারসনিকের ককপিটে বসেছিলেন পিট নাইট নামে এক পাইলট।

তিনি বিমানটিকে উড়িয়েছিলেন ঘণ্টায় ৪ হাজার ৫২০ মাইল বা শব্দের ৬.৭ গুন বেশি গতিতে।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