শারদীয় দূর্গোৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

মো. আশরাফ আলী


বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতবর্ষ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সনাতন ধর্ম তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো দূর্গাপূজা। সনাতন ধর্মে বছরে দু’বার দূর্গোৎসবের প্রথা রয়েছে। সাধারণতঃ আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে শারদীয় এবং চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বাসন্তী দূর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। মহালয়া উদ্যাপনের মাধ্যমে মা দূর্গা তথা দেবী দূর্র্গার এই মর্তের পৃথিবীতে আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়। মা দূর্গা তথা দেবী দূর্গা হলেন স্বয়ং ঈশ্বরের শক্তির প্রতীক। তিনি হলেন, এক মহাজাগতিক শক্তি তথা অদ্যাশক্তি মহামায়া। মা দূর্গাকে বিভিন্ন নামে যেমন- দেবী দূর্গা, জয়দূর্গ, বনদূর্গা, জগদ্বাত্রী, গন্ধেশ্বরী, নারায়ণী, চন্ডী প্রভৃতি নামে পূজা করা হয়। এছাড়াও তাকে বিভিন্ন নামে সম্বোধন তথা স্মরণ করা হয়। যেমন- দুর্গতিনাশিনী দেবী অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট বিনাশকারিণী তথা ধ্বংসকারিণী দেবী। আবার দুর্গম নামক অসূরকে বধ করেছিলেন বলে তাঁকে দূর্গা বলা হয়। এছাড়াও দেবী দূর্গাকে মহিষ মর্দিনী দেবীও বলা হয়ে থাকে। কারণ তিনি মহিষাসূরকে বধ করে ইন্দ্রদেবকে তাঁর স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
দূর্গা পূজা তথা শারদীয় পূজায় ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ নানাভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখ ভুলে গিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে অবস্থান করে স্বর্গীয় প্রীতির মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বলেই দূর্গা পূজা হিন্দু সমাজে সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচিত। দেবী দূর্গা বিভিন্নরূপে এই মর্তের পৃথিবীতে আবির্ভুত হয়ে থাকেন এবং আমাদের সার্বিক মঙ্গল নিশ্চিত করেন বিধায় তিনি সর্বমঙ্গলা। আবার শিবের শক্তি বলেও তিনি শিবা। কারণ তিনি সকল প্রার্থনা এবং আরাধনা মঞ্জুর করেন এবং অসাধ্যকে সাধন করেন। তাই তিনি শরণ্য, তিনি গৌরী। দূর্গা দশভূজ নামেও পূজিত এবং আরোধিত হয়ে থাকেন। কারণ তাঁর দশটি মহাশক্তিশালী হস্ত রয়েছে। তিনি তিনটি নয়ন ধারণ করেছেন বিধায় তাঁকে ত্রিনয়না নামেও সম্বোধন করা হয়ে থাকে। তাঁর বাম নয়নে চন্দ্র, ডান নয়নে সূর্য এবং কপালে অবস্থিত নয়ন জ্ঞান বা অগ্নিকে নির্দেশ করে। তাঁর ডান দিকের পঙ্ক হস্তের অস্ত্রগুলো যথাক্রমে ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, বাণ এবং শক্তি। বামদিকের পঙ্ক হস্তের অস্ত্রগুলো হলো- খেটক (ঢাল), পূর্ণ চাল (ধনুক), পাশ, অঙ্কুশ, ঘণ্টা, পরশু, কুঠার)। এই সমস্ত অস্ত্র গুলো হলো জয়-দুর্গার অসীম শক্তির আধার এবং তাঁর গুনের প্রতীক। এই কারণে জয় দুর্গা হলো সর্বসাধারণের দেবী। সর্বোপরি মা দূর্গা তথা দেবী দূর্গা তথা জয়দূর্গা হলেন- সর্বমঙ্গলা, সর্বার্থ সাধিকা, গৌরী, শরণযোগ্যা, শিবা, ত্রিনয়না এবং নারায়ণী। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ তিথিতে পূজা মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের মধ্য দিয়ে দূর্গা পূজা তথা শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু করে দশম দিবসে দশমী পূজার মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায় তথা সনাতন ধর্মের শারদীয় উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে। দশমীর দিবসে দেবী দূর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় বলেই এই পূজার দশমীকে বলা হয় বিজয়া দশমী। বিজয় দশমান্তে মানুষের মাঝে থাকে না কোন জ্বালা-যন্ত্রণা, মনোকষ্ট, হিংসা-বিদ্বেষ, ব্যর্থতা, গ্লানি এবং থাকে না মনের কোনো পঙ্কিলতা এবং সংকীর্ণতা।
