শান্তি নিকেতনে

আপডেট: জুলাই ৬, ২০১৭, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


বীরভূম জেলার বোলপুর (শান্তিনিকেতন) রেলস্টেশনে নেমেই অদ্ভূতভাবে মনটা ভালো হয়ে যায়। এই সেই রবি ঠাকুরের সুকীর্তিময় পূণ্যভূমি যার সর্বত্রই চোখে পড়ে তাঁর সৃষ্টির ছোঁয়া।  প্রতিটি ভবন দোকান, বাড়ি, হোটেল, ট্যুরিস্ট লজ সবকিছুর নামই রবীন্দ্র সৃষ্টি থেকে নেওয়া। শিল্পের অপূর্ব রূপ-মাধুরী, প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা, মৌনতা, প্রকৃতির বিচিত্র শোভা চিত্রিত হয়েছে শান্তি নিকেতনের সর্বত্রই। ১৮৬৩ সালে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কেনা মাত্র ৭ একর জমির উপর ফুল-ফল, পত্র-পল্লব ও বিচিত্র বৃক্ষরাজির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ‘শান্তি নিকেতন’ নামের ছোট মেডিস্টেশন কেন্দ্র। এ কাজের তত্ত্বাবধানে ছোট রবীন্দ্রনাথও বাবার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।
পরে ১৮৮৮ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এ জমি ও বাড়ি ব্রহ্মবিদ্যালয় ও লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসর্গ করেন। ১৯০১ সালের ২২শে ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মর্যাশ্রম মাত্র ৫ জন ছাত্র নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ১৯২৫ সাল থেকে যে স্কুলটির পরিচিতি শুরু হয় পাঠ-ভবন নামে। মনোরম পরিবেশের কারণেই এ প্রতিষ্ঠানই নয় পুরো এলাকার নামকরণ হয় “শান্তি নিকেতন”। প্রকৃতির খোলা পরিবেশে গাছের ছায়ায় এখনও শিক্ষা-কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখানকার শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে জীবনের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন আমরা বইয়ের শিক্ষার দিকে বেশি মনোযোগী এবং আমাদের চতুষ্পার্শ্বের সব কিছুর ভেতর থেকে সহজেই যে জ্ঞান আহরণ করতে পারি তাকে আমরা অবজ্ঞা করি। তিনি চেয়েছিলেন শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা প্রকৃতিকে জানুক, প্রকৃতির সাথে সংযোগ তৈরি করুক এবং প্রকৃতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তথ্য সংগ্রহ করুক। শুধু তাই নয়, তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষকরা যেন বইয়ের শিক্ষার বাইরেও শিক্ষার্থীদের এমনভাবে তৈরি করেন। যাতে তারা নিজেদের জানতে শেখে এবং এ শিক্ষা পদ্ধতিতে আনন্দ পায়।
এমনি করেই আজ শান্তি নিকেতন উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের স্বর্গ। এক্ষেত্রে তেজেস চন্দ্র সেন, জগদানন্দ রায়, রাম কিংকর বেইজ, নন্দলাল বসু, বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায় সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কঠোর পরিশ্রমে শিশুদের ছোট স্কুল ধীরে ধীরে রূপ পায় ‘বিশ্ব ভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্বভারতী ভারতীয় সব সংস্কৃতির কেন্দ্রই নয়- এখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনও ঘটিয়েছেন তিনি। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল- যেখানে পুরো বিশ্বকে একটা ছোট্ট পাখির নীড়ের ভেতরে সাক্ষাৎ ঘটানো।
রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধ বা বিশ্বসচেতনতা তাঁকে বিশ্বভারতী আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে এবং ১৯২১ সালে এ বোধ থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী যা তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৫১ সালে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায়। তাঁর প্রতিটি কর্মের মূল মন্ত্রই ছিল মানব কল্যাণ। মানুষকে সুস্থ-সুন্দর জীবন দানের জন্য তাঁর কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ বিচিত্রমুখি ভাবনা দৃশ্যমান তাঁর প্রতিটি কর্মে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানে উদ্যাপিত উৎসব তাঁর উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে চলেছে আজও। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতন শিল্পের উৎকর্ষতাও মানুষের স্বনির্ভরতার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। সারা বছর উৎসব লেগে থাকে এখানে এবং অগণিত দর্শনার্থীর সমাগম হয় এর উৎসবকে ঘিরে। ১৫ এপ্রিল বাংলা নতুন বছর, কবির জন্মদিন ২৫ বৈশাখ, মে, ২য় সপ্তাহ বুদ্ধ জয়ন্তী, রাখী পূর্ণিমা, ২২ শ্রাবণ কবি প্রয়াণ দিবস ত্ত বৃক্ষরোপণ উৎসব, ৮ আগস্ট, ২৩ শ্রাবণ হল কর্ষণ, ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসÑ এছাড়াও আছে বর্ষামঙ্গল, শিল্পোৎসব, শারদোৎসব, পৌষ মেলা, পৌষ পার্বণ, মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের মৃত্যু বার্ষিকী, প্রজাতন্ত্র দিবস, শান্তি নিকেতনে বাৎসরিক উৎসব ও মেলা, বসন্ত উৎসব। গান্ধী পুণ্যাহ এবং বাংলা বছরের সমাপ্তি ৩০ চৈত্র। কোনো এক সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর যোগ্য সহযোগীদের সুপরিকল্পনা ও কঠোর শ্রমে প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি ভবন এমনকি রাস্তায় চলতে গিয়েও তার ছাপ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। পত্র-পল্লবে ঘেরা রাস্তা-ঘাট, সুবিস্তৃত খেলার মাঠ, বিচিত্র সব ফুলের সৌন্দর্য্য ও মিষ্টি গন্ধ, পথচারীদের নীরব পথ চলা, যানবাহনের অনাধিক্য, নির্দিষ্ট স্থানে যানবাহন পার্কিং, ধীরে গাড়ি চালানো এবং অপ্রয়োজনীয় শব্দ না করা, কোনো শিল্প না ছোঁয়া, যে কোনো প্রয়োজনে নিরাপত্তা কর্মীর সাহায্য নেওয়া, শিক্ষারূপকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখা (সেকুজায়ন) ইত্যাদি।
নির্দেশাবলির চর্চা এখানে সহজেই দৃশ্যমান হয়। রাত-বিরাতে সকলের বিশেষ করে মেয়েদের স্বাধীন চলাফেরা, কেউ কাউকে উত্যক্ত না করা কিংবা বিরক্ত না করা সত্যিই অনুকরণীয়। প্রতিটি হোস্টেল থেকে ভাড়া বাড়িগুলোর নিয়মকানুনও শিক্ষনীয়। নীচু স্বরে কথা বলা, অন্যকে বিরক্ত না করা, প্রায় প্রতি মুহূর্তে ধ্যানমগ্ন হয়ে নিজস্ব জগতে বিচরণ করা মানুষকে সুস্থ চিন্তা ও কাজের প্রেরণা দেয়- সেটাই দৃশ্যমান এখানে। যানবাহনের নিয়ন্ত্রিত চলাফেরা মানুষকে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ করে দেয়। এখানে প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ঘটনার কথা শোনা যায় না। এমনকি এখানকার অসংখ্য, অগণিত গাছপালার ভেতরের হিং¯্র সাপেরা আজ পর্যন্ত কাউকে দংশন করে নি বলে জানা গেল। স্থানীয় লোকদের মতে এ রবি ঠাকুরের আশীর্বাদ। রবীন্দ্র মিউজিয়াম এবং এক সময়ে রবীন্দ্রনাথের বাস করা বাড়িগুলো কোনার্ক, শ্যামলী, পূনশ্চ, উদীচী উদয়ন এগুলোও সুন্দরভাবে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি বাড়ি এবং ভবনের চিত্রকর্মগুলোয় মানুষকে আকর্ষণ করে।
শান্তি নিকেতনে কাটানো দিনগুলো সত্যিই ছিল নিশ্চিন্ত ও শান্তির। সময়গুলো কীভাবে ও কখন কেটে গেলো বুঝে ওঠতে না উঠতে বিদায় নিতে কষ্ট হলেও ¯্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর সৃষ্ট শান্তি নিকেতন সম্পর্কে শৈশব থেকে শোনা পূণ্যভূমিতে এসে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে।