শহিদ মিনারের লুনি নবাব

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০১৭, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

আবীর মুখোপাধ্যায়



কখনও তার রং বদলে যায় লাল রঙে। কখনও তাকে ঘিরে বসানো হয় ফোয়ারা।
একটি স্মৃতিসৌধকে ঘিরে কত না গল্প! ১৮২৫ সালে যে সৌধ বানানো হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেসিডেন্ট ডেভিড অক্টারলোনি সাহেবের নেপাল জয় স্মরণীয় করে রাখতে, ১৯৬৯ সালে তা বদলে গেল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি উৎসর্গীকৃত শহিদ মিনারে! অক্টারলোনি মনুমেন্ট হল শহিদ মিনার!
দিল্লির রেসিডেন্ট ডেভিড অক্টারলোনি। এক দিকে বস্টন থেকে আসা আমেরিকান, অন্য দিকে ঠাটেবাটে পুরো ‘নেটিভ’। হারেমে তাঁকে নিয়ে তেরো জন বিবির কত যে লাস্য, ঠারঠুর, বিলাস! বিবি মানে, তেরো জন নাজুক দেশি গার্ল! নৃত্যগীত-শৃঙ্গারপটিয়সী বিবিজানদের নিয়ে, তেরো হাতির পিঠে চেপে রোজ লালকেল্লার পথে সান্ধ্য হাওয়া খেতে যেতেন সাহেব, সেই দেখতে ভিড় ভেঙে পড়ত। মানুষের কাছে তাঁর নামটাও বদলে গিয়েছিল! ডেভিড অক্টারলোনি থেকে ‘লুনি আখতার’! কেউ কেউ ‘খ্যাপা আখতার’ও বলেন।
সাহেব এখন ভিতরমহলে। ধড়া-চূড়া বদলে নিচ্ছেন রাতের মেহফিলের জন্য। একটু পরে বাইজি নাচ শুরু হবে। চোগা-চাপকান সরিয়ে সাহেব তাই রঙিন সিল্কের সাজে। নরম মোমের আলোয় পানপাত্রে চুমুক দিতে দিতে আরশিতে শেষ বার দেখে নিচ্ছেন পাগড়িখানা। তেরো বিবিও সুর্মা আর সুগন্ধিতে পোশাক বদলে তৈরি। রঙিন কাপড়ের ফ্রিল করা ঘাগরা-চোলি, কেউ সাটিনের ঢিলে পাজামা, প্রজাপতি-রং বক্ষবন্ধনীতে সেজেছে। অপূর্ব সব অলংকার। হিরে-মোতির কোমরবন্ধ, পান্নার নাকছাবি। কিমামে ভেজা লাল ঠোঁট, মদির কটাক্ষে নয়নঠার!
একটু পরেই ঘুঙুরের বোল উঠলে, কাশ্মীরি বা পঞ্জাবি নর্তকীর হাত ধরে মজলিশে এসে বসবেন সাহেবের দুই সহকারী, উইলিয়াম ফ্রেজার আর এডওয়ার্ড গার্ডনার। তাঁদেরও পোশাক এ দেশীয়। গানের সুরে মৌতাত জমাবেন গালিচার ওপর বসে, তাকিয়ায় হেলান দিয়ে হুঁকো টানতে টানতে। হয়তো সঙ্গিনী খায়রুন্নিসার হাত ধরে এক্ষুনি এসে পড়বেন হায়দরাবাদের রেসিডেন্ট, বন্ধু কার্কপ্যাট্রিকও। এ পাশে হাতপাখা নিয়ে দাঁড়াবে পঙ্খাদার। হারেম জাগবে বিবিদের নাচে, কথায়!
দিল্লির রেসিডেন্ট ডেভিড অক্টারলোনির বুড়ো বয়সে এমনতরো মতি দেখে ভয় পেয়েছিলেন এ দেশের তৎকালীন ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ’এর স্ত্রী মারিয়া নাজেন্ট! দিল্লি সফরে এসে শঙ্কিত হয়ে লিখলেন, ‘ব্রিটিশ রেসিডেন্ট ও তাঁর সহকর্মীরা সবাই ‘নেটিভ’ হয়ে গেছেন। … তাঁরা যতটা খ্রিস্টান ঠিক ততটাই হিন্দু!’
