শহিদ সুরেশচন্দ্র পাণ্ডের প্রয়াণ দিবস আজ

আপডেট: এপ্রিল ২, ২০১৭, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


শহিদ সুরেশ চন্দ্র পাণ্ডের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল রাতে নগরীর ফুদকিপাড়াস্থ বাসভবনে ঢুকে পাকিস্তানি সেনার এই বুদ্ধিজীবী নির্মমভাবে হত্যা করে। মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়েও দেশের প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ তাঁতে পালিয়ে যেতে প্রলুব্ধ করেনি। দেশদরদি ও জনহিতৈষী দেশ মÍৃকার সাহসী সন্তান সুরেশ চন্দ্র পাণ্ডে জন্মেছিলেন ১৯১৮ সালে, বাবা স্বর্গীয় উমেশ চন্দ্র পাণ্ডে। রাজশাহী।
শহিদ সুরেশ চন্দ্র পান্ডে ব্যক্তিগত জীবনে একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজদের বিতাড়নের পক্ষে তৎকালীন অন্যতম বিশিষ্ট সংগ্রামী নেতা হিসেবে পরিগণিত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট আমলে পূর্ণ এমএলএ পদে বহুদিন পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন। তারপর যুক্তফ্রন্ট শাসন অবসানের পর থেকে নিয়মিত ৩নং ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন। আইয়ুব খানের শাসনকালে একবার বিডি মেম্বার হয়েছিলেন এবং একবার পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। ওইসব পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন দেশ ও জাতির এবং শহর উন্নয়নে প্রচুর পরিশ্রম করতেন এবং প্রচুর খ্যাতি-সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাছাড়া বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ও অন্যান্য কমিটিতে কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তারপর এলো ১৯৭১ সালের সেই কালরাত্রি তাঁর জীবনের যমদূত হিসেবে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত থেকে শুরু হয়েছে নিরস্ত্র বাঙালির উপর সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ পাগলের মত পালাচ্ছে। এই সময় রাজশাহীর অবস্থাও একই রূপ। ২৮ মার্চ রাজশাহীর বীর পুলিশ বাহিনীর বিদ্রোহ-হাতের অস্ত্র দেবে না। প্রত্যুত্তরে গর্জে উঠলো পাকিস্তানি কামান। সারা রাত অসম দুই শক্তির প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর ২৯ মার্চ বিকেলে পুলিশ বাহিনীর প্রতিরোধ ব্যর্থ হলো। সারা দেশের মত রাজশাহীতেও আতঙ্ক আর বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়লো। শান্তিকামী জনতা হলো বিভ্রান্ত কি তাদের করণীয়? সবাই ছুটে এলো সুরেশ বাবুর কাছে। গরীব দুঃখী মানুষের বন্ধু সুরেশ পান্ডে অভয় দিলেন। “না, মায়ের মতই প্রিয় আমাদের মাতৃভূমি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান-আমরা সবাই এই বাংলার সন্তান এবং আমরা পরস্পরের ভাই। এদেশ তোমার আমার সকলের, তা’ ফেলে পালাবে কেন?” কিন্তু সেই অভয়দাতার ভাগ্যে নেমে এলো নির্মম পরিহাস। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল শুক্রবার রাত ১১-১৫ মিনিট। সুরেশ পান্ডে প্রত্যেক দিনের মত রাত্রের আহারপর্ব সমাপ্ত করে নিজস্ব বাসভবনে দোতলার নিজের ঘরে বিশ্রামে মগ্ন। পাশের ঘরে স্ত্রী চিত্রলেখা দেবী এবং দুই পুত্র শোভন কুমার ও সৌমিত্র কুমার।
সন্তান বিদ্যমান। নিচতলার ঘরে সুরেশ বাবুর ৯৮ বছর বয়স্কা বৃদ্ধ মাতা বিছানায় শায়িত। গরমের রাত্রের দরুন নিদ্রা পুরোপুরি আসেনি। সবেমাত্র একটু তন্দ্রার ভাব এসেছে। এমন সময় নেমে এলো সেই বিভীষিকা একটা পূর্ণ পাকিস্তানি পাঞ্জাবী সৈন্যভর্তি জিপগাড়ি এসে সুরেশবাবুর বাড়ির রাস্তায় সদর গেটের সামনে দাঁড়ালো। একটা সৈন্য জিপ থেকে নেমে তালাবদ্ধ গেট ধরে তীব্রভাবে ঝাঁকাতে থাকে এবং উচ্চস্বরে নাম ধরে ডাকতে থাকে। ডাক শুনেই সুরেশবাবু বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং নিচতলায় এসে সদর গেট খোলেন। তখন সেই অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত সৈন্যটি সুরেশবাবুর সাথে নিচতলার ঘরের বারান্দার দরজার কাছে এসে উপস্থিত হয়। তখনও সুরেশবাবু বুঝতে পারেনি যে, ওই সৈন্যের হাতে প্রাণ দিতে হবে। তিনি মনে করেছিলেন, হয়ত বা বাড়ি সার্চ করে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। কেননা, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে একবার ১৫ দিন এবং ১৯৫৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের সময় অহেতুক একমাস অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ ছিলেন। তাছাড়া ওই দিনেই বিকেলে সারা শহরে ভরা কার্ফুর মধ্যে প্রতিদিন অভ্যাসমত সমস্ত মহল্লা ঘুরে ঘুরে মহল্লাবাসীদের মনে সান্ত¦না ও সাহস জাগিয়ে এসেছিলেন। তারপর ওই সৈন্যটি ঘরের দরজার কাছে দণ্ডায়মান অবস্থায় দু-চারটে কথা সুরেশবাবুর সাথে বিনিময় করে। রাস্তায় দাঁড়ানো জিপটির ইন্জীন স্টার্ট দেয়া অবস্থাতেই আছে। কথা বিনিময়ের পরে সৈন্যটি সুরেশবাবুকে ঘরে চলে যাবার নির্দেশ দেয়, যেন ভাবটা এই রকম যে, “সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে, এখন গিয়ে বিশ্রাম করুন।” সৈন্যের নির্দেশ পালন করার নিমিত্তে সুরেশবাবু ঘরে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়ান। মুহূর্তের মধ্যে সেই ভয়াল রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেদ করে আকাশ ফাটানো স্বরে গর্জে উঠলো সৈন্যের হাতের রাইফেল। অব্যর্থ লক্ষ্য। সেই গুলি সুরেশ বাবুর মাথার পিছনে বিদ্ধ হয়ে ডান চক্ষু সমেত উপড়িয়ে ঘরের দেওয়াল ভেদ করে উঠানে পতিত হলো। সুরেশ বাবু আর্ত চিৎকার করে মাটিতে পড়ার সাথে সাথে মাথাটা আছড়ে পড়া বেলের মত দু’ভাগ হয়ে গেল। উহ! সে কি বিভৎস্য দৃশ্য! রক্তের বন্যা বইতে লাগলো। ইতোমধ্যে সৈন্যরা জিপে আরোহণ পূর্বক চলে গেছে। সুরেশবাবুর স্ত্রী ও পুত্রদ্বয় ধরাধরি করে রক্তাক্ত দেহটা ঘরের মধ্যে খাটের উপর শয়ন করায়। তখনও দেহে প্রাণ-বিদ্যমান। কিন্তু মাত্র ৫ মিনিট। তারপর সুরেশবাবু ওই অবস্থায় স্ত্রীর হাতে পূর্ণ এক গ্লাস জল পান করেন। ধীরে ধীরে অক্ষত বাম চক্ষুটা স্ত্রী-পুত্রদ্বয়ের প্রতি উন্মীলন করার পরে প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল।
সুরেশ পান্ডে শিক্ষা জীবন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এবং রাজশাহী কলেজ থেকে সমাপন করেন। ছয় বছর বয়সে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং ক্রমে ক্রমে কোনবারই বাধা বিপত্তি না হয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএসসি (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা সমাপন হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