বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

শহিদ দুলাল : হৃদয়ে গাঁথা একটি গণতন্ত্র

আপডেট: December 5, 2019, 1:14 am

আহাসানুর রহমান আহাসান


১৯৮৮ সাল। উপশহর ‘হাউজিং এস্টেট’ ২ এর ২৫৫ নম্বর বাসায় তৎকালীন দলীয় নেতা এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সময় ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের মাঝে। গোল চিহ্নিত শহিদ যুবক রফিকুল ইসলাম দুলাল।

৫ ডিসেম্বর। ১৯৯০ সালের পর প্রতি বছর এই তারিখটা আসলেই বুকের বাঁ দিকটা ধক্ করে উঠে।
১৯৯০ সাল, ডিসেম্বর মাস। সারা দেশের প্রতিটি শহরের মতো রাজশাহীতেও চলছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। তখন সকল স্লোগান শেষ করে একটাই স্লোগানে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠে- ‘এক দেশ এক দাবী, এরশাদ তুই কবে যাবি।’ আওয়ামী লীগের জোটে ৭ দল আর বিএনপি জোটে ৮ দল। সকল জোট তখন এরশাদ সরকারের পতনের জন্য অভিন্ন কর্মসূচি দিচ্ছে। তবে প্রতিদিন দুপুরের পর বিক্ষোভ মিছিল হবেই। যত দিন যাচ্ছে ততই স্বৈরাচার এরশাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়তেই আছে। প্রতিনিয়ত বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে তো বাড়ছেই।
সেদিন ৫ ডিসেম্বর। ১৯৯০ সাল। শহরের আলুপট্টি থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়েছে। আমরা উপশহর থেকে সর্বদলীয় বেশ বড় একটা মিছিল নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছি। জিরো পয়েন্টের দিকে মিছিল এগোচ্ছে। প্রতি মূহুর্তেই মিছিলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে তো বাড়ছেই। মিছিল যত বড় হচ্ছে স্লোগানও ততই তীব্র হচ্ছে। সাথে সাথে মিছিলের চলার গতিও বাড়ছে। আমি মিছিলের প্রথমেই ছিলাম। কিন্তু মিছিলের গতির সাথে তাল মিলাতে না পেরে ধীরে ধীরে পেছনে পড়তে লাগলাম।
জিরো পয়েন্ট পার হবার পরপরই, ঠিক ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে আসতেই পেছন থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে দুলাল আমার কাছে আসলো। দুলাল হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে বললো, ‘আহসান ভাই, আপনার তো প্রকাশনার অভিজ্ঞতা আছে, আমি ১৯৯১ সালের একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করবো, আপনার সহযোগিতা লাগবে।’ দুলাল আরও বললো, ‘এরশাদের পতন তো এখন সময়ের ব্যাপার। আমি ওই ক্যালেন্ডারে এরশাদের স্বৈরশাসন আমলে যারা রাজশাহী থেকে শহিদ হয়েছেন তাদের ছবি দেব। আমি কয়েকদিন আগে মিল্লাত ভাইকেও বলেছি।’ এ-কটা কথা বলেই দুলাল আবারও মিছিলের প্রায় পেছনের দিকে চলে গেল, যেখান থেকে ছাত্রলীগের স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছিলো।
‘শহিদ এএইচএম কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনের আমি সভাপতি। পরিষদটির কার্যক্রম উপশহর মোড়ে একটি কুঁড়ে ঘরে চলতো। আমরা ‘শহিদ এএইচএম কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এর ব্যানারে ১৯৮৭ সালে ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসে ‘রক্তাক্ত কারাগার’ নামে শহিদ চার জাতীয় নেতাদেরকে নিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম। ’রক্তাক্ত কারাগার‘ বইটি বিশেষ করে শহিদ এএইএম কামারুজ্জমান কে নিয়েই প্রকাশ করা। কিন্তু তা জেল হত্যা দিবসকে সামনে রেখে। ১৯৮৮ সালে ১৫ আগস্ট শোক দিবসকে সামনে রেখে ‘মৃত্যুর অহঙ্কার’ নামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম। এই দুই প্রকাশনায় যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে আকবারুল হাসান মিল্লাত (বর্তমানে দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক), আনোয়ারুজ্জামান শেল্টু (ইন্তেকাল করেছেন), গোলাম ফারুক বেলাল, বোরহানউদ্দিন মোল্লা জিনু সহ আরও অনেকে। মূলত পত্রিকা প্রকাশের কাজ আমি আর মিল্লাত, এই দুজনেই করেছি।
মিছিল চলছে তো চলছেই। আমি আর হাঁটতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে সোনাদিঘি মোড় থেকেই আমি মিছিল থেকে বেরিয়ে গেলাম। মিছিল তখন জোশে চলছে। লশ্মীপুর মোড় দিয়ে এক সময়ে এসে পৌঁছে বর্ণালীর মোড়ে। এখানেই এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী নুরুন্নবী চাঁদ এর বাসা (এখন যে বাসা জনতা ব্যাংকের জোনাল অফিস)। মিছিল চাঁদের বাসার সামনে আসতেই ক্ষুব্ধতা বেড়ে গেলো। ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হলো। চাঁদের বাসায় অবস্থানরত জাতীয় পার্টির কর্মী এবং আনসার বাহিনীর লোকেরাও ইট পাটকেল ছুঁড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে চাঁদের বাসা থেকে গুলি বর্ষণ শুরু হলো। সেই গুলিতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো রফিকুল ইসলাম দুলাল।
দুলাল এর মৃত্যুর খবর কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো রাজশাহীতে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা যে যেখানে ছিলাম সেখান থেকেই হেঁটে বা দৌড়ে প্রথমে বর্ণালীর মোড়ে যায়। ওইখান থেকে দৌড়ে আবার হাসপাতালে যাই। রাস্তায় কোনো যানবাহন নাই। সকলকেই বাধ্য হয়ে হয় হেঁটে না হয় দৌড়ে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। হাসপাতালে তখন লোকে লোকারণ্য। সকলে বুকেই তখন ব্যথা। দুলালের মরা দেহ নিয়ে বিলসিমলায় তার বাড়িতে যাওয়া হলো। দুলালের মাকে সান্ত¦না দেয়ার ভাষা কারও কাছে ছিল না। বর্ণালীর মোড়ের স্পটে (চাঁদের বাড়ির সামনে) আরও কয়েকজন আহত হয়েছিল ছড়রা গুলির আঘাতে। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় হাসপাতালে।

বুকে ব্যথা নিয়ে উপশহর ‘শহীদ এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান স্মৃতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এর উপশহরের কুঁড়ে ঘরের কার্যালয়ে আমি, মিল্লাত, সেল্টু, রবিন, বেলাল, জাহাঙ্গীর, জিনু রাত প্রায় এগারোটার সময় বসলাম। তখনই আলোচনা করা হলো আমাকে বলে যাওয়া দুলালের শেষ কথা নিয়ে। দুলাল ১৯৯১ সালের ক্যালেন্ডার বের করতে চেয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম আমরাই দুলালের শেষ ইচ্ছাটাই পূরণ করব। ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতাতেই থাকবে দুলালের ছবি। দিনরাত আমি, মিল্লাত, বেলাল যথেষ্ট পরিশ্রম করে ক্যালেন্ডার বের করলাম। এরশাদ সরকারের সময়ে রাজশাহী শহর থেকে শহিদ হওয়া চারজনের ছবি এবং জীবন বৃত্তান্ত সংবলিত ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হলো। প্রথম পাতাতেই থাকলো দুলালের (রাজশাহী কলেজ ছাত্র ও রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগ কমিটির সদস্য) এর ছবি। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় শহিদ জিয়াউল (লোকনাথ স্কুলের এর ছাত্র) এর ছবি। তারপরেই ছিল জামিল আক্তার রতন (রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এর ছাত্র ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি) এর ছবি। শেষ ছবিটি ছিল শাহজাহান সিরাজ (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র ও জাসদ এর ছাত্রনেতা)।
অস্বাভাবিক কম সময়ে আমরা এই ক্যালেন্ডারটি বের করেছিলাম দুলালের শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্যে। ১৯৯০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস, রাজশাহী কলেজ শহিদ মিনারে সকলেই শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছেন। ওই দিন সকাল ৮টা সময় আমি, মিল্লাত, বেলাল, সেল্টু, বর্তমান রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের হাতে ১৯৯১ সালের প্রথম ক্যালেন্ডারটি প্রদান করলাম।
লেখক : রাজনৈতিককর্মি