শিক্ষায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা : একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

আপডেট: ডিসেম্বর ৩১, ২০১৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

মো. নজরুল ইসলাম


শিক্ষা মানুষের জন্য, অন্য কোন প্রাণীর জন্য নয়। বাংলা “শিক্ষা” শব্দটি সংস্কৃত শাস ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ শাসন, নির্দেশ, আজ্ঞা, নিয়ন্ত্রণ, তিরস্কার, শাস্তিদান ইত্যাদি। শিক্ষা শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ঊফঁপধঃরড়হ ইংরেজি ঊফঁপধঃরড়হ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ থেকে। ল্যাটিন ভাষায় তিনটি মৌলিক শব্দের সন্ধান পাওয়া যায়; যথা ঊফঁপধৎব, ঊফঁপবৎব ও ঊফঁপধঃরড়হ । ল্যাটিন ঊফঁপধৎব এর অর্থ হলো লালন পালন ঃড় নৎরহম ঁঢ়, পরিচর্যা করা ঃড় হড়ঁৎরংয প্রতিপালন করা ঃড় ৎবধৎ ঁঢ়।
জীবনের পরিধি খুব ব্যাপক ও বিস্তৃত নয় একথা যেমন সত্য তেমনি এ স¦ল্প সময়ের জীবনকে ফলপ্রসুভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও সমাজে হতে হয় ধিকৃত। তাই স্বল্প বিস্তর জীবন প্রস্ফুটিত করতে হলে ধর্ম, শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, অব্যাহত শিক্ষা বা জীবনব্যাপী শিক্ষা এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই বিষয় বিবেচনায় এনে এসব বিষয়গুলো বিস্তৃত ধারণার মধ্যেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের মানব দক্ষতা ও সুস্থ সমাজ অর্থ সমৃদ্ধ দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।
আমরা অতীত সামাজিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করি যে, মানব সভ্যতার বিবর্তনে একটি প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ধর্ম। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসেও এ সত্যের বাত্যয় ঘটেনি। আমরা দেখতে পাই ইতিহাসের আদিপর্বে এ উপমহাদেশের জীবন ব্যবস্থায় ধর্ম একটি অপ্রতিদ্বদ্ধী নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বস্তুতঃ শারীরিক শক্তি ও আর্থিক দিক থেকে বিপন্ন মানুষ যখন আত্মশক্তিতে নির্ভরতা খুঁজে পায় না; অপার্থিব শক্তি তখন তার সমগ্র চৈতন্যকে অধিকার করে বসে। জীবনকে মহিমান্বিত করে তুলবার কঠিন প্রয়াস তাকে উদ্যোগী করে তোলে না। দৈব নির্ভরতার মধ্যেই সে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির আনন্দ বেদনাকে খুঁজতে চায়।
আঠারো শতকের অন্নদা মঙ্গল কাব্যেও ঈশ্বরী পাটুনী চ-িদেবীর কাছে কেবল এটুকুই প্রার্থনা জানিয়েছেন “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।” ধন নয় মান নয়, জীবনের কোন মহত্তর বাসনাও নয়, শুধু বেঁচে থাকা এবং এ বেঁচে থাকার জন্য কিছুটা সুখাদ্য-দুধভাত। ভারতবাসী, বিশেষ করে বাঙালির জীবন বিমুখতার আরও কিছু কারণ ছিল। বাঙালির অপূর্ব নিসর্গ মানুষকে অপার্থিব বোধে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই নিসর্গ তাকে দিয়েছে ভাবপ্রবণতা ও কল্পনার ঐশ্বর্য। জীবনকে তারা দেখেছে সংগ্রামের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, পারলৌকিক কল্যাণের সাধন ক্ষেত্র হিসেবে। জীবনকে আধ্যাত্ম মহিমায় ম-িত করার মধ্যেই ছিল জীবনের সার্থকতা।
আমরা এও খেয়াল করে দেখলাম এই উপমহাদেশে আর্য জাতি যখন প্রবল শক্তির দাপটে এদেশ জয় করল তখনও জীবনবিমুখতা তাদের পেয়ে বসল। জীবনের বিচিত্র সমস্যা তাদের কর্ম ও চিন্তাকে অধিকার করল না। বরং তারা এ বিশ্বাসে স্থিতিশীল হলো যে পার্থিব কামনা বাসনা ও সম্ভোগের মধ্যে জীবনের পরম অভিষ্ট খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবনের বিচিত্র সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে তারা এক অপার্থিব এবং আধ্যাত্মিক সত্ত্বার সন্ধানে প্রবৃত্ত হলো। পার্থিব জীবন তাদের কাছে মায়ার জগত হিসেবে প্রতীয়মান হলো। তাদের মনে ক্রমশ এ বিশ্বাস দানা বাঁধল যে মানবআত্মা পরমআত্মারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। রোগ, শোক, জরা, বার্ধক্য, মৃত্যু মানব দেহেরই স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র। বস্তুতঃ প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে আধ্যাত্মিকতার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার ওপর। শিক্ষার ক্ষেত্রে আধ্যাত্ম সাধনার মধ্য দিয়ে জীবনের পরিপূর্ণতা লাভের নির্দেশ রয়েছে। আমাদের শিক্ষার সীমারেখা এভাবে চিহ্নিত করতে পারি- তা হলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা তথা বয়স্ক শিক্ষা বা অব্যাহত শিক্ষা। এসব শিক্ষা কার্যক্রমে ধর্ম- চেতনারই বহিঃপ্রকাশ বা আমরা এভাবে বলতে পারি রূপায়ণ ঘটেছে।
