শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়ির ঐতিহাসিক কাছারি ঘরটি এখন ধ্বংস প্রায়

আপডেট: আগস্ট ৮, ২০২০, ১:৪০ অপরাহ্ণ

হাবিবুর রহমান স্বপন :


সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস চলে গেল। জামিদারি কাজের সুবাদে রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কাছারিবাড়িতে এসেছেন বহুবার। জমিদারি কাজের জন্য শাহজাদপুর আসলেও এ অঞ্চলের মাটি আর মানুষের সাথে ছিল কবির ভালবাসার সম্পুরক। রবীন্দ্র স্মৃতি বিজরিত সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর কাছারিবাড়িটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে তবে আশ্চর্য হলেও সত্য এখনো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি ঐতিহাসিক কাছারি ঘরটি।
রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবারির ঐতেহাসিক কাছারি ঘরটি সংস্কার আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ধ্বংসের দারপ্রান্তে। জমিদারি কাজের সূত্রে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে কাছারিতে আসতেন কবিগুরু রবিন্দ্রানাথ ঠাকুর, আর এ কাছারি ঘরকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় ঐতিহাসিক রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি।
সরকারি উদ্যোগে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কাছারিবাড়ির পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করা হলেও এখনো অবহেলিত ঐতিহাসিক কাছারি ঘর। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রজাদের সাথে কবিগুরুর মধুর স্মৃতি। কবিগুরুর স্মৃতি ধরে রাখতে ধ্বংসের দারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া ঐতিহাসিক কাছারি ঘরটি পুরাকীর্তি হিসেবে দ্রুত সংরক্ষণ এর দাবি জানিয়েছে রবীন্দ্রভক্ত আর গবেষকগণ ।
সরেজমিন শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি ঘুরে দেখা গেছে কাছারিবাড়ির পশ্চিম দিকের মূল কাছারি ঘরের বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। কাছারি ঘরের পুরনো ওয়ালের বেশিরভাগ অংশই ধ্বসে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে কাছারি ঘরের পুরনো দরজা জানালা। মেরামত আর সংরক্ষণের অভাবে মূল কাছারি ঘরটি পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ভবনে।
সংরক্ষণ করা না হলেও পরিত্যক্ত এ কাছারি ঘরের দেয়ালে একটি সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যাতে করে কাছারিবাড়িতে ভ্রমণ করতে আসা দর্শনার্থীরা সহজেই বুঝতে পারে যে এটিই ছিল কবিগুরু রাবীন্দ্রানাথ ঠাকুর-এর ঐতিহাসিক কাছারি ঘর। এখানেই প্রজারা আসতেন খাজনা দিতে আর কবিগুরুর সাথে তাদের সুখ দুখের কথা বলতেন।
রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবিন্দ্র কাছারিবাড়ির ঐতিহাসিক কাছারি ঘরের এমন দুর্দশায় মর্মাহত কবিগুরুর ভক্ত আর রবিন্দ্র গবেষকগণ। স্মৃতি ধরে রাখতে অবিলম্বে ঐতিহাসিক কাছারি ঘরটি সংস্কার আর রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রবিন্দ্রগবেষক প্রফেসর নসিম উদ্দিন মালিথা বলেন, “রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর এই এলাকায় জমিদারি কাজে আসেন, শাহজাদপুরের মাটি আর মানুষ কবিকে আপ্লুত করেছে। খাজনা দিতে আসা প্রজাদের কাছে তাদের সুখ দুখের কথা শুনে কবি তাদের খাজনা মউকুফ করতেন। তাদের জীবনের সুখ দুঃখের অভিজ্ঞতা নিয়ে কবি তার অনেক লেখায় তুলে ধরেছেন। আর এ সবই হয়েছে ঐতেহাসিক কাছারি ঘরকে কেন্দ্র করেই।
কবিগুরুর পরিপূর্ণ স্মৃতি ধরে রাখতে অবিলম্বে কাছারি বাড়ির মত কাছারি ঘরটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংস্কার আর রক্ষণেবেক্ষণের দাবি জানান।
ঐতিহাসিকদের মতে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৪০ সালে নাটোরের রাণি ভবানির কাছ থেকে শাহজাদপুরের জমিদারি ক্রয় করেন। পরে এ জমিদারি উত্তরাধিকার সূত্রে কবিগুরুর উপর ন্যস্ত হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর বহুবার শাহজাদপুর কাছারি বাড়িতে আসেন জমিদারি কাজের জন্য। তবে জমিদারির চেয়ে এ অঞ্চলের মাটি আর মানুষ কবির কাছে বেশি প্রিয় ছিল। কবিগুরুর সাহিত্য কর্মের অনেক অংশ জুড়েই রয়েছে এর প্রভাব।
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ডক্টর আব্দুল মজিদ বলেন কবিগুরু তার বিসর্জন, সোনার তরি, চিত্রা, চৈতালি, গোলাপগুচ্ছ, ছিন্নপত্র, পঞ্চভুতের ডায়রি সহ অনেক কাব্যগ্রন্থ এই শাহজাদপুর কাছারিবাড়িতে লিখেছেন। লিখেছেন ‘ছুটি’, ‘পোস্টমাষ্টার’, ‘দেনা পাওনা’ এর মতো কালজয়ী গল্প সমূহ।
কবিগুরু তার নিজ লেখনিতে শাহজাদপুর কাছারিবারির প্রশংসা করেছেন। কবিগুরু তার ভাতিজি ইন্দিরা দেবির কাছে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, “আমি এখানে লেখার এমন অনুপ্রেরণা পাই যা অন্য কোথায়ও পাইনা ”।
কবিগুরুর শাহজাদপুর কাছারিবাড়ির মূল কাছারি ঘারটি সংস্কার আর সংরক্ষণ করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে কবিগুরুর জীবন, কর্ম এবং তৎকালীন সময়ের জীবনযাত্রার অনেক কিছুই জানা যাবে বলে মনে করেন জনাব মজিদ।
শাহজাদপুর কাছারিবাড়ির কাস্টডিয়ান মো. জায়েদ হোসেন বলেন, কবিগুরুর মূল কাছারি ঘরটি সংস্কার আর সংরক্ষণ করার জন্য ইতোমধ্যে প্রতœতত্ত বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রতœতত্ত বিভাগের প্রকৌশলিরা পরিদর্শন করে মতামত দেয়ার পর তাদের ডিজাইন অনুসারে কাজ শুরু হবে।
তবে কবে নাগাদ প্রকল্প অনুমোদন হয়ে সংস্কার আর সংরক্ষণ কাজ শুরু হবে সে ব্যাপারে কাছারিবাড়ির কাস্টডিয়ান মো. জায়েদ কিছু জানাতে পারেন নি।