অক্টারলোনির জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৮। বাবা ক্যাপ্টেন ডেভিড অক্টারলোনি, খাঁটি স্কট। মা ক্যাটরিন টাইলার পুরোদস্তুর আমেরিকান। সুদূর আমেরিকার বস্টনে যখন জন্ম, পলাশিতে সদ্য জয়ের নিশান উড়িয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সেখানেই যোগ দিয়ে ১৯ বছর বয়সে এ দেশে চলে এলেন অক্টারলোনি।
তার আগে হঠাৎ বাবা মারা গিয়েছেন, বস্টন থেকে গোটা অক্টারলোনি পরিবার চলে এসেছে লন্ডনে। সেখানে ফের প্রেমে পড়লেন মা, বিয়ে করলেন স্যর আইজাক হার্ডকে। আইজাকই প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। পরে অক্টারলোনিকে ভারতে পাঠানোও তাঁরই সিদ্ধান্ত।
১৭৭৭। জাহাজ এসে ঠেকল স্বপ্নের দেশে। অক্টারলোনির তখন কাঁচা বয়েস। আর পাঁচ জন পশ্চিমি অভিযাত্রীর মতোই মন দেশি মেয়েতে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে থাকার সুবাদে স্থানীয় সমাজ-রাজনীতির প্রতিও আগ্রহ জন্মাল। বন্ধুরা কেউ কেউ এ দেশের কালো আর তামাটে মায়াবিনীদের মায়ায় বাঁধা পড়লেন।
আসলে, এ দেশে অক্টারলোনির আসার বহু বছর আগেই কোম্পানি সেনাদের ‘সঙ্গিনী’ পাঠানোর খরচ কমাতে অলিখিত ফরমান জারি করেছিল, দেশি বিবি সংগ্রহের। ক্রমে মন মজল অক্টারলোনিরও। রাত-পার্টির ভোজের শেষে উন্মত্ত হয়ে শুরু হত বিবি-সংগ্রহ। কারও সংগ্রহে দশ-বিশ, তো কেউ ত্রিশ! এক রাত এর সঙ্গে তো অন্য রাত ওর শয্যায়। এক বার এক সাহেব নাকি তাঁর এক বিবিকে সন্দেহ করে গোটা হারেম তছনছ করেছিলেন মাত্তর কয়েক মিনিটে। সঙ্গিনীদের একের পর এক খুন করে, পরে আত্মঘাতী হয়েছিলেন নিজেও।
অক্টারলোনি বিভোর নেশার আবেশে। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে, হাতে হুঁকোর নল। পিছনে, দু’পাশে চাকরবাকর। কারও হাতে পাখা, কারও বা পিরিচ। সামনে ফরাসে নর্তকী। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আছে অক্টারলোনির এমন সুখ-বিলাসের ছবি।
ঠিক করে নিয়েছিলেন, এই ভারতই তাঁর স্বদেশ। বড় হতে হতে তাই একটু একটু করে বদলে নিচ্ছিলেন নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ, ‘আদা’। সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধজয়। তবে ভাড়াটে সৈন্য-জীবনের বাইরেও তাঁর একটা স্বতন্ত্র জীবন গড়ে উঠছিল এ দেশের জল-হাওয়ায়। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পরেও, কোম্পানির সাম্রাজ্য বিস্তার ততটা সহজ ছিল না। পশ্চিমে মরাঠা, দক্ষিণে হায়দরাবাদ, মহীশূরের প্রতিরোধ। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস বুঝেছিলেন, এদের না ভাঙলে ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব স্থাপন অসম্ভব। আলিগড় ও দিল্লির যুদ্ধে লর্ড লেক-এর সহকারী হিসেবে অক্টারলোনির বেশ নাম-ডাক তত দিনে।
তাঁর প্রবল পরাক্রম দেখে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৮০৩ সালে দিল্লির দরবারে তাঁকে প্রথম ইংরেজ রেসিডেন্ট নিযুক্ত করলেন। কিছু দিন পরেই যুদ্ধ! দিল্লি আক্রমণ করলেন যশোবন্ত রাও হোলকার। সামান্য ক’জন সৈন্য নিয়ে সে বার দিল্লিকে রক্ষা করেছিলেন অক্টারলোনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে রাজ্যের রক্ষাকর্তার খেতাব দিল‘নাসির উদ-দৌল্লা’। প্রতাপ যত বেড়েছে, অক্টারলোনির হারেম তত ভরে উঠছে নতুন নতুন দেশি মেয়েতে। কেউ কেউ খুব কাছের!
