শহিদ ড. জোহা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

প্রফেসর আবদুল খালেক:


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ছাত্র-ছাত্রীদের বিপদের কথা ভেবে সব কাজ ফেলে রেখে এগিয়ে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয় গেটের দিকে। নাটোর রোডে পা দিয়েই বুঝতে পারলাম সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা ছাত্রদেরকে গুলি করার জন্য রাইফেল তাক করে বসে আছে। ড. জোহা এবং তাঁর সাথে বেশ কয়েকজন শিক্ষক যেমন-ড. মযহারুল ইসলাম, ড. এম.আর সরকার, অধ্যাপক হবিবুর রহমান (পরবর্তীতে শহিদ) ড. কাজী আবদুল মান্নান, ড. কছিম উদ্দিন মোল্লা, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদেরকে নাটোর রোড থেকে সরিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচেছন। ড. জোহা কর্মরত সামরিক অফিসারকে বলছিলেন ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার, আমার ছেলেরা এখনই চলে যাবে ক্যাম্পাসের মধ্যে।’ কিন্তু সামরিক অফিসারটি কোন কথা শুনতে রাজি নন। তিনি সামরিক বাহিনীর জওয়ানদেরকে গুলি করার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় গেটে সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের উপস্থিতি আমাদের ছাত্রদেরকে উত্তেজিত করে তুলছিল। সামরিক বাহিনীর সাথে ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে কর্মরত ছিলেন জনাব মো. নাছিম। আমরা তখন ঘটনাস্থলে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেট নাছিম সাহেবকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম বিশ্ববিদ্যালয় গেটে সেনাবাহিনীর লোকজনের উপস্থিতি আমাদের ছাত্রদেরকে উত্তেজিত করে তুলছে, জওয়ানদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেট থেকে সরিয়ে নিলেই আমরা ছাত্রদেরকে ক্যাম্পাসের ভিতরে সরিয়ে নিতে পারবো। আমাদের কথায় ম্যাজিস্ট্রেট নাছিম সাহেব জওয়ানদেরকে রেডিওর গেটের দিকে সরিয়ে নিতে সম্মত হন এবং সেই মোতাবেক নাছিম সাহেব একটা জিপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেট ছেড়ে বেশ খানিকটা পূর্বে রেডিওর গেটের নিকে এগিয়ে যান। জওয়ানেরাও ধীর পায়ে রেডিওর গেটের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
এই ব্যবস্থায় পরিস্থিতি অনেকটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সমবেত শিক্ষকগণ তখন দু’দলে বিভক্ত। একদল শিক্ষক ছাত্রদেরকে নাটোর রোড থেকে মেইন গেট দিয়ে ক্যাম্পাসের ভিতরে নিয়ে আসবার কাজে ব্যস্ত। এই দলে ছিলেন ড. জোহা এবং আরো অনেক শিক্ষক। আমি, ড. মান্নান এবং ড. মোল্লা জওয়ানদের পিছে পিছে রেডিওর গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের অবস্থান ছিল ছাত্র এবং জওয়ানদের মাঝামাঝি। উদ্দেশ্য, যাতে জওয়ানেরা আমাদেরকে মাঝখানে রেখে ছাত্রদেরকে গুলি করতে না পারে। ছাত্ররা নাটোর রোড ছেড়ে ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢুকে পড়ছে দেখে আমরা স্বস্তি অনুভব করতে থাকি। পায়ে পায়ে আমরা যখন নাটোর রোড পার হয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ পাশে চলে এসেছি, এমন সময় আকস্মিকভাবে আমাদের উপর গুলি বর্ষিত হয়। গুলির আঘাতে আমরা ছিটকে পড়ে যাই নাটোর রোড সংলগ্ন দক্ষিণ দিকের খাদে। একই সাথে ছিটকে পড়ে যান শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. কাজী আবদুল মান্নান এবং বন্ধু ড. কছিম উদ্দিন মোল্লা। খড়ের গাদার মধ্যে পড়ে বুঝতে পারলাম ড. মান্নান এবং আমি কাছাকাছি আছি। আমার মাথা এবং ড. মান্নানের মাথা পাশাপাশি। ফিস ফিস করে আমরা কথা বলতে পারছিলাম। মুহূর্তের মধ্যে একটা গুলির আওয়াজ কানে এলো। তারপর একটি তীব্র আর্তনাদ। বুঝতে পারলাম হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পাশের করুণ আর্তনাদ আরও তীব্র হয়ে উঠলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, ড. মান্নানও আমার সাথে উঠে এলেন। দু’পা এগুতেই একজন সামরিক অফিসারের হাতে ধরা পড়লাম। রিভলবার দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটনাস্থলে সদ্য আগত জনৈক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার আমাদেরকে ‘আন্ডার অ্যারেস্ট’ বলে ঘোষণা করলেন। আমরা বেঁচে গেলাম। আমাদেরকে বন্দি করে মিলিটারি ভ্যানে তুলে নেওয়া হলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়া দেহটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ড. জোহার সাদা জামা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে, তিনি তখন গোঙাচেছন। আহত ড. জোহার কাছে আমরা যেতে চাইলাম, কিন্তু যেতে দেয়া হলো না। জওয়ানদের হাতে ড. মান্নান, ড. মোল্লা, এবং আমি তখন বন্দি। জওয়ানেরা আমাদেরকে হিড়হিড় করে টেনে খোলা মিলিটারি ভ্যানে তুলে নিল। ম্যাজিস্ট্রেট ‘নাসিম’ সাহেবকে ডেকে আমরা চীৎকার করে বললাম, “ড. জোহা মরে যাচেছন, তাঁকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক” কিন্তু আমাদের কথাকে তারা কানে তোলেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতিপয় শিক্ষককে বন্দী করে খোলা মিলিটারি ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হচেছ। এ খবর শহরে রটে গিয়েছিল, ফলে পথের মোড়ে মোড়ে বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতার হাতে মিলেটারি ভ্যান বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। সেনাবাহিনীর লোকজনকে লক্ষ্য করে ছাত্ররা আড়াল থেকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারছিল। রাজশাহী শহরের সোনাদীঘির মোড়ে টাউন লন্ড্রির পাশ থেকে একদল ছাত্র আমাদের মুক্তির দাবিতে জওয়ানদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষেই সিটি কলেজের ছাত্র ‘নূরুল ইসলাম’ শাহাদৎ বরণ করেন। মিলিটারি ভ্যান আমাদেরকে নিয়ে মিউনিসিপ্যাল অফিসের সামনে গিয়ে থামে। পাশেই রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। দেয়ালের ওপার থেকে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্ররা মিলিটারি ভ্যান লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল মারতে থাকে। এই সময় ড. মোল্লা সংজ্ঞা হারায়। তাঁকে একটি স্ট্রেচারে করে মিউনিসিপাল অফিসে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে আমরা শুশ্রুষা করতে থাকি। মিউনিসিপাল অফিসের একটি ঘরের মেঝেতে আমরা অনেকগুলো আহত মানুষের আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলাম। আহত লোকজনকে একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। শুনেছি আহতদের মধ্যে ড. জোহাও ছিলেন। কিন্তু আমাদেরকে দেখতে দেয়া হয়নি। বেলা ১২ টার দিকে মিউনিসিপাল অফিসের উপর তলায় আমাদেরকে একটি ছোট কুঠুরিতে (সাময়িক হাজত ঘর) আটকিয়ে রাখা হয়। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাজত ঘরে কাটানোর পর দেখা গেল মেডিকেল কলেজের একদল ছাত্র বেলা ৩ টার দিকে আমাদের অবস্থা জানতে এসেছে। ড. মান্নান এর মধ্যে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন, আমিও ক্ষুধায় খুব ক্লান্ত। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে অবিলম্বে হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়, কিন্ত কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আকস্মিক একটি খবরে সবাই বিচলিত হয়ে ওঠে। জানা যায়, বুলেট এবং বেওনেটের প্রচ- আঘাতে জর্জরিত ড. জোহা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ড. জোহার মৃত্যুর খবর জানবার সাথে সাথে তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানও প্রমাদ গুণতে থাকে। আমাদেরকে জেল হাজত থেকে অমিলম্বে মুক্ত করে দেয়ার নির্দেশ আসে। ড. জোহার মৃত্যু শুধু আমাদেরকেই জেল হাজত থেকে মুক্ত করেনি। তাঁকে নির্মমভাবে হত্যার ফলশ্রুতি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কাজেই ড. জোহা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ আজ অবিচ্ছিন্ন।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়