শিক্ষার আলো

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশে সরকারের শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে গৃহীত নানা পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষ শিক্ষাবঞ্চিত। সরকার গৃহীত নানা শিক্ষা প্রকল্প ইতিপূর্বে অকার্যকর হয়েছে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে। শুধু পরিকল্পনাই নয়, দূরদর্শিতার অভাবও ছিল। এখনও সরকার শিক্ষার প্রসারে যে বহুমুখি জনবান্ধব প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
জানার বা শেখার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এক সময় এদেশের মানুষ বিশেষ করে মেয়েরা সুবিধাবঞ্চিত ছিল। খুব কষ্ট হয় তাদের জন্য। অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘আমি মূর্খ। পড়ালেখার সুযোগ পাইনি। কিন্তু আমার মেয়েকে মূর্খ করে রাখবো না। চোখ থাকতেও অন্ধ আমি। আমার মেয়েকে আমি লেখাপড়া শিখিয়ে তার অন্ধত্ব দূর করবে।” ভাবলে অবাক হতে হয় যাঁরা একথাগুলো বলেছেন, তাদের মেধা, চিন্তা- চেতনা, বাস্তবতা বোধ, সততা দয়া, কর্মব্যস্ততা, দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ, ত্যাগ, বুদ্ধি-বিবেচনা দেখলে মনেই হয় না ওইসব মায়েরা কখনো স্কুলে পড়েননি। রক্ষণশীল সে সময়েও কেউ কেউ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন হাতে গোনা- তাঁরা তাঁদের প্রখর স্মৃতিশক্তি বিস্মিত করে সবাইকে। মা, ঠাকুমা বা অন্য কারো কাছে শোনা ৭০/৭৫ বছর আগের কবিতা, ছড়া, গল্পগুলো অবলীলায় তাঁরা বলে যেতে পারেন। আমি এমন একজন মহীয়সী মায়ের কথা জানি, যিনি লিখতে কিংবা পড়তে পারতেন না। কিন্তু অনায়াসে “মনসা মঙ্গলের’ মত বইয়ের কোন পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে পৃষ্ঠা উল্টানোর আগেই তিনি গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন। শুধুমাত্র শুনেই তিনি মনে রাখতে পারতেন সবকিছু। অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই তাঁকে। ওই সময়কার প্রায় কেউই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও তাঁদের মেধা ছিল তীক্ষ্ম ও প্রখর। এ যুগে কোচিং আর মডেল টেস্টের বদৌলতে “গোল্ডেন এ প্লাস” পাওয়ারা নিঃসন্দেহে হার মানত যদি এঁরা লেখাপড়ার সুযোগ পেতেন। বিপত্তি দেখা দিত যখন এসব-মায়েদের বিয়ে হতো শিক্ষিত পাত্রের সাথে। বিড়ম্বনার শেষ থাকতো না তাদের। কেউ কেউ বা খুব যত্ন করে তাঁদের স্ত্রীদের গোপনে শিক্ষার ব্যবস্থা করতেন। সেটা হাতে গোনা। আমরা রবি ঠাকুরের সহধর্মিনী মৃনালিনী দেবীর শিক্ষার কথা জানি। সে অবশ্য বেশ আগেকার কথা। তাছাড়া পরিবার তো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের! এটা নিতান্তই ব্যতিক্রম। যাঁরা তাঁদের শিখবার ইচ্ছা দমন করে সংসার সাগরে নিমগ্ন থেকেছেন-তাঁরা একরকম বেঁচে গেছেন। কিন্তু যাঁরা সারা জীবন এ অতৃপ্ত তৃষ্ণা নিয়ে ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেছেন বড় দুঃখ হয় তাদের জন্য।