তেমনই এক জন মুবারক। পুরো নাম মাহারুত্তুন মুবারক উল নিশা বেগম। অক্টারলোনির প্রধান বিবি। পুণের ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়েটি অক্টারলোনির থেকে বয়সে বেশ ছোট, কিন্তু সম্পর্কের রাশ তাঁরই হাতে। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। অন্দরমহলে সবাই তাঁকে ‘জেনারিলি বেগম’ বলে ডাকতেন। আড়ালে বলতেন, বকলমে জেনারিলিই দিল্লির রেসিডেন্ট! মুবারকের প্রভাবেই অক্টারলোনি তাঁর দুই মেয়েকে ইসলাম ধর্ম মেনে বড় করেছিলেন। বিবি মুবারকের প্রেমে মাতোয়ারা ছিলেন বৃদ্ধ অক্টারলোনি। নিত্য যুদ্ধ আর ভোগে ডুবে থাকলেও, নিজের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করতেন সাহেব। এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি, ছেলেমেয়েরা ইউরোপীয় শিক্ষায় বড় হলে, ওরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হবে। আমার ছেলেমেয়েরা খুব ফরসা। ওদের বলা হবে ওরা অক্টারলোনির হলেও, মা নেটিভ ইন্ডিয়ান। আবার ওদের মুসলিম হিসাবে বড় করতেও দ্বিধা বোধ করছি! কারণ, সে ক্ষেত্রে মুঘলদের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। আমি দেখতে পারব না আমার মেয়েদের হারেমের যাওয়া…’ দ্বিধায় দীর্ণ হচ্ছেন সাহেব!
কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে মতান্তরের কারণে ঠিক চার বছরের মাথায় সাহেবকে সরে যেতে হয় রেসিডেন্ট পদ থেকে। তবে কোম্পানি তাঁকে রেখে দেয় উত্তর ভারতেই গভর্নর জেনারেলের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে। অক্টারলোনির প্রধান দায়িত্ব তখন শিখ সমস্যা। ১৮০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে অক্টারলোনি একটি ঘোষণাপত্র প্রচার করলেন। বলা হল, শতদ্রুর পূর্ব তীরের সব রাজ্য কোম্পানির আশ্রয়াধীন। সে সব রাজ্যের রক্ষণাবেক্ষণের ভার তাঁদেরই। লাহৌরাধিপতি সেই সব রাজ্য আক্রমণ করলে, কোম্পানি প্রতিরোধ করবে। সেই বছরই অক্টারলোনির হস্তক্ষেপে রঞ্জিত সিংহ স্বাক্ষর করলেন অমৃতসর চুক্তি। এই অক্টারলোনিই কিন্তু পরে নিজের ১৮০৯-এর ঘোষণা নিয়ে লর্ড ময়রার কাছে অকপটে ভুলস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, শতদ্রু পারের শিখদের নিয়ে তাঁর বিশ্বাস ভুল ছিল!
