শহরের ৮২ শতাংশ শিশু নির্যাতনের মুখে ।। উদ্বেগজনক পরিস্থিতির শেষ কোথায়?

আপডেট: ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

তথ্য খুবই উদ্বেগজনক যে, দেশের শহরাঞ্চলের ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮২ শতাংশের বেশি শিশু মানসিক আগ্রাসন কিংবা শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা, ইউনিসেফের এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সোমবার দৈনিক সোনার দেশে প্রকাশিত হয়েছে।
শিশুদের নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, সমস্যা চিহ্নিত হচ্ছে, বড় বড় পরিকল্পনা হচ্ছেÑ সর্বোপরি শিশদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য আইন আছে কিন্তু শিশুদের দুরবাস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। শিশু নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি অর্জন করা যায় নি। এই ব্যর্থতার অবস্থান আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য একটি অন্যায় সংস্কৃতির চর্চাকে অব্যাহত রেখে চলেছি। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির শেষ কোথায়?
সোনার দেশে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শহরাঞ্চলে শিশুদের অবস্থা নিয়ে পরিচালিত ওই জরিপে ১৭.৬ শতাংশ শিশু মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় বলে উল্লেখ করা হয়। জরিপে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের প্রায় ৩৩ শতাংশ বিবাহিত।
মূলতঃ শহরাঞ্চলে শিশুদের স্বাস্থ্যগত, সামাজিকসহ নানা বিষয়ের দিকে আলোকপাত করা হয়। জরিপে বাংলাদেশের ৭ টি বিভাগীয় শহরের তথ্যও পৃথকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বস্তিবাসী শিশুরা তুলনামূলক বেশি শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হলেও বস্তির বাইরের শিশুদের মধ্যেও এই সংখ্যা কম নয়। বস্তিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং বস্তিবাসীর বাইরে ৮২ শতাংশ শিশু শাস্তির মুখোমুখি হয়।
কিন্তু আমরা তো সকলেই শিশুদের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যত গড়তে চাই। এই প্রত্যাশার সাথে অমিলটা কোথায়? বড়দের আচরণ শিশুদের প্রতি কি শোভন নয়? নিশ্চিতভাবেই তাইÑ যদি নাই হবে তা হলে কীভাবে এতো বিপুল সংখ্যক শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে?
এটা ঠিক যে, আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে শিশুদের শাসনের নামে নির্যাতনে ঐতিহ্য আছে। এটা কোনো সভ্য দেশে না থাকলেও দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে আছে। সমাজ যাকে সমর্থন করে তা যে আইন প্রয়োগ করেও যে তা সহজে মানানো যায় নাÑ বাংলাদেশ তার একটি উদাহরণ বটে। যেমন বাল্য বিয়ের ব্যাপারে আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাল্যবিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ সামাজিক এই সূচকে বিব্রতকর অবস্থায় আছে।
পরিবারে শিশুদেরকে শাসনের অংশ হিসেবে মারধর করাটা সামাজিকভাবেই স্বীকৃত। কথা না শুনলে বা পড়তে না বসলে দু এক ঘা বসিয়ে দেয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। শিশুদের ব্যাপারে এই যে বোধ তার মনস্তাত্বিক কারণ রয়েছে। অভিভাবকরা মনে করেন, শিশুদের শাসন বা মারধর না করলে তাকে সঠিকভাবে ‘মানুষ’ করা যাবে না। আর এই মানুষ করার জন্য শাস্তিটা যত কঠোরই হোক না কেন তা অভিভবাকগণ মেনে নেন। আরো উদ্বেগজনক ব্যাপার এই যে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নির্যাতন সমর্থন করেন এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। শিশুদের ব্যাপারে সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনো দৃঢ়ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একে শুধু আইন দিয়ে বা নীতিমালা প্রণয়ন করে শিশুদের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। মানসিকভাবে এর পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যদি শিশুর জন্য মানসিক ও শারীরিক শাস্তির সংস্কৃতির অবস্থানে বদ্ধমূল থাকে তবে সেটিই হবে আঘাত করার মোক্ষম জায়গা। এ ব্যাপারে সরকারের কর্মসূচি- কৌশল থাকতে হবে। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।  কথিত ‘মানুষ’ করার জন্য যে নির্যাতনের সংস্কার গড়ে উঠেছে তাতে যে শিশুর মধ্যে মানসিক বৈকল্য তৈরি করতে পারে সেই ম্যাসেজ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। শিশুর সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণ করা প্রত্যেকটি মানুষের দায়িত্ব। সেই দায়বোধও এখন তৈরির সময়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