শহিদ জায়া জাহানারা জামান স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৭, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

তসিকুল ইসলাম রাজা



বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)-এর রক্তবন্ধু, অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহচর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং রাজশাহীর গর্ব, গণমানুষের প্রাণপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান (১৯২৩-১৯৭৫) এর জীবনসঙ্গিনী মহীয়সী নারী জাহানারা জামান রোববার মধ্যরাতে (১.২০মি.) ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তাঁর কনিষ্ঠপুত্র এএইচএম এহসানুজ্জামান স্বপন (১৯৬১)-এর ধানম-িস্থ বাসায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নাল্লিাহে…রাজেউন)। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই জ্যেষ্ঠপুত্র বিশিষ্ট রাজনীতিক ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক সফল মেয়র জননেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (১৯৫৯) ও তাঁর স্ত্রী বিশিষ্ট সমাজসেবী শাহীন আকতার রেনী রাতেই ঢাকায় যান।
উল্লেখ্য, কামারুজ্জামান সাহেব ১৯৫১ সালে বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া থানা বর্তমানে উপজেলার চামরুল গ্রামের বিশিষ্ট জোতদার আশরাফ উদ্দীন তালুকদারের কন্যা জাহানারা বেগমকে বিবাহ করেন। তাঁদের চার কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান। তাঁর কন্যারা হলেন, ফেরদৌস মমতাজ পলি (১৯৫৩), দিলারা জুম্মা রিয়া (১৯৫৫), রওশন আক্তার রুমি (১৯৫৭) ও কবিতা সুলতানা চুমকি (১৯৬৪)।
শহিদ কামারুজ্জামান রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জের জমিদার হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬)-এর পৌত্র এবং আবদুল হামিদ মিয়া (১৮৮৭-১৯৭৬)-এর পুত্র। ছাত্র জীবনেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর দাদা বৃটিশ আমলে দুবার অবিভক্ত বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য (এমএলসি) নির্বাচিত হন। তাঁর পিতা আবদুল হামিদ মিয়াও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। কামারুজ্জামান হেনা মিয়া ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ল’ পাসের পর রাজশাহী জজকোর্টে আইন ব্যবসায় যোগদান করেন এবং ওই বছরেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। যেমন- আইন ব্যবসায় তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেন। তেমনি রাজনীতির অঙ্গনেও খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেন। তিনি জীবনে কোন নির্বাচনেই কখনো পরাজিত হন নি। তিনি বঙ্গবন্ধুর নিকট সান্নিধ্যে আসেন এবং ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য অবদান জাতির জীবনে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেসা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তেমনি- আমাদের জাতীয় নেতা শহিদ কামারুজ্জামান-এর রাজনৈতিক জীবনে জাহানারা জামান একই ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫১ সালে কামারুজ্জামান-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনের পর থেকে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত তিনি সংসারের ঘানি টেনেছেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও কামারুজ্জামান সাহেব অত্যন্ত সৎ, আদর্শম-িত ও নীতিবান মানুষ ছিলেন। যে কারণে এতো বড় মাপের রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও ঢাকায় তাঁর নিজস্ব কোন বাড়ি ছিল না। এর ফলে, তাঁর সংসারে প্রতিনিয়তই অভাব-অভিযোগ লেগেই থাকতো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনি মুশতাক এবং তার সঙ্গী নরপশু কতিপয় সামরিক জান্তা তাঁকে মুশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্য নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু তিনি তা ঘৃণ্যভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘যেখানে বঙ্গবন্ধু নেই, সেখানে আমার বেঁচে থাকার কোন অর্থ হয় না।’
