শান্তি ও উন্নয়নে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য দৃঢ় করতে হবে

আপডেট: ডিসেম্বর ২০, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


একাত্তরে আমরা একটা দেশ পেয়েছি। এই দেশ পেতে গিয়ে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি আত্মোৎসর্গ করেছিলেন এবং সম্ভ্রমতা হারিয়েছিলেন সাড়ে চার লক্ষা মা-বোন। যদিও বেগম খালেদা জিয়া এই তথ্যে সন্তুষ্ট না হয়ে তার বক্তৃতায় ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন। এই সংখ্যা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে করে যা বলেছিলেনজ্জতার অর্থ এ সবই মিথ্যে এবং বানোয়াট আর কল্পনাপ্রসূত। শহিদের সংখ্যা অনেক কমজ্জযা যুদ্ধাপরাধীদের বক্তব্যে সঙ্গে মেলে। অবশ্য বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে দেশের গৌরবময় অর্জন বিরোধী এমন বক্তব্য আর মানসিকতা পোষণ নতুন নয়। কারণ তার স্বামী যুদ্ধের মাঠ থেকে পুত্র তারেকসহ স্ত্রী খালেদাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে লোক পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি স্বামীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ভারতে না গিয়ে পাকিস্তানি সেনা ছাউনিতে গিয়ে উঠেছিলেন। সেখানে পুত্র তারেককে নিয়ে যুদ্ধের নয় মাস আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছেন। তার পক্ষে শহিদ আর বীরাঙ্গনার সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ এবং মিথ্যেচার খুব স্বাভাবিক। তিনি যখন সপারিষদ শহিদ মিনারে যান, তখন তার শহিদ মিনারে যাওয়াটা লোক দেখানো মনে হয়। এ ছাড়া স্বামীর মতো তিনি যুদ্ধাপরাধী দল জামাতকে তোষণ-পোষণ আর পুনর্বাসন করাসহ তাদের নাগরিকত্ব দেয়াসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিক জোট বাধাটাও খুব স্বাভাবিক। এ নিয়ে মতান্তরের অবকাশ নেই যে তিনি আপাদমস্তক পাকিস্তানি চিন্তা-ধারায় আস্থাশীল। আর সে কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিকে তিনি প্রত্যাখ্যাত। যতোবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, ততোবারই তাকে জনরোষের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ভিয়েতনামে হয়তো একটা মাইলাই আছে, কিন্তু বাংলাদেশে অসংখ্য ‘মাইলাই’ রয়েছেজ্জযার পরিপূর্ণ তথ্য এ লেখায় দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে যাওয়া ‘মাইলাই’গুলোর তথ্য ভাবিষ্যতের কোনো উৎসাহী গবেষক উদ্ধার করবেন। তাই খালেদার ইতিহাস বিকৃতি শুনে ভবিষ্যতে সচেতন মানুষ মাত্র মনে করেছেন, ‘পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়’-প্রবাদটি সফল প্রয়োগ সম্পর্কে ভাবনার উদয় হয়। যে দেশের স্থপতির মৃত্যুদিনে নিজের মিথ্যে জন্মদিন পালন করেন তিনি, আর যা-ই হোক সুস্থ রাজনীতিক চিন্তা ও কর্মের অধিকারিণী তিনি নন। তার একাধিক জন্মদিন রয়েছে। কোনো সুস্থ মানুষের যা থাকে না। তারপরও বেছে বেছে ১৫ আগস্টই কেনো তার জন্মদিন বলে প্রচার করলেন? কারণ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশকেও অস্বীকার করার একটা পথ নির্মাণ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাটাই তার লক্ষ্য। এ ছাড়া এই বঙ্গবন্ধু ব্যতিত তার স্বামীর ঘর করা হতো না। পাকিস্তানি সেনা ছাউনিতে যুদ্ধের নয় মাস অবস্থান করার অভিযোগে জিয়াউর রহমান তাকে ত্যাগ করতে উদ্যত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সে খবর জেনে জিয়াকে ডেকে পদ ও পদোন্নতির লোভ দেখিয়ে খালেদাকে জিয়ার ঘরে তুলে দিয়ে বলেন, ‘পুতুল আমার মেয়ে, তোকে আমার মেয়েকে নিয়ে ঘর করতে হবে।’ পদোন্নতির লোভে জিয়া বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব মেনে নেন এবং স্ত্রীকে ঘরে তোলেন। পদোন্নতিও পান। কিন্তু সেই জিয়াই শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম বলে অনেকেই মনে করেন। আদালতও সেটা মনে করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণার সময় মহামান্য বিচারকেরা বলেছিলেন, ‘সকল অনির্বাচিত সরকারই সংবিধান পরিপন্থী। অতএব জিয়া সরকারও অবৈধ। তারপরও তারা বঙ্গবন্ধুর নামটি উচ্চারণে অলিখিত বাধা দিয়েছেন। অথচ জিয়া বা তার স্ত্রীর ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ বঙ্গবন্ধু করেননি। তারপরও বঙ্গবন্ধুর ওপর তাদের (জিয়া-খালেদার) রোষ-ক্ষোভ কেনো সে ব্যাখ্যা তারাই ভালো দিতে পারবেন। প্রবাদে আছে ‘চোরায় না শোনে ধর্মেন কাহিনি’জ্জজিয়া-খালেদার দেশ বিরোধী এই আচরণ প্রমাণ করে তারা কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কোনো কাজ করেননি। জিয়া সে কারণেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত আর নন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদেরই প্রমোটার। পুনর্বাসক। এই অ্যাসাইনমেন্ট তিনি পাকিস্তানি সেনানিবাসে অবস্থানকালেই লাভ করেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি খোন্দকার মোস্তাকের প্রিয়ভাজন ছিলেন। তারা উভয়েই যুদ্ধ না করে পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কনফেডারেশন গঠন করার গোপন উদ্যোগ নেন। এ তথ্য প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পেয়ে মোস্তাককে পররাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। ভারতীয় ইনটেলিজেন্টের দেয়া তথ্য যাচাই করে তাজউদ্দিন যথা সময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে ভয় করেননি। অবশ্য মোস্তাকের এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে উদ্বাস্তু অনেক বুদ্ধিজীবী যুক্ত ছিলেন। তারা প্রকাশ্যে সে প্রস্তাবও উত্থাপন করেন। বিজয় অর্জনের পর সেই সব বুদ্ধিজীবী বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মোটা মোটা বই লিখে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পদ আর পদবী ঠিক বাগিয়ে নিয়ে বেশ বিলাসী জীবন যাপন করেছেন। ওই বুদ্ধিজীবীরা আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মোস্তাক সরকারের কাছে আনুগত্য প্রকাশ করে নিজের বিলাসী জীবনকে নির্বিঘœ করারও প্রয়াশ চালিয়েছেন। তাতে কেউ লাভবান হয়েছেন, কেউ হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের রাজনীতি এবং সমাজ-সংস্কৃতির নীতিতে এই আপোসকামীতা কিংবা নতজানু হওয়ার প্রবণতা বেশ কিছু মানুষের স্বভাবজাত। যেমন- অনেকেই বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তাঁর নানা ভুল-ভ্রান্তি ধরে কুৎসিৎ সমালোচনা করেছেন। কিছু বামপন্থী ছাত্র ও রাজনীতিক সংগঠনকে রুশ-ভারতের বিরুদ্ধে শ্লোগানসহ দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে হরতাল আহ্বানে পরামর্শ দিয়ে পক্ষান্তরে পরাজিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন এবং ভুলেও বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দে সম্মানিত করেননি, বলেছেন ‘শেখ সাহেব’ তারাই আবার সেই ‘শেখ সাহেব’কেই ‘বঙ্গবন্ধু’ বলতে লজ্জা করেননি। উপরন্তু বঙ্গবন্ধুর দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সকল বক্তৃতায় ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে মুখে ফেনা তুলেছেন। তারাই ‘বঙ্গবন্ধু’র নামে সৃষ্ট চেয়ারের অধিপতি হয়েছেন। পেয়েছেন পদোন্নতি, পদবী এবং পুরস্কার। এদের বোধদ্যয় হওয়ায় তারা খালেদার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন কেউ কেউ। কিন্তু আজো যাদের বোধদ্যয় হয়নি, তারা কিন্তু সেই অন্ধকারে লুকিয়ে দেশের উন্নয়ন আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। তারা এখন বেশ জোরে তেল-গ্যাস-বন্দর-বিদ্যুৎ রক্ষার আন্দোলনে লিপ্ত। তারা আওয়ামী লীগের বিরোধিতার নামে খালেদার বিএনপিকে পথ তৈরি করে দিতে বেশ তৎপর। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধেও নানা বয়ান ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে দিচ্ছেন, লিখছেনও। জানি না তাদের সে লেখা কেউ পড়ে কি না। পড়লেও তাদের লেখায় কেউ প্রভাবিত হচ্ছে না বলেই তাদের সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা নেই। থাকলে তারা এতোদিনে দেশ জয় করে নিতেন। পারছেন না কারণ তাদের আচরণে এবং বক্তব্যে ভিন্নতা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। রুশ-ভারতের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে যেমন কোনো কূল-কিনারা করতে পারেননি, তেমনি বঙ্গবন্ধুর বিপরীতে অবস্থান নিয়েও তারা সুবিধাটা করতে পারেননি। শেষাবধি ‘জয় বাংলা’ বলে বঙ্গবন্ধুর দলের সঙ্গে মিলে নির্বাচন করে তারা বিজয়ী হয়েছেন। এটা বাস্তবতা। তারা ভেবেও দেখেননি অথবা জ্ঞান পাপী বলেই মুক্তিযুদ্ধে রুশ-ভারতের সমর্থন যদি না থাকতো, তাহলে নয় মাসে কি দেশ শত্রুমুক্ত হতো? হতো না। মুক্তিযোদ্ধাদের একক লড়াইয়ে দেশ শত্রুমুক্ত হতে ভিয়েতনামের মতো হয়তো ঊনিশ বছর সময় লাগতো অথবা তারও বেশি। তাহলে যারা উপকারী, বন্ধুপ্রতীম, স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু জনবিচ্ছিন্ন মানুষের তারাই শত্রু। যে চিন মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের গণনিপীড়নে, ধর্ষণে সহায়তা করেছিলো, এই তথাকথিত বাম-প্রগতিশলরা সেই চিনের ‘চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রকারান্তরে পাকিস্তানপন্থি চিন এবং তাদের এদেশিয় দোশর আল বদর, রাজাকার আর ধর্মান্ধ জামাতকেই পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এটা ওই খালেদার মতোই রাজনীতির অনুকরণ। বহু দূর ঘুরে তারা বিএনপি’র সঙ্গে রাজনীতিতে এক হয়ে যায়। এটা স্বাধীন বাংলাদেশেরই বোধ করি দুর্ভাগ্য। দুর্ভাগ্য এ জন্যে যে প্রতিক্রিয়াশীলেরা আজো এ দেশে অস্তিত্বশীল। তাদের দৌড়াত্ম, খুন-যখম আর ধর্ম নিয়ে মিথ্যেচার যতো দিন রুদ্ধ করা না যাবে, ততোদিন এরা জনমনে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবেই। আর সেটা করতে হলে আওয়ামী লীগের একার পক্ষে আজ কতোটা সম্ভব তা ভেবে দেখতে হবে।
আওয়ামী লীগে আজকে নেতাদের লোভ স্বার্থ সংরক্ষণের কারণে অসংখ্য মোস্তাক এসে ভিড়েছে। তারাই দলের কার্যক্রম, আদর্শিক রাজনীতির বিপরীতে অবস্থান নিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে, করছে দলের অপনাম। এই অপশক্তি আজকে দলের নেতৃত্বেও বসেছে। সবই নেতাদের স্বার্থ রক্ষার কারণে ঘটছে। এদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান নেয়ার শক্তি নেই। অনেক সংগ্রাম করে তবে কি দলটি দুর্বল হয়ে পড়েছে? হয়তো। নয়তো শেখ হাসিনা একা, তিনিও দলীয় এই ঋতুর পাখিদের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন। ভয়টা সেখানেই। খালেদার চেয়ে আজকে দলের এই উদ্বাস্তু, হঠাৎ আসা নেতারা বেশি ক্ষতিকর। সে দিকটিকে সামলে নিতে পারলে এবং সমমনাদের সঙ্গে ঐক্য দৃঢ়তর হলে এরা হারিয়ে যাবে অতলে। দেশবাসী এই বসন্তের কোকিলদের পরাজয়, অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে যাওয়াটা বেশি প্রত্যাশা করে। চায় উন্নয়ন এবং সামাজিক শান্তি। সে দিনের অপেক্ষায় দেশবাসী রয়েছে।