শিক্ষক মারামারির ভূমিকায়

আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। তারা মানুষ গড়ার কারিগর। একজন আদর্শ মানুষ গড়তে একজন আদর্শ শিক্ষকের বিকল্প নাই। শিক্ষকরা মোমবাতির মত নিজে পুড়ে অন্যকে শিক্ষার আলো দান করেন। তাদের শিক্ষা মানুষের দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে, ভবিষ্যত পুনঃনির্মাণে সাহায্য করে। পেশাগত দায়িত্ববোধ, মেধা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতায় পরিপূর্ণ শিক্ষক হচ্ছেন দেশ ও জতির অনন্য সম্পদ।
শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, একটি মহান ব্রত। জ্ঞান, দক্ষতা, সততা, আদর্শ, মুল্যবোধ এই শব্দগুলোর সাথে যেন শিক্ষক শব্দটির যোগসুত্র ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষকরা ২৪ ঘণ্টাই শিক্ষক। একজন শিক্ষকের চলাফেরা, আচার-আচরণ হবে ছাত্রদের- এমনকি গোটা জাতির জন্য অনুকরণীয়। শিক্ষকদের গুন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে লিখে শেষ করা যাবেনা। আদর্শ শিক্ষক নিয়ে বহু গল্প কবিতা রচনা হয়েছে যা পাঠ্যপুস্তকে পাওয়া যায়। আমাদের গুরুজনদের ও অভিভাবকদের মুখে শুনেছি আদর্শ শিক্ষকদের কাহিনী। তাদের শিক্ষণের অভিনব পদ্ধতি, তাদের ত্যাগ, মোলায়েম ব্যবহার এবং নিঃস্ব হয়ে জীবনদানের ঘটনা। আমরাও আমাদের জীবনে বহু অনুকরণীয় শিক্ষকদের দর্শন পেয়েছি। কোনো লোভ-লালসা যাদের শিক্ষকতা পেশা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। অনেক শিক্ষক যৎসামান্য পারিশ্রমিকে এমনকি বিনা পারিশ্রমিকেই শিক্ষাদান করে জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আজকাল সেগুলো শুধু কল্পনা করা যায়। বাস্তবে দেখা যায়না। এখন শিক্ষকতা পণ্যে পরিণত হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষকদের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো এলাকার লোকজনদের দেওয়া সাহায্য সহযোগিতায় এবং থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হতো অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্তের বাড়িতে। ততদিন পর্যন্ত শিক্ষকতা পণ্য হয়নি। যখন সরকারি বেতনে শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হলো তখন থেকে শিক্ষকরা আর্থিক দৈনতা থেকে মুক্তি পেলেও আদর্শের জায়গা থেকে ক্রমশ দূরে সরতে থাকলো। এরপর প্রাইভেট পড়ানো, কোচিং সেন্টার প্রভৃতির প্রসার ঘটলো। তখন থেকে শিক্ষকতাকে পুরোপুরি পণ্যে পরিণত করলো। এরসাথে যুক্ত হলো স্কুল ও কলেজে শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দেওয়ার প্রথা। যা এই মহান পেশাকে কলুষিত করলো, একেবারে নি¤œ স্তরে নিয়ে এলো। এ লড়াইয়ে আদর্শ শিক্ষকদের ঠাঁই হলোনা। শিক্ষকতার জগতটাকেই ছেড়ে যেতে হলো। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠলো গভর্নিং বডি নির্ভর এবং সেই গভর্নিং বডির সদস্যদের লেখাপড়া ও মর্যাদার মাপকাঠি থাকলো না। তারাই হলো শিক্ষক নিয়োগ কর্তা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উপাচার্য হওয়ার জন্য রাজনৈতিক যোগ্যতা, লবির প্রভাব, সহযোগিতা ও পাশাপাশি আর্থিক যোগ্যতার প্রয়োজন হয়ে পড়লো। এটাও চলছে কয়েক দশক ধরে। ফলে আদর্শ শিক্ষক হওয়ার যে যোগ্যতা বা মাপকাঠি তা গৌন হয়ে গেল পেশাটা হয়ে গেল কেনাবেচার সামগ্রী। ডোনেশন দাতা ও গ্রহিতা পরস্পরের কাছে দায়বদ্ধ হলো, জবাবদিহি দুর্বল হলো ফলে যারা টাকা ঢেলে শিক্ষকের নিয়োগ পেলেন তাদের আদর্শ শিক্ষক হওয়ার মনোভাবটাই নিস্প্রভ হয়ে গেল। বইয়ের পাঠদান হলো যেনেতেন প্রকারের আর আদর্শ ছাত্র গড়ার কাজটি পুরোপুরি গৌন হয়ে গেল।
মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি বহুকালথেকেই আছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ব্যাপক দুর্নীতির খবর আসছে সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে। যারা এই দুর্নীতির বিচার করবে সেখানেও দুর্নীতি ঘাপটি মেরে বসে আছে। এসব ভয়ঙ্কর পরস্থিতির কুফল ভোগ করছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষকরাও তাদের স্বাত্যন্ত্র বজায় রাখতে পারছে না। লাল, নীল, সাদা দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত এবং সুযোগ সুবিধা খুঁজতে ব্যস্ত ।