দিল্লির পরে লুধিয়ানাতেও অক্টারলোনির জীবন ঝলমলে। যুদ্ধ আর যুদ্ধের বিরামে এসে পড়ে ভাগ্যবিড়ম্বিত শাহ সুজা আর তাঁর স্ত্রী ওফা বেগমের আশ্রয় চাওয়ার গল্প। সুজা তখন বন্দি কাশ্মীরে। কোহিনূরের খোঁজে তাঁর উপর ক্রমশ বাড়ছে অত্যাচার। তাঁকে মুক্ত করতে শিখ মহারাজা রঞ্জিত সিংহের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেন বেগমজান ওফা। বিনিময়ে মহামূল্য হিরেটি দিতে হবে রঞ্জিত সিংহকে। কাশ্মীর আক্রমণ করে সুজাকে মুক্ত করে লাহৌরে নিয়ে এসেছিলেন পঞ্জাব-কেশরী। সুজা তাঁর সঙ্গিনীদের তুললেন মুবারক হাভেলিতে। কিন্তু হিরের সন্ধানে শুরু হল নতুন করে অত্যাচার, খাঁচায় বন্দি রেখে জিজ্ঞাসাবাদ। শেষে হিরে হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলেন সুজা।
কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন, ওফা গোপনে আশ্রয় চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন অক্টারলোনিকে। ঘরহারা মানুষের ব্যথা যেন অনুভব করলেন সাহেব। কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে বোঝালেন, নির্বাসিতদের আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্য ইংল্যান্ডের ইতিহাসে নতুন নয়। ১৮১৪-র ২ ডিসেম্বর, রাতের অন্ধকারে ওফা বেগম ছদ্মবেশে সুজার হারেমের মেয়েদের নিয়ে লাহৌর থেকে লুধিয়ানা এসে উঠলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আশ্রয়ে। কয়েক মাসের মধ্যেই সুজার অন্য বেগমজানেরাও এসে আশ্রয় নিল। সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯৬!
এত জন কোথায় থাকবেন! সাহেব হাভেলির ব্যবস্থা করে দিলেন। খাওয়া-পরার টাকা নেই, নিজে গোপনে অর্থ-সাহায্য করলেন। পরে সরকারি ভাতার ব্যবস্থাও করে দিলেন। দু’বছরের মাথায় তাঁর কাছে শাহ সুজা এলেন একই অনুরোধ নিয়ে। এ বারও আপত্তি তুলল কোম্পানি। ফের চিঠি চালাচালি।
অক্টারলোনি সে সব পাত্তা না দিয়েই সুজাকে অভ্যর্থনা জানাতে পাঠালেন সহকর্মী ফ্রেজারকে। লুধিয়ানায় সুজা এলেন ১৮১৬-র সেপ্টেম্বরের শেষে। আশ্রয় পেলেও, প্রথম থেকেই বলতে শুরু করলেন, শুধু আশ্রয় বা ভাতা নয়, একটি পৃথক মহল দিতে হবে। যেখানে তাঁর বিবিরা অন্য পুরুষদের চোখের আড়ালে থাকতে পারবে।
ওফা বেগম এবং শাহ সুজাকে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনায় খানিক টাল খেয়েছিল কোম্পানির সঙ্গে অক্টারলোনির সম্পর্ক। কিন্তু সাহেব তা সামলে নিলেন কোম্পানির অন্য দুই বিপদে পাশে থেকে। গোর্খা অভ্যুত্থান আর পিন্ডারিদের বাড়বাড়ন্ত। ভাঙা সম্পর্ক জুড়ে, সাহেব চললেন নেপাল অভিযানে। নেপাল যুদ্ধ জিতে ‘সগৌলির সন্ধি’ করলেন। শর্ত অনুসারে ইংরেজরা সিমলা, মুসৌরি ও আলমোড়া লাভ করল। কাঠমান্ডুতে এক জন ইংরেজ রেসিডেন্ট রাখার ব্যবস্থা হল। ১৮১৬-তে ‘গ্র্যান্ড কমান্ডার অব দি আর্থ’ হলেন অক্টারলোনি।
