শহিদ ড. জোহা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

প্রফেসর আবদুল খালেক:


বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং ড. জোহা হত্যা কোন বিচিছন্ন ঘটনা নয়। ১৯৬৯ সালের ১৮ই ফের্রুয়ারি তারিখে ড. জোহাকে হত্যার সাথে সাথে দেশে যে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তারই ফলশ্রুতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা। ড. জোহা নিজে সক্রিয় রাজনীতি করেন নি, এ কথা হয়তো সত্য; কিন্তু ড. জোহা হত্যা অবশ্যই দেশের রাজনৈতিক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। সব হত্যার প্রতিক্রিয়া একই রকম হয় না। ড. জোহার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপক বা বুদ্ধিজীবী আমাদের দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনে শহিদ হয়েছেন, তেমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। যে কারণে তুলনামূলকভাবে ড. জোহা হত্যার প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক। ড. জোহা ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অতি জনপ্রিয় শিক্ষক। সমগ্র দেশ জুড়ে ছিল তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী ছাত্র-ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে, এ খবর প্রচারিত হবার সাথে সাথে সমগ্র দেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। সে আগুন স্পর্শ করে আইউবের মসনদকে, পতন ঘটে আইউব খানের। কাজেই ড. জোহা হত্যার মূল্যায়ন করতে হলে বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আমাদের আলোচনায় নিয়ে আসা অত্যন্তজরুরি। যে কোনো মুক্তিযুদ্ধ শুরু করবার আগে প্রয়োজন দেশের মানুষকে রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, তার অধিকারবোধ, তার অমর্যদা সম্পর্কে সজাগ করে তোলা। এ কাজের জন্য প্রয়োজন বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন প্রত্যয়শীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের। এর যে কোনো একটির অভাব থাকলে সে মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যই প্রমাণ করে, বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্রজ্ঞাশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন দেশে ছিল। প্রসঙ্গক্রমে ড. জোহা হত্যার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
ঐতিহাসিক আগরতলা মামলাটি যদিও সাধারণ ভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলে পরিচিত, কিন্তু মামলাটির শিরোনাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ এই মামলা চলাকালে দেশের মানুষ যে ক্রমান্বয়ে অধিকার সচেতন এবং আন্দোলনমুখি হয়ে ওঠে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ১৫ই ফের্রুয়ারি তারিখে আগরতলা মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় এবং বলা হয় যে, তিনি পালাতে চেষ্টা করেছিলেন। ১৬ই ফের্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার প্রতিবাদে সমগ্র দেশে হরতাল পালিত হয় এবং মিছিলের ঢল নামে। মিছিলের উপর পুলিশ গুলি বর্ষণ করে ফলে বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়। এর প্রতিবাদে ১৭ই ফের্রুয়ারি সারাদেশে আবার হরতাল পালিত হয়।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার খবর প্রচারিত হবার সাথে সাথে অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মত রাজশাহীর জনসাধারণও প্রচ- ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্থানীয় প্রশাসন রাজশাহী শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত ছাত্র-ছাত্রী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আইউব খানের দালাল হিসেবে পরিচিত রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষের বাসার সামনে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। পুলিশের সাথে এক পর্যায়ে ছাত্রদের সংঘর্ষ বাধে। ড. জোহা খবর পেয়ে গাড়ি নিয়ে দ্রুত ছুটে যান ঘটনাস্থলে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে কয়েকজন ছাত্র তখন আহত। খবরটি ক্যাম্পাসে প্রচারিত হবার সাথে সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালিন বিভাগীয় প্রধান তথা এসএম হলের প্রোভোস্ট ড. মযহারুল ইসলামও ঘটনা স্থলে চলে যান। আহত ছাত্রদেরকে ড. জোহা এবং ড. মযহারুল ইসলাম গাড়িতে তুলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। আহত ছাত্রদের ফোটা ফোটা রক্তে শিক্ষকদের জামা ভিজে ওঠে। এ ছিল ১৭ই ফের্রুয়ারি বিকেল ৫ টার ঘটনা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৯ সালে একুশের অনুষ্ঠান পালন উপলক্ষে এক সপ্তাহের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সামনে তৎকালীন শহিদ মিনারের পাদদেশে। ১৭ই ফের্রুয়ারি সন্ধ্যা রাতে বাংলা বিভাগ আয়োজিত সেমিনারে যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল, শহরে ছাত্রদের আহত হবার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বাংলা বিভাগের আলোচনা সভা শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ সভায় রূপান্তরিত হয়। ড. মযহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নেতৃস্থানীয় প্রায় সকল শিক্ষকই (ড. জোহা, অধ্যাপক হবিবুর রহমান (শহিদ), অধ্যাপক কাজী আব্দুল মান্নান, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, প্রমুখ) ছাত্রদের প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং কঠোর ভাষায় তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করনে। ড. জোহা এই সভায় তাঁর শার্টে ছাত্রদের রক্তের দাগ দেখিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন-‘আহত ছাত্রদের পবিত্র রক্তের স্পর্শে আজ আমি গৌরবান্বিত। এর পর থেকে শুধু ছাত্রদের রক্ত নয়, প্রয়োজনবোধে আমাদেরকেও রক্ত দিতে হবে।’ বাংলা বিভাগ আয়োজিত সেই প্রতিবাদ সভায় ড. জোহা আরও ঘোষণা করেন-‘এর পর আর যদি কোনো গুলি করা হয়, কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে সে গুলি আমার বুকে লাগবে।’ ড. জোহা সে কথা রেখেছেন। ১৮ই ফের্রুয়ারি তারিখে তাঁর সে ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।
ড. জোহাকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমি ছিলাম তাঁর সহকারী প্রক্টর। এ কারণে আমি তাঁর খুব কাছাকাছি আসতে পেরেছিলাম। তাঁর সাথে আন্তরিক একটি সম্পর্ক পারিবারিকভাবে গড়ে উঠেছিল। আমরা একে অপরের বাসায় ঘন ঘন যাতায়াত করতাম। মিসেস নীলুফার জোহার ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয় এবং মধুর। মুখে সব সময় তাঁর হাসি লেগেই থাকতো। বাসায় গেলেই আন্তরিকতার স্পর্শ অনুভব করা যেতো। তাঁদের হাসি-খুশি দাম্পত্য জীবন নিয়ে আমরা মাঝে মাঝে রসিকতা করতাম। ড. জোহা আমাকে গভীরভাবে øেহ করতেন, আমি তাঁকে অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা করতাম। আমার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম হে ১৮ই ফের্রুয়ারির করুণ ঘটনার অন্যতম কারণ কিনা, তা আমার কাছে এখনও এক বড় প্রশ্ন। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘটনাস্থল থেকে আহত আমাদেরকে উদ্ধার করতে না গেলে ড. জোহা হয়তো বেঁচে যেতেন। কিন্তু যাঁর রক্ত দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেবে, যাঁর অবদান একটি দেশকে স্বাধীন করবে, ঘটনাস্থলে তাঁকে যেতেই হবে, নিয়তির এ ছিল অমোঘ বিধান।
১৯৬৯ সালের ১৮ই ফের্রুয়ারির যে করুণ স্মৃতি আমাদের বুকের মধ্যে জমাট হয়ে আছে। সে স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। সকালে শীত যেমন থাকবার কথা, সে বছর শীত তেমন ছিল না। সে কারণে সকালে সোয়েটার গায়ে দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। শার্ট গায়ে বিভাগীয় কাজে চলে যাই। সার্জেন্ট জহুরুল হকের নির্মম হত্যার প্রতিবাদে ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শহরের দিকে এগিয়ে যাবে এমন কথা আমাদের কানে এসেছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ এত বেশি বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছিল যে, সেখানে প্রক্টর বা সহকারী প্রক্টর হিসেবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবার কিছু ছিল না। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে বাংলা বিভাগ আয়োজিত পুস্তক প্রদর্শনীর কাজে আমি ১৮ই ফের্রুয়ারি তারিখে খুব ব্যস্ত ছিলাম। বর্তমান শহীদুল্লাহ কলা ভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে বাংলা একাডেমির বই-সাজিয়ে-গুছিয়ে নেয়া হচ্ছিল, এমন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাণের ভয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছে। বেলা তখন আনুমানিক সাড়ে নয়টা।
(চলবে)