শাস্ত্রীয় সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র মঞ্জুশ্রী রায়

আপডেট: ডিসেম্বর ৩, ২০২১, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

খন্দকার মোঃ আব্দুস সামাদ:


বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র মঞ্জুশ্রী রায়। আমি শ্রীমতি রায়কে ‘দিদি’ বলে ডাকি। এতেই আমার বোধ স্বাচ্ছন্দ্যের ছায়ায় আশ্রয় নেয়। শ্রদ্ধেয় মঞ্জুশ্রী রায়ের সাথে আমার পরিচয় প্রায় সাড়ে তিন দশকের। তিনি একজন জাতশিল্পী ও উদার সত্তার মহীয়সী নারী। শিল্পীদের প্রতি তাঁর দরদ অসীম। কেউ বিপদে পড়লে স্বেচ্ছায় তাঁর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। দিদি অত্যন্ত বড় মনের মানুষ। তাঁর গুণের পরিসীমা মাপার যোগ্য ব্যক্তিত্ব আমি নয়। পরলোকগত আমার উস্তাদ মরহুম আব্দুল জব্বার উস্তাদজীর সাথে প্রয়াত উস্তাদ হরিপদ দাসের সঙ্গীত ভবনে উঠাবসায় তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। তখন আমি দুরন্ত কিশোর আট কি নয় কেলাসে পড়ি। তাছাড়া বেতারেও তাঁর সঙ্গে আমার বারংবার সাক্ষাৎ হয়েছে। এই গুণী মহিয়সী সম্পর্কে কিছু একটা লিখবো এটা আমার অন্তরের টান ছিল বহু দিন ধরে। আজ আল্লাহপাক তৌফিক দিয়েছেন তাই তাঁর সম্পর্কে দুটি কথা লিখছি এবং লিখতে পেরে নিজেকে খুব ধন্য মনে করছি।
শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে বেড়ে ওঠা মঞ্জুশ্রী রায় রাজশাহীর মেয়ে। ১৯৪৫ সালে বোয়ালিয়া পাড়ার সাংস্কৃতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা বীরেন্দ্র কৃষ্ণ রায় (বোম ভোলা রায়)। তাঁর বোন শ্রীবিজয়া রায়। তাঁকেও আমি ‘বিজয়া দি’ সম্বোধন করতাম। তাঁর ঠাকুরদা গোপাল রায় সুদূর উত্তর প্রদেশ থেকে এই রাজশাহীতে এসে জমিদারী কিনে স্থায়ীভাবে বসত স্থাপন করেন।
দিদির বাবা ছিলেন নাট্য ব্যক্তিত্ব, সংগীতানুরাগী এবং উপমহাদেশের বিখ্যাত সারদ বাদক রাধিকা মোহন মৈত্রের বন্ধু। শ্রীমতি রায়ের মা সরোজ দেবী ছিলেন নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার বাসিন্দা। দিদির মা তিনিও ছিলেন সংগীতের একজন ভক্ত অনুরাগী। তাঁর মামা ক্ষিতিশচন্দ্র রায় (মণিবাবু) একজন বিশিষ্ট নাট্যকার পরিচালক ও অভিনেতা ছিলেন। তাঁর প্রেরণায় শ্রীমতি রায় খদ্ধ হয়েছেন। বড়দা প্রাক্তন নির্মলেন্দু রায় ছিলেন আইজি,(প্রিজন)। তিনিও ছিলেন শিল্পানুরাগী মানুষ, ভালো নৃত্যশিল্পী। তিনি বিশ^খ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শংকরের ছাত্র ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি শচীন-নাগ ও রবি নাগের কাছে দীর্ঘ দিন নাচ শিখেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। “বোন” চিত্রা জহির ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্র নায়িকা। বোন বিজয়া রায় ছিলেন নিউ ডিগ্রী গভ: কলেজের অধ্যাপিকা এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী।
