শিক্ষায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ কাম্য নয়

আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০২২, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


মহামান্য রাষ্ট্রপতি মাঝে মাঝে আমাদের শিক্ষার চালচিত্র এবং শিক্ষক-মানসিকতা প্রত্যক্ষ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। যে উদ্বেগ কখনো মধুর রসিকতায় কখনো আবার গুরুগম্ভীর। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার যে ঔদাসীন্য আছে, তা বোধকরি প্রমাণের অপেক্ষা রাখেনা।
রাষ্ট্র ও সমাজের সবকিছু চালিত হয় সম্মিলিত সমঝোতার নিরিখে। এখানে কোনো একটিতে দুর্বলতা দেখা দিলে সমাজ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আমরা ভঙ্গুরতার পথে পা বাড়াতে চাইনা। শিক্ষা ও শিক্ষক সমাজকে আমরা জাতীয় কল্যাণে নিরাসক্তভাবে নিবেদিত দেখতে পেলেই বোধকরি কোনো অভিযোগ আমাদের কুণ্ঠিত করবে না।
পূর্ব বাংলার মানুষের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্বশাসিত হবার সুযোগ প্রাপ্তির বয়স অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হলো। মাঝে মাঝে ধূলিঝড় পরিবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে, তবুও এ সময় একেবারে কম নয়। তবে নিরবধি কালের তুলনায় এসময় পরমাণুতুল্য। সময় নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে আমরা ফিরে দেখি শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের কতখানি কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়েছে এবং কতটুকু আমরা মানবিক হয়ে উঠেছি। তার আগে আমাদের রাষ্ট্রের অভিভাবক, শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য প-িতবর্গের সাম্প্রতিক মনোভাব আমরা আঁচ করে দেখতে পারি।
১১-১২-২০২১ তারিখের কালের কণ্ঠের ২য় পাতায় একটি শিরোনামে রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের শিক্ষা সম্পর্কিত গভীর উপলব্ধি আমরা স্মরণ করতে পারি। তাঁর বক্তব্য: ‘উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে সাজাতে হবে’। সম্ভবতঃ এই বক্তব্যের প্রেক্ষিত হলো: ১০-১২-২০২১ তারিখের কিছু বিদগ্ধ শিক্ষকের শিক্ষা সম্পর্কিত উপলব্ধির চৌম্বিক বয়ান। তাঁরা হলেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রমুখ শিক্ষক। তাঁরা মনে করেন ‘শিক্ষাঙ্গণের উন্নতি চাইলে রাজনীতির উন্নতির উন্নয়ন দরকার।” আমরা সবার দৃষ্টি-ভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমাদের কিছু উপলব্ধির কথা সবিনয়ে বলবো।
মানুষ গোষ্ঠিবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে কিছু কিছু নিয়ম চালিত করেছে। সে সবের ব্যতিক্রম হয়না তা নয়, তবে শিক্ষা এবং শিক্ষকতার বোধগুলো অনেকটা চিরন্তন।

শিক্ষা বিতরণ যে সর্বাপেক্ষা মহৎ ব্রত সে সম্পর্কে কতিপয় ধান্দাবাজ ছাড়া প্রায় সবাই একমত। সেই মহৎ ব্রত ধীরে ধীরে পেশায় এবং পেশাধারীরা নতজানু দাসানুদাসে পরিণত হবে, সে ভাবনা বোধকরি আমরাই প্রথম প্রত্যক্ষ করছি। শিক্ষক হবেন নিরাসক্ত। সমাজপতিরা তাঁকে বরণ করবেন শ্রদ্ধাবনত চিত্তে। সে অবস্থা এখন কল্পলোকের।
আগের ইতিহাসের পথে আমরা হাঁটবো না। এই যে, গত শতকের গোড়ার দিকে দেখা গেছে গুণিজনদের আমন্ত্রণ জানানো হতো প্রকৃত শিক্ষক জেনে। ড. শহীদুল্লাহকে সসম্মানে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় স্বয়ং তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। সৈয়দ মুজতবা আলী এবং মওলানা জিয়াউদ্দিনকে বিশ্বভারতীতে নিয়োগ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ কেবল ঔদার্য দেখান নি, প্রকৃত শিক্ষার কর্ণধার নির্বাচনে বৈদগ্ধের পরিচয় দিয়েছেন। পক্ষান্তরে প্রখ্যাত পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর জামাতা কুঞ্জলাল ঘোষকে তিনি সহানুভূতি দেখাতে পারেন নি। এরও মূলে ছিলো সর্বজনীন প্রকৃত শিক্ষা। গোটা বিশ শতক পর্যন্ত সে ধারা ভালয়-মন্দয় মিশ্রিত ছিলো। এখন দিন দুপুরে সাগরচুরি। কোনোভাবে খাতায় নাম লেখাতে পারলেই বাজিমাত। আমরা সে সব বিষয় নিয়ে খাঁটাখাটি করবো না।

সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়েছে। কীভাবে আমাদের নৈতিক আদর্শবোধ বিলুণ্ঠিত হলো, তা বোধকরি ভেবে দেখা দরকার। সেখানে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও এসে পড়ে। উচ্চ শিক্ষার নিয়োগে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে, অনেকে মনে করেন, এখান থেকেই ব্যাপক নৈতিক স্খলনের সূচনা। এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য।
আমরা কি ধর্মশিক্ষার বাঁধ দিয়ে প্রবল অনৈতিকতা প্রতিরোধ করতে পারবো? তাই যদি হতো তবে খোদ ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যতসব অনৈতিক কাজ চলে আসছে, তা থাকতো না। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে লুত আলাইহেস সালামের কওমের আিভশপ্ত কিছু দানব ঘাপটি মেরে থাকতো না।
অনেক দেশ আছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটে, তবে বিচার তার চেয়ে কঠিন, সুতরাং অবাধে দুর্নীতি চলা খুব সহজ হয়না।

জেনারেল আইউব খান পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুর্নীতি রুখতে নানাবিধ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলো। তার মধ্যে, তার দৃষ্টিতে দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের চাকরিচ্যুতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ধর্মকে বাধ্যতামূলক করা। লাভ কতটুকু হয়েছে ইতিহাসে তা দৃশ্যমান। দুঃখের বিষয়, অনেক শিক্ষক সামান্য সুবিধা লাভের জন্য হামাগুড়ি দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ আইউব খানের উন্নয়নের দশকের ওপর কবিতা লিখে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে চেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। তিনি বাংলার মানুষের নাড়ির খবর জানতেন। আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপও তার জানা ছিল। ধর্ম যে সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক আনন্দ উপভোগের মাধ্যম তা তিনি স্বীকার করতেন। তাই জোর করে শিক্ষার মধ্যে ধর্মের টানাটানি করতে চাননি। ধর্মকে তিনি অবারিত রাখতে চেয়েছেন। ধর্মশিক্ষা রুদ্ধ করে দিয়ে চমক সৃষ্টি করতে চাননি। জোর করে চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাস কিছু সময়ের জন্য আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে। নিরবধিকালের জন্য নয়। বঙ্গবন্ধু সে বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ড. কুদরত-ই-খুদাকে সামনে রেখে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। তাঁর সহযোগী যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কট্টর মতবাদি ছিলেন না। বর্ধমানের মানুষ ড. কুদরত-ই-খুদা ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং মওলানা আজাদ কলেজের (আদি নাম ইসলামিয়া কলেজ) বঙ্গবন্ধুর শিক্ষক। আগেই বলেছি, তার সহকর্মিরা বঙ্গবন্ধুর মানবমুক্তির ব্রত সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। সবার জানা, মানবকল্যাণ পরিপন্থী কোনো মতবাদের স্থায়িত্ব দীর্ঘায়ু পায়না।

কয়েক হাজার বছর আগে শিক্ষা বলতে প্রাধান্য পেত ধর্মপ্রবর্তকদের সংশ্লিষ্টতা এবং কল্পকাহিনীর বিষয়। বৃটিশ বাংলায় আমরা তার কিছুটা আঁচ পেয়েছি। ক্রমে সমাজ ও জীবনের চাহিদার পাঠের বিষয়ে বৈচিত্র্য আসে। অথচ পাকিস্তানি আমলে ধর্মের ঢাল দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়িয়ে রাখার প্রহসন চলে। ড. খুদার শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে জীবন-কেন্দ্রিক সমন্বয়।
বঙ্গবন্ধুকে নৃশংস হত্যার পর পাকিস্তানি প্রেতাত্মাধারীরা অতি উৎসাহে ১১.১১.১৯৭৫ খুদা কমিশনের পুনর্বিবেচনার ফরমান জারি করে। এর বছর দুয়েকের মধ্যে ১৯৭৭ সালে ড. এম. এ বারীর নেতৃত্বে মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার প্রয়াস পায়। দেশপ্রেমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, এতসব আয়োজনের উদ্দেশ্য জনগণকে বাস্তবতা থেকে অন্ধকারে রাখা। এর পরেও আবার ১৯৭৯ সালে অন্তবর্তীকালীন শিক্ষানীতি প্রবর্তনের উদ্দেশে কমিটি গঠন করা হয়। লেখা বাহুল্য, এ সবের একটাই উদ্দেশ্য, ইহজাগতিক চেতনা সমৃদ্ধ ড. খুদা শিক্ষা কমিশন সম্পর্কে জনগণের চোখে ঠুলি দেয়া।

২১ বছরের ‘তিমির দুয়ার’ খুলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এবং রক্তের সার্থক উত্তরাধিকারী বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ চালনার দায়িত্ব পেলে সব জঞ্জাল অপসৃত হতে থাকে। তবে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু মানুষ নানা ফন্দি-ফিকির দিয়ে কান ভারি করতে উদবাহু। আমাদের বিশ্বাস, শুভবোধের উজ্জীবক ব্রতী শিক্ষক-সমাজ এবং জনহিতব্রতী রাজনীতিকগণ শিক্ষাসহ সমাজকে আবিলতা মুক্ত করতে পারবেন। এর জন্য নতুন ফরমান বোধকরি নতুন ঝঞ্ঝাট সৃষ্টি করবে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বোধকরি বাহুল্য।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