প্রকৃত অর্থে সময় পাল্টেছে। মানুষের চিন্তার জগৎ খানিকটা উন্নত হয়েছে। পত্রিকা মারফত যখন জানতে পারি বয়োঃবৃদ্ধ এক ভদ্রমহিলা বই-খাতা নিয়ে নাতি-নাতনি বয়সী ছেলেমেদের সাথে স্কুলে যান নিয়মিত- খুব ভালো লাগে। গত এসএসসি পরীক্ষায় ছেলের সাথে পরীক্ষা দিয়ে যখন মা-ছেলে উত্তীর্ণ হলো হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছিল চারিদিকে। ধন্যবাদ জানাই সে মাকে তাঁর অদম্য ইচ্ছার জন্য। এবারে এইচএসসি পরীক্ষাতেও নাটোর থেকে মা-ছেলে যখন এইচএসসি পাস করলো চারিদিকে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। শুধু মা শাহনাজ পারভিনই নয় তার চাচাতো বোন মমতা হেনাও এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে। শাহনাজ ২২ বছর পরে ও হেনা ২৪ বছর পরে পরীক্ষা দিয়ে এ বিরল কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছেন।
নারীদের মতো অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাবঞ্চিত থাকে কিংবা সমাজের অবহেলিত/উপেক্ষিত শ্রেণিভুক্ত হয়ে থাকে প্রতিবন্ধীরাও। এক্ষেত্রেও সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এ শ্রেণি অবহেলিত থাকার মূলে পরিবারের সদস্যদের নেতিবাচক ভূমিকাই বিশেষভাবে দায়ী। সহযোগিতা ও সুযোগ পেলে তারাও দেশের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। হাতীবান্ধার শাহ আলম আঙ্গুলবিহীন হাতে কব্জি দিয়ে লিখে এইচএসসি পাস করলো। ধন্য ছেলে। পাবনার ৭ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শ্রুতি লেখকদের সাহায্য নিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে। সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের সুদৃষ্টি যেন তাদের ওপর থাকে। তাহলে তারা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল উদ্যেশ্য মানবিক শিক্ষায় আলোকিত হওয়া। এটি অতি
অবশ্যই স্মরণীয়।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মনের কলুষতা দূর করে। তাকে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, লালসা, মিথ্যা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পরনিন্দা, পরচর্চাসহ সব খারাপ দিক থেকে মুক্ত রাখে, জ্ঞানের আলোয় পথ চলতে সাহায্য করে। যেহেতু সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার এবং প্রধান শিক্ষক মা (অন্যান্য সদস্যরাও), তাই নারী শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। একজন শিক্ষিত মা এবং ভালো মা-ই পারেন একজন ভালো সন্তান উপহার দিতে। শিক্ষায় কোনো বৈষম্য নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শতভাগ পাসের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ানোর শিক্ষার হার কমলেও শিক্ষার মান বাড়বে নিঃসন্দেহে। শিক্ষার মান বাড়লে শিক্ষার গুরুত্ব-বাড়বে এবং আমাদের সন্তানেরা শেখার প্রতি বেশি মনোযোগী হবে। শুধুমাত্র পাঠ্যবই পড়ে মুখস্থ করে ভালো রেজাল্ট করলেই প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা-এ ভাবনাটি ভুল। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের আচার-আচরণে পরিবর্তন আনে। তাকে জ্ঞানী, ভদ্র, নম্র, বিনয়ী, মানবদরদী, নিঃস্বার্থ ও জনহিতৈষী করে গড়ে তোলে। মনের ক্ষুদ্রতা ও অন্ধত্বকে বিসর্জন দিয়ে সত্যের আলোয় পথ চলতে শেখায় প্রকৃত শিক্ষা। পথ চলতে শিখতে হবে সত্যের আলোয়। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পরহিতে কাজ করতে হবে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ জ্ঞানের চর্চা এবং সত্যানুসন্ধান। চোখের আলো নিভে গেলেও জ্ঞানের আলো, শিক্ষার আলো সহায়ক হবে নির্ভয়ে পথ চলার এবং সুন্দর আগামী গড়ায় অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করায়। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে এ জাতি ও দেশ এগিয়ে যাবে-এ আমাদের প্রত্যাশা।