কামারুজ্জামান সাহেব যখন ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী, তখন তাঁর স্ত্রী জাহানারা জামান মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। সে সময় তিনি অত্যন্ত কাতর কন্ঠে বলতেন, ‘জাহানারা, বেঈমান মুশতাক আমাকে কোনভাবেই বাঁচতে দিবে না। আমার তেমন অর্থ-সম্পদও নেই। আমাকে মেরে ফেললে তুমি আমার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কীভাবে বড় করবে, কীভাবে লেখাপড়া শেখাবে? এসব কথা ভাবলে আমি আর স্থির থাকতে পারি না। দুশ্চিন্তায় আমার সারারাত ঘুম হয় না।’ যাহোক, ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর মীর জাফরের বংশধর বিশ্বাসঘাতক সেনাবাহিনীর কতিপয় নরঘাতক ঢাকার কেন্দ্রীয় জেলখানার ভেতরে ঢুকে জাতীয় চার নেতা শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শহিদ তাজউদ্দিন আহমদ, শহিদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান কে নির্মমভাবে হত্যা করে। তারপর জাতীয় তিন নেতাকে ঢাকায় সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু মিসেস জাহানারা জামান শহিদ কামারুজ্জামানকে হেলিকপ্টারে রাজশাহীতে নিয়ে আসেন এবং তাঁদের কাদিরগঞ্জ পারিবারিক গোরস্থানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের কড়া প্রহরার মধ্যে অল্পসংখ্যক লোকের উপস্থিতিতে জানাযা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
জাতীয় নেতা শহিদ কামারুজ্জামান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্থপতিদের একজন। তিনি একজন প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনাকে লালন এবং বাস্তবায়নকারী গণমানুষের নেতা ছিলেন। সেইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের মানুষের অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি সবরকম অন্যায়, অবিচার  ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। তিনি দীর্ঘকাল রাজনীতি করেছেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অর্থাৎ মন্ত্রী, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। কিন্তু অসৎ চিন্তা ও কর্ম তাঁকে কখনো কলুষিত করতে পারে নি। তাই, দেখা যায় তাঁর মৃত্যুর পর দুটি ব্যাংকে মাত্র ১৫,০০০/- (পনের হাজার পাঁচশত) টাকা সঞ্চিত ছিল।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সামরিকজান্তাদের অপরাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকালে শহিদ কামারুজ্জামান-এর সুযোগ্য স্ত্রী মহীয়সী নারী জাহানারা জামান ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার কোন তুলনা নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবেও কখনো তাঁর কোন মূল্যায়ন হয় নি। এ নিয়ে তাঁর মনের গভীরে চাপা ক্ষোভ  ও বেদনা ছিল। তিনি নিজে কখনোই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তবে তাঁর সুযোগ্য সন্তান এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে পিতার প্রাণের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে চারপুরুষÑ এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই।
পরম শ্রদ্ধেয়া একেবারে আত্মপ্রচারবিমুখ জাহানারা জামান স্বামীর স্মৃতি বুকে ধারণ করে এতোদিন বেঁচে ছিলেন। তিনি নিজে কখনোই তাঁর নিজের জন্য কারো কাছে কখনো কিছু বলেছেন বলে আমাদের জানা নেই। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কাছে আমাদের বিশেষ দাবি জাতীয় নেতা শহিদ কামারুজ্জামান-এর সমাধি চত্বরে একটি কমপ্লেক্স এবং তাঁর নামে গ্রন্থাগার, মিলনায়তন ও অতিথিশালা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সেই সঙ্গে শহিদ কামারুজ্জামান-এর জীবন সঙ্গিনী জাহানারা জামানের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য তাঁর নামে যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল নির্মাণের জন্য আমরা বিন¤্রচিত্তে আবেদন জানাচ্ছি।
আমরা বিশ্বাস করি, রাজশাহীসহ সারাদেশের গণমানুষের নেতা জাতীয় নেতা শহিদ কামারুজ্জামান-এর সুযোগ্য সহধর্মিনী জাহানারা জামান অত্যন্ত সহজ-সরল ও নিবেদিতপ্রাণ বড় মনের ও বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর কর্মগুণেই আমাদের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সে সঙ্গে আমরা আজ কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর বিদেহী আত্মার কল্যাণ কামনা করছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