পারিবারিক সংগীত মন্ডলে জন্ম গ্রহণ করে শ্রীমতি রায় শুধু পরিবারকেই সমৃদ্ধ করেননি সমৃদ্ধ করেছেন দেশের সংগীতাঙ্গণকে। তাঁর সুললীত অনুপম প্রকাশ ভঙ্গি ও গায়কী তঁকে করেছে অন্যদের থেকে আলাদা, পেয়েছেন সাফল্য, সংগীত বোদ্ধাদের করেছেন ঋদ্ধ। বিশিষ্ট উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী প্রয়াত শচীন চাকী’র কাছে সংগীত চর্চা শুরু করলেও পরবর্তীতে দিদি প্রয়াত সংগীতাচার্য স্বনামখ্যাত শ্রী হরিপদ দাসের শিষ্যত্ব লাভ করেন এবং আগমনী রায় চৌধুরীরের কাছেও সংগীতে বিশেষভাবে তলিম গ্রহণ করেন। মজার বিষয় হচ্ছে এই আগমনী রায় চৌধুরী-ই সংগীত গুরু সংগীতাচার্য প্রয়াত শ্রী হরিপদ দাস মহাশয়ের কাছে শ্রীমতি রায় দিদিকে শাস্ত্রীয় সংগীত তালিমের জন্য অর্পন করেন। প্রঙ্গত বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত উস্তাদ নাজাকত আলী ও উস্তাদ সালামত আলী এবং পশ্চিম বঙ্গের উচ্চাঙ্গ সংগীত সাধক উস্তাদ এ দাউদ এবং উস্তাদ সগীর উদ্দীন খাঁন সাহেবের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নিয়ে মুন্সিয়ানার সার্থক প্রমাণ স্থাপন করেন। সংগীত সাধনার দীর্ঘ পরিক্রমায় এই অর্জন সত্যি তাঁর জীবনের মহামূল্যবান অর্জন।
শ্রী রাধিকা মোহন মৈত্রের ভাই রবীন্দ্রনাথ মৈত্র (হাবু)’র কাছে ছন্দ, মাত্রা, তাল, যন্ত্রজ্ঞান ভালভাবে অর্জন করতে সক্ষম হন। প্রয়াত গোপাল চন্দ্র দাস, মটা রায় চৈৗধুরী তাঁকে তালযন্ত্রে বিশেষ ভাবে তালিম দেন। এই উপমহাদেশের আর একজন গুণী ব্যক্তি বেহালা বাদক স্বর্গীয় পন্ডিত রঘুনাথ দাস। দাদা রঘুনাথ দাস বাংলাদেশ বেতারের একজন নিজস্ব শিল্পী ছিলেন। আমি এই দাদা বাবুর কাছে কৃতজ্ঞ কারণ বেতারে সঙ্গীত পরিবেশন কালে আমার গানে তিনি বেহালা বাজিয়েছেন। এই দাদা বাবুর কাছেও শ্রী মঞ্জু দিদি তালিম নিয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘এই রাগ সঙ্গীতে পুরোধা বলা যায় প্রয়াত রঘুনাথ দাসকে’ আসলে তো বেহালার সুর করুণ সুর। মনের আকুলতা ব্যকুলতা যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা শুধু কঠিন নয় বেশ দুরুহও বটে।
মঞ্জু দিদি ১৯৬৫ সালে তদানীন্তন রেডিও বাংলাদেশ এবং ১৯৭২- সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি তথানীন্তন পূব্র্ পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্স উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম স্থান লাভ করেন। তা প্রশংসার দাবী রাখে বৈ কি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-সহ রাজধানী ঢাকায় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করে ভূয়সী প্রশংসা ও খ্যাতি লাভ করেন।
তিনি ইতোমধ্যে সারোয়ার জাহান স্মৃতি সংসদ (রাজশাহী থিয়েটার) রাজশাহী সাংস্কৃতিক সংঘ, শিল্পাশ্রম, ললিত কলা একাডেমী, সংগীত শিক্ষা ভবন কর্তৃক সংবর্ধিত হয়েছেন। বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন। তাই গর্ব করে বলতে ইচ্ছে হয় সেই দিনের সেই মঞ্জুশ্রী রায় আজ গর্বের প্রতীক। অহংকারের চাঁদতারা। হৃদয় আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। মঞ্জুশ্রী রায়’র নিজ হাতে গড়া সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে “শ্রী সংগীতালয়” এখন মণিমানিক্য ভরা ভা-ার বলা যেতে পারে। এই সংগীত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে সংগীত পরিবেশন করে সুখ্যাতি অর্জন করেছে আর তা আজও অব্যাহত । আমি স্নেহ পরশে বড়ই ধন্য। দিদির অন্তর মা’র মতন, মায়ের ¯েœহ, বোনের আদর, আর শিক্ষকের সযতœ পরিচর্যা দিয়ে তিলেতিলে গড়ে তুলেছেন। এখানকার শিক্ষার্থীরা অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে
কৃতিত্বে সাক্ষর রেখেছে। দিদির দীর্ঘ জীবন ও সাফল্য কামনা করি।