শিক্ষার্থীদের অনলাইন আসক্তি নিয়ে চিন্তিত অভিভাবক!

আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২১, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম :


দীর্ঘ সময় ধরে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি ভার্চুয়াল বিনোদনে মেতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজ খুললেও পড়াশোনার চেয়ে ভার্চুয়াল বিনোদনেই বেশি সময় অতিবাহিত করছে অনেক শিক্ষার্থী। সন্তানের এমন ভার্চুয়াল বিনোদনের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা। এই আসক্তি থেকে সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষায় বিভিন্ন পলিসি নিচ্ছেন রাজশাহীর সচেতন অভিভাবক। সৃজনশীল কর্মকা-, ইনডোর গেমের পাশাপাশি এখন সৌখিন কৃষিতে আকৃষ্ট করছেন অনেক সচেতন অভিভাবক। ছাদ কৃষি, অ্যাকুরিয়ামে মাছ চাষ, পাখি পালনেও উৎসাহ দিচ্ছেন তারা। যেটিকে সন্তানের মানসিক বিকাশকে ত্বরান্বিত ও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন মনোবিশেষজ্ঞরা।

অভিভাবকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এর নেতিবাচক যে দিকগুলো আছে বা শিক্ষার্থীদের উপর পড়েছে তা এখন স্পষ্ট হচ্ছে। অনলাইন আসক্তি তৈরি হয়েছে। স্কুল-কলেজ খুললেও এখনো আসক্তি কমে নি। সন্তানের জীবনযাপন রুটিনের পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে গভীর রাত পর্যন্ত অনলাইনে আড্ডা দিচ্ছে। দেরি করে ঘুম থেকে উঠছে। মানসিকভাবেও ডিপ্রেশনে ভুগছে। শারীরিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ছে। একারণে তারা সন্তানকে ইতিবাচক সৌখিন ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করছেন। ইট-পাথরের শহুরে জীবনে ছাদ কৃষি, অ্যাকুরিয়ামে মাছ চাষ, পাখি পালন এর মধ্যে অন্যতম।

নগরীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত সাইফুল ইসলাম। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে রফিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নগরীর অ্যাকুরিয়াম গ্যালারিতে মাছ কিনতে দেখা যায় তাকে। তিনি জানান, করোনায় দীর্ঘ সময় অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে অনলাইন বিনোদনেও আসক্ত হয়ে পড়েছে ছেলে রফিকুল। আর বাসার বাইরে খেলাধুলার তেমন সুযোগ নেই। এতে বাড়িতেই সারাদিন পার করতে হয় তার ছেলে-মেয়েকে। তাই ছেলের ফোন আসক্তি থেকে কিছুটা দূরে রাখতেই অ্যাকুরিয়াম মাছ কিনতে এসেছেন।

তিনি আরও জানান, তার চার বছরের ছোট মেয়েও এই মাছ খুব পচ্ছন্দ করে। ছেলেও মাছ ভালোবাসে। আর অ্যাকুরিয়ামের এই মাছ বাসার সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি মানসিক স্বস্তিও দেয়। আর শুধু মাছ নয়- রুমের জন্য বেশকিছু গাছও কিনেছেন তিনি।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম জানান, তার বাসায় অ্যাকুরিয়াম আছে। তিনি নতুন করে আরও কিছু মাছ কিনতে এসেছেন। এই মাছ চাষের পাশাপাশি তার ছাদ বাগানও রয়েছে। পাড়াশোনার পাশাপাশি ছাদ বাগান ও এই মাছের পরিচর্যায় সময় কাটাতেই ভালোলাগে তার।

নগরীর বর্ণালী মোড়ে অবস্থিত অ্যাকুরিয়াম ব্যবসায়ী আব্দুল গণি জানান, অ্যাকুরিয়াম বাসাবাড়ি, অফিস সবজায়গার সৌন্দর্য বর্ধন করে। করোনাকালে তাদের ব্যবসা কম থাকলেও এখন আবারও বেচাবিক্রি বেড়েছে। আর তার দোকানের অধিকাংশ ক্রেতাই বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থী। অনেক শিশু তাই অভিভাবককে নিয়ে আসেন। সৌখিন মানুষরা এই মাছ চাষ করে। মাছ চাষ তেমন ঝামেলাপূর্ণ নয়। নিয়ম মেনে খাবার দিলেই ভালো থাকে।

দেশের ইন্টারনেট সেবা দাতাদের সংগঠন আইএসপিএবি এর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ২ হাজার ৬০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথের অর্ধেকই ব্যয় হচ্ছে ভার্চুয়াল গেম, টিকটক, লাইকি ও পর্নোগ্রাফি দেখার পেছনে। এমন পেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ও ইন্টারনেটের নেতিবাচক দিকগুলো এড়িয়ে যেতে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি এমন কাজগুলোকে ইতিবাচক হিসেবেই উল্লেখ্য করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মনোবিশেষজ্ঞারা বলছেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। যারা ইন্টারনেটের সঙ্গে কানেকটেড। এতে তারা ইন্টারনেটের ভালো কন্টেন্ট বা ইতিবাচক বিষয়গুলোর পাশাপাশি খারাপ বিষয়গুলোতেও আকৃষ্ট হওয়ার মতো সুযোগ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে সচেতন অভিভাবকরা সন্তানের প্রতি নজরদারি রাখলেও একটি বড় অংশ এর বাইরে থাকছে। এসময় শিক্ষার্থীদের বিনোদনের জন্য খেলাধুলার পাশাপাশি ছাদ কৃষি, অ্যাকুরিয়ামে মাছ চাষ, পাখি পালন এগুলো খুবই ইতিবাচক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শীরি ফারহানা জানান, বর্তমানে ইন্টারনেটে সবকিছুই মুক্ত। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর উপর নির্ভর করে সেটা সে কী কাজে লাগাবে। আর করোনাকালে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা অলস সময় বেশি পাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, কথায় আছে- ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। সুতরাং শিক্ষার্থীদের নজরদারির বাইরে যদি অলস সময় কাটাতে দেয়া হয় তাহলে তারা গেমে বা অন্য খারাপ বিষয়েও আসক্ত হতে পারে। আর বর্তমানে পাবজি, ফ্রি-ফায়ার আসক্তি মহামারীর মতোই ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি আরও জানান, তার পাঁচ বছরের একটি সন্তান আছে। সে অনলাইন গেম এখনো ভালোভাবে বুঝে না উঠতেই আসক্তি তৈরি হয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই গেম খেলতে শুরু করে। এক্ষেত্রে তিনি তার ছেলেকে ইনডোর সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত রাখতে চেষ্টা করেন। আর এই সময়ে শিশুর ডিপ্রেশন দূর করতে ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা, ছাদাবাগান বা অন্যান্য ভালো কাজে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