এই দিনে হিন্দু সম্প্রদায় সম্পূর্ণভাবে সকল প্রকার পাপাচার এবং ক্ষতিকর ভাবধারা থেকে নিজেকে বিমুক্ত করে স্বর্গীয় প্রেমের অমৃত সুধা পান করে বিনে সুতার ভালবাসার মালার বন্ধনে আবদ্ধ করে এক বিরল স্বর্গীয় প্রেমের সেতুবন্ধন রচনা করেÑ একে অপরকে আলিঙ্গনের পাশাপাশি পরস্পর পরস্পরকে মিষ্টিমুখের মধ্যদিয়ে প্রীতির ডোরে বেঁধে নেয়। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধন, দরিদ্র, বিধবা এবং বিপত্নীকদের মাঝে নতুন পোশাক বিতরণের মাধ্যমে শারদীয় দূর্গোৎসবকে করে তোলে সফল, সার্থক এবং প্রাঞ্জল। হিন্দু শাস্ত্র মতে দূর্গাপূজা অর্চনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে অন্যায়-অবিচারকে প্রতিহত করার এক অপ্রতিহত সিংহশক্তি হওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে বিধায় এটা শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। দূর্গা পূজা উপলক্ষে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পূজা সংখ্যা প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন পূজা সংগঠন পূজা স্মরণিকা প্রকাশের মাধ্যমে পূজার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মাহত্ব এবং গুরুত্ব তুলে ধরে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের পাশাপাশি নানা নান্দনিক রূপকল্পনার প্রতিফলন ঘটানো হয়। সার্বিকভাবে দুর্গাপূজা এক মিলন মেলার মহোৎসব এবং আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটায়। দূর্গা পূজার শারদীয় উৎসবের মেলাতে মৃৎশিল্প এবং কুটির শিল্পজাত পণ্যাদির বেচা-কেনা হয়। সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবীর লোক তাদের উৎপাদিত সামগ্রী মেলায় এনে বিক্রি করে। যেমন- ডালা, কুলা, ঝাকা, ঝাটা, ঝাড়–ন, চালুন, বেলুন, পিড়ি, বিভিন্ন ধরনের ধাতব পদার্থের দ্বারা তৈরি পণ্যসামগ্রী, কাঠের তৈরি বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন ধরনের খেলনা সামগ্রী। এছাড়াও নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, লটারি, জাদু প্রদর্শন, পুতুল নাচ ইত্যাদি নানান আয়োজনের মাধ্যমে মেলার স্থান সরগরম হয়ে উঠে। তবে দূর্গাপূজার উৎসবে মানুষের প্রধান আকর্ষন থাকে বিভিন্ন মিষ্টিজাত পণ্যের প্রতি। নানান মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসে মেলা। আর আগত ক্রেতারা কমবেশি সবাই মিষ্টি ক্রয় করে আপন আপন বাটিতে ফিরে। দূর্গা পূজা উপলক্ষে হিন্দু সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন নর-নারী নতুন পোশাকে নিজেদেরকে সুসজ্জিত করে দূর্গা পূজা উৎসবের আনন্দে মেতে উঠে। বিশেষ করে মেয়েরা দূর্গা পূজা শুরু থেকে শারদীয় উৎসবের শেষদিন পর্যন্ত টানা চারদিন রঙ-বেরঙের শাড়ি পরেন এবং শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে বিভিন্ন ধরনের জুয়েলারি ব্যবহার করেন। পাশাপাশি কপালে টিপ, হালকা মেকআপ এবং তার সঙ্গে খোপায় ফুলের মালা। ব্যাস; আর পূজার কটাদিন জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন সবাই। বিশেষ করে অষ্টমির সকালের ভোগের খিচুড়ি তার তো কোন জুড়িই নেই। এ ভোগ যেন সত্যিই স্বর্গীয় কোনো দেবী স্বর্গ থেকে এই মর্ত্যরে পৃথিবীতে এনে মানুষের মাঝে বিতরণ করেছেন। এ যেন স্বর্গীয় অমৃতের স্বাদ, এক অনন্য পরিতৃপ্তির স্বাদ।
পরিশেষে আমরা আমাদের সমাজের সর্ব প্রকার দমন, উৎপীড়ন, নিপীড়ন, নির্যাতন, নিস্পেষণ, অন্যায় এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে স্বর্গীয় অমীয় শান্তি স্থাপনের মধ্যদিয়ে সমাজের জন্য সার্বিক মঙ্গলজনক কাজ করব, এবারের দূর্গাপূজার প্রণামমন্ত্র থেকে এই হোক সকলের দৃঢ় অঙ্গীকার।
লেখক: অধ্যক্ষ, আড়ানী ডিগ্রি কলেজ