এক একটি যুদ্ধ জয় করেন আর ছাউনিতে শুরু হয় বিজয় উৎসব। সুরার ফোয়ারা, মশালের আলোয় রাতভর উদ্দাম নাচ-গান। এ নতুন কিছু নয়। সৈন্যরা একঘেয়েমি কাটাতে ছাউনিতে নিয়ে আসতেন রাতপরিদের। যুদ্ধক্ষেত্রে অক্টারলোনির নিজের ছাউনিও ছিল পরিখানা। এক দিকে বিবিদের তাঁবু, অন্য দিকে তাঁর মেয়েদের তাঁবু।
অক্টারলোনির রাজকীয় বিলাস দেখে হতবাক হতেন সাহেবরাই। এক বার কলকাতার বিশপ রেজিনাল্ড হেবার খুব অবাক দিল্লি গিয়ে। অক্টারলোনি তাঁকে চোগা-পাগড়ি পরে অভ্যর্থনা করেছিলেন! তুমুল আয়োজন। ঘূর্ণি তুলে নর্তকী নাচছে। চোখে কাজল। বেণি আছড়ে পড়ছে পিঠে। চাহনিতে ছড়িয়ে পড়ছে আলো। চিকচিক বাহারি আয়না, পিতলের মোমদান-আতরদান। বাতাসে উড়ছে মোতিয়া আতরের সুবাস। কার্পেটে লুটিয়ে পড়েছে কেউ, কেউ এলিয়ে সোফায়। সুরাপাত্র এগিয়ে দিতে দিতে হয়রান শরাবদার। তেরচা করে ধরা গ্লাস থেকে শরাব উপচে পড়ছে পাশেই বসা সুন্দরীর ঠোঁটে। রকম-সকম দেখে চোখ টেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় পাঙ্খাবরদারদের!
অক্টারলোনির জাঁকজমকের কথা বলতে গিয়ে এই হেবার বলছেন, সাহেব বৃদ্ধ হলেও সুদর্শন। হাতির পিঠে মুঘল পোশাকে এমন আবৃত, মুখ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। সহিস, মাহুত, খানসামা, খিদমতগার, বেয়ারা, মশালচি, হরকরাÍ কত লোক তাঁকে ঘিরে!
শেষের দিকে খাসমহলে প্রিয় মুবারকের ক্ষমতার লালসা দেখে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন সাহেব। আসলে ক্ষমতালোভী মুবারক সরকারি কাজে নাক গলাতেন। ব্রিটিশরা বিরক্ত, তিনি নিজেকে বলেন ‘লেডি অক্টারলোনি’! মুঘলদের কাছেও অপ্রিয়, কারণ তিনি নিজের পরিচয় দিতেন সম্রাটের মায়ের উপাধি ‘কিদশিয়া’ ব্যবহার করে!
১৮২৩ থেকেই শরীর ভেঙে পড়ে সাহেবের। তখন রাজস্থানের ভরতপুর স্টেটে নাবালক রাজা বলবন্ত সিংহ। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন দুর্জন শাহ। অক্টারলোনি নাবালক রাজার পাশেই রইলেন। কিন্তু এ বার আর গভর্নর জেনারেল তাঁকে সমর্থন করেননি। অপমান মেনে নিতে পারেননি সাহেব। পদত্যাগ করলেন।
ইতিহাস বলে, এই ঘটনাই তাঁর মৃত্যুকে এগিয়ে নিয়ে আসে। ১৫ জুলাই, ১৮২৫ মারা গেলেন। তবে যৌবনের মৃগয়াভূমি শাহি দিল্লিতে নয়, উত্তরপ্রদেশের মেরঠে। সেখানকার সেন্ট জন চার্চেই শুয়ে আছেন লুনি আখতার! ভাড়াটে মার্কিন সেনা, কিন্তু বেঁচে থাকার কেতায় খানদানি মুঘল বাদশা!
তাঁর মৃত্যুসংবাদ কলকাতায় এসে পৌঁছলে, কোম্পানির নির্দেশে ৬৬ বার তোপধ্বনি হয়। সেই গড়ের মাঠেই তৈরি হল অক্টারলোনি মনুমেন্ট!
( আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে)