শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য বাংলাদেশ-ভারত সংলাপ বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট: জানুয়ারি ২২, ২০২২, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু


সম্প্রতি মৌলভী বাজারের কমলগঞ্জে ভারতীয় সীমান্ত এলাকার কাছে বাঁশ কাটতে গেলে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএস এফ) ৫ জন বাংলাদেশিকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছে বলে সংবাদে প্রকাশ। এমন ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আইন সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গত ৫ বছরে বিএসএফ ১৪৭ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে, ১৩৩ জনকে আহত করেছে এবং ৭২ জনকে অপহরণ করেছে। অপর একটি রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, ১৯৭২ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৮ বছরে বিএসএফ ১১৬০ জন বাংলাদেশিকে হত্যা, ১৪০৮ জনকে অপহরণ, ১১১ জন নিখোঁজ হয়েছ এবং এসময়ে নারীর ধর্ষিতা হবার খবর ও রয়েছে। রিপোর্টগুলি সবই নিঃসন্দেহে খুবই উদ্বেগজনক। সীমান্ত হত্যা নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফ-এর উঁচু পর্যায়ে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও অসংখ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রেক্ষিতে ভারত পক্ষ থেকে বার বার প্রতিশ্রুতি দিলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করেনা বিএসএফ। বাংলাদেশিদের হত্যার ব্যাপারে বিএসএফ তথা ভারত রাষ্ট্রের ব্যাখ্যা হচ্ছে চোরাচালান ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে তারা এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রশ্ন হলো, সীমান্তের এসব অপরাধ বাংলাদেশিরা এককভাবে করে তা কখনোই নয়। এতে ভারতীয় নাগরিকদের পরিপূর্ণ সহযোগিতা থাকে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু বেছে বেছে বাংলাদেশি নাগরিকদেরই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। এটা যেমন দূঃখজনক তেমনি হিংসাত্মক ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘন ।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সীমান্তেই এসব অপরাধ সংঘটিত হয়। আর তা নিয়ন্ত্রণের জন্য অসামরিক আইন থাকে, যা মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। যেমন- বাংলাদেশে বিজিবি রয়েছে তেমনি ভারতে বিএসএফ রয়েছে। সীমান্তে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী অপরাধীদের চিহ্নিত করে, আটক করে এবং স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করে সাক্ষ্য প্রমাণসহ। তারপরে আদালতে চালান করে। সেখানে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সূযোগ দেওয়া হয়। বিচারক সাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীকে সাজা দেন এবং নিরপরাধীকে মুক্ত করে দেন।

সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই অসামরিক পদ্ধতিই হচ্ছে প্রচলিত আইন। কিন্তু বিএসএফ পুরোপুরি হিংসাত্মকভাবে সামরিক কায়দায় নিজেরাই বিচার করছে, আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আইনের ধারধারেনা। বাংলাদেশ সরকার প্রচলিত এই আইন সম্পর্কে ভারত সরকারকে অবহিত করতে পারে বা ওই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারে এবং তা বার বার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। দুদেশের মধ্যে তো এমন কোনো বিরোধ নেই যে এমন হিংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে। তাদের এই কার্যক্রম দেখে মনে হয় দুদেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ‘দেখামাত্র গুলি কর’- এই নীতি চালু রাখা হয়েছে। যা অসামরিক আইন বিরোধী। এতে ভারত সম্পর্কে বা বিএসএফ সম্পর্কে বাংলাদেশিদের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক ।

এই দুটি দেশের সীমান্ত বিষয়ে একটি চুক্তি স্মরণযোগ্য। চুক্তিটি সম্পন্ন হয় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ৩ টি বৈঠকের মাধ্যমে। যা ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে কোলকাতায় মে মাসে করাচিতে এবং ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়। সেই চুক্তির একটি ধারায় উল্লেখ রয়েছে দুদেশের সীমান্তবর্তী ৫ মাইলের মধ্যেকার জনসাধারণ অবাধে যাতায়াত করতে পারবে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করতে পারবে। যে চুক্তিটি ভারত বা পাকিস্তান কেউই বাতিল করেনি। পাকিস্তান-ভারত পরস্পর শ্ত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পরেও। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তানকে পরাজিত করে প্রাপ্ত সেই ভূখ-টির মালিক বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ। সুতরাং সেই চুক্তির সুবিধা সমূহ বাংলাদেশ পেতেই পারে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু ভারত সরকার সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে সেই সুবিধা বন্ধ করে ঐতিহাসিক চুক্তিকে প্রকারান্তে অস্বীকার করেছে। তারপরেও উভয় দেশের সম্মতিতে মেঘালয়ের কালীচরণ বালাটে ও ত্রিপুরার শ্রীমঙ্গল ওকমম্লগঞ্জের হাটে দুদেশের ব্যবসায়ীরা সপ্তাহে ১/২ দিন মালামাল নিয়ে আসে ও কেনাবেচা করে। দুদেশের মুদ্রাতেই এই কানাবেচা হয়। এমন সীমান্ত হাটের সংখ্যা বৃদ্ধি করার কথাও মাঝে মাঝে শোনা যায়। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে গরু কেনা বেচার করিডোর খোলা হয় দুদেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতেই। যা ১৯৮৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।

এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে আরও ব্যবসা বাণিজ্য সহ সামাজিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগ হতে পারে । তথাপি বি এসএফ-এর এমন হিংসাত্মক ও বৈরী আচরণ বাংলাদেশের জনগণকে বিস্মিত করে। শুধু তাই নয়, কিছুদিন পূর্বে ভারতের বিজেপি সাংসদ সুব্রমনিয়ম স্বামী ত্রিপুরার আগরতলায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের সবসময়ই সমর্থন করবেন, তাদের পাশে থাকবেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে মন্দিরকে মসজিদে রূপান্তর করা হচ্ছে এবং হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে সুতরাং ভারতের উচিৎ বাংলাদেশকে হামলা করে দখল নেওয়া। এদিকে হিন্দু পরিষদের নেতা পুর্ঞ্চন্দ্র মন্ডল বলেছেন হিন্দুদের উপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধ না হলে বাংলাদেশ অভিমুখে মার্চ করবেন এবং ভারতে মুসলিমদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত এমন উগ্র সাম্প্রদায়িক ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দুটি দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অন্তরায় হতে পারে।

যা কোনোভাবেই কাম্য নয় এছাড়া কিছুদিন আগে দিল্লি সহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে দুএকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে। তাছাড়া বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে বর্তমান ভারত সরকার সাম্প্রদায়িকতাকে ইন্ধন যোগায়। যা সর্বজনবিদিত। সম্প্রতি হরিদ্বারে কট্টরপন্থি হিন্দুরা ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাফারি অভিযান বা জাতি নিধনের আহবান জানিয়েছে। যা উল্লেখ করে ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান ও সিনিয়র মিলিটারি কমান্ডার অরুণ প্রকাশ আশঙ্কা করে বলেছেন এ ধরনের জাতি নিধনের আহবান গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে। বিষয়টি তিনি সহ আরও ৪ জন সাবেক মিলিটারি অফিসার ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এবং প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক ক্রমশ নাজুক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে এগাতে পারে। তাই দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে কথপোকথনের মাধ্যমে উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রশমিত করা জরুরি। আর সীমান্ত হত্যা বন্ধ করার দায়িত্ব নিতে হবে ভারত সরকারকে।
লেখক : সাংবাদিক