শিক্ষকতা পেশার এমন অবক্ষয়ের পাশাপাশি যদি শিক্ষক শিক্ষকে মারামারি হয়, মামলা- পাল্টা মামলা হয় তাহলে শিক্ষকতার কিছু বাকি থাকে কি ? এমনটাই হয়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী সরকারি কলেজে। জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৯ আগাস্ট বিকেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কলেজের শিক্ষক কর্মচারী ও গভর্নিং বডির সদস্যদের উপস্থিতিতে সভা চলাকালীন সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় ৭/৮ জন লোক দলবদ্ধভাবে অধ্যক্ষ আবদুর রহমানের উপর হামলা চালায় ও অধ্যক্ষকে মারধর করে। এ প্রেক্ষিতে অধ্যক্ষ, কলেজের উপাধ্যক্ষ উমরুল হক সহ ১১ জন শিক্ষককে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু গোদাগাড়ী পুলিশ উল্লিখিত আসামীদের অজ্ঞাত দেখিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এই অভিযোগপত্রের উপর বাদি পক্ষের আইনজীবী নারাজির আবেদন করলে মামলার তদন্ত ভার পিবিআইকে দেওয়া হয়। পরে পিবিআই তদন্ত রিপোর্ট জমা দিলে রাজশাহীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অভিযুক্ত ১১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর কিছুদিন পরে গভর্নিং বডির অভিযোগের প্রেক্ষিতে অধ্যক্ষকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগুন ধুমায়িত হতে থাকে এবং এরই জের ধরে প্রায় ৩ বছর পরে চলতি বছরের ২১ অক্টোবর কলেজের কিছু শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে (উমরুল হক যিনি অধ্যক্ষ আব্দুর রহমানকে মারধর করার অন্যতম আসামী) মারধর, তার কক্ষের আসবাবপত্র ভাংচুর সহ তাকে অফিসকক্ষে তালা মেরে বন্দি করে রাখে। গোদাগাড়ি থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা ভেঙে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ১২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এর মধ্যেকার ক্ষমতা অর্থ স্বার্থের দ্বন্দ্বে শিক্ষকরা বিভক্ত হয়ে একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়েছে এবং কলেজের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে বিঘিœত করেছে।
এ লজ্জাজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ২৪ অক্টোবর কলেজের সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন সহ গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। স্মারকলিপিতে বলা হয় অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে কলেজে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং কলেজের লেখাপড়া বিঘিœত হওয়া সহ স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। এমতাবস্থায় কলেজের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আনীত মামলা প্রত্যাহার সহ কলেজে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়। দুঃখজনক ও লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে যে শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব-কলহ অবসানের জন্য শিক্ষার্থীদের পথে নামতে হয়েছে। কলেজের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা নিজেদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ লজ্জা শুধু গোদাগাড়ী কলেজের নয়, সারা দেশের শিক্ষকদের জন্য লজ্জা। এছাড়া দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কদিন আগেইতো ঢাকার ভিখারুন্নেসা স্কুলে এমন ঘটনা ঘটেছে। তাই সকল স্তরে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশন গঠন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ডোনেশন প্রথা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুররি। অন্যথায় আদর্শ শিক্ষকের আদর্শ মানুষ গড়ার কাজটি সম্পন্ন হবে না।
লেখক সাংবাদিক