বর্তমানকালে শিক্ষা সম্পর্কে একথা বলা যায় শিক্ষা হচ্ছে জীবনব্যাপী একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার ফসল জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষা হলো ব্যক্তির জীবনব্যাপী ক্রমবিকাশের অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যা নিত্য নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার আচরণের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন ঘটিয়ে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে এবং প্রয়োজনবোধে পরিবর্তন সাধনে সমর্থ করে।
আমরা মনে করি এ বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও মনীষীগণ কি ভাবনা ভেবেছেন তা জেনে নেই। সাহিত্য, ধর্ম, শিক্ষা এসব ব্যাপক বিষয়। এক কথায় এ প্রত্যয়গুলো বিশ্লেষণ করা সত্যিই দূরুহ। শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্থ সম্পর্কে মহাজ্ঞানী সক্রেটিস বলেছেন- “শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সত্যের আবিস্কার ও মিথ্যার অপনোদন।” প্লেটো বলেছেন, মনের ও দেহের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য। অ্যারিস্টটলের মতে,“ সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।”
তাহলে অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে ধর্মীয় দর্শন, জীবনবোধ সংগ্রামী চেতনা কোন কোন দেশের শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক  বজায় রেখেছে। যে সব দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত এবং শিক্ষিতের হার বেশি, সে সব দেশে আর্থ-সামাজিক দিক থেকেও উন্নত। নিরক্ষরতার হার উন্নয়নশীল ও পশ্চাদপদ দেশেই অত্যন্ত বেশি। অর্থাৎ শিক্ষার উপরই দেশ ও জাতির উন্নতি নির্ভরশীল। শিক্ষার সাথে ব্যক্তি তথা জাতীয় উন্নয়নের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষা মানুষের শারীরিক, মানসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক (জীবনপ্রণালী) বিকাশ ঘটায়। এছাড়াও শিক্ষা কারিগরি, বৃত্তিমূলক, বৈজ্ঞানিক, তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই বয়স্ক শিক্ষা (উপানুষ্ঠানিক) নিরক্ষরদের সাক্ষরতাদান করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অপরিহার্য। একথা আগামীকাল সূর্য উদয়ের মত সত্য যে, আনুষ্ঠানিক স্কুল (শিক্ষা) প্রথার অনেক পূর্বে বয়স্ক শিক্ষার জম্ম। প্রাচীনকালে দেখা যায়, মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে একত্রিত হয়ে মতবিনিময় করত। বলা যেতে পারে এই ব্যবস্থা ছিল সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেয়ার একটা অনানুষ্ঠানিক (ওহভড়ৎসধষ) পদ্ধতি। সকল দেশেই বিশেষ করে ধর্মীয় নেতারা এই কাজটি করতেন। সক্রেটিস, যীশুখ্রিস্ট, জৈন, গৌতমবুদ্ধ, বৈদিক শিক্ষায়, ঋষি, মুনিষী, মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত শিক্ষা বাংলাদেশে স¦াধীন সুলতানদের আমলে শিক্ষা, মুঘল স¤্রাটদের পরিচালিত শিক্ষা সময়েই আমরা বয়স্ক শিক্ষার অতি অনানুষ্ঠানিক রূপটি খুঁজে পাই।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে এটা সমাজ শিক্ষা হিসেবে তাৎপর্যময় হয়ে উঠে। কেননা সমাজ ব্যবস্থার মুলীভূত শক্তিই তো হল মানুষ। যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে লোক শিক্ষার (ঋড়ষশ ঊফঁপধঃরড়হ) নানারূপ প্রচলন থাকা সত্ত্বেও সংগঠিত ভাবে বয়স্ক, পরিণত অথবা যারা সামাজিক সংগ্রাম মুখর জীবনে শিক্ষা সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের শিক্ষিত করার ধারণাটি আধুনিক যুগের। আবার এটিও আমরা ভাবনায় পাই যে সামন্ততান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থা (ঋবঁফধষ ঝড়পরবঃু) সমাজ ব্যবস্থায় সর্বধারণের জন্য শিক্ষার কোন প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপে যখন জীবনধারা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, মধ্যযুগীয় অবস্থান থেকে নবজাগরণের জোয়ার আসায় সমাজকাঠামো প্রায় ভেঙ্গে পড়ে, সূচনা হয় এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক অবস্থার। দেখা যায় বয়স্ক শিক্ষার উদ্ভব। বয়স্ক শিক্ষার জন্য নানা দেশে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন- জনসম্পদ উন্নয়ন, স্টাফ উন্নয়ন, উন্নয়নমূলক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, কর্মকালিন শিক্ষা, অব্যাহত শিক্ষা, জীবনব্যাপী শিক্ষা ইত্যাদি।
বয়স্ক শিক্ষা সাধারণতঃ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ। বয়স্ক শিক্ষা ব্যবস্থায় অব্যাহত শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা মূলতঃ শিশু থেকে প্রাপ্ত বয়স্কদের শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ধরে রাখার জন্যই তো। সুতরাং এতে নিজেরা যাতে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার উন্নয়ন করতে সমর্থ হয় তার জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে অবশ্যই অব্যাহত শিক্ষার মূল ব্যবস্থা থাকতে হবে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে দেশের সকল শিশুকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে এবং বর্তমান শিক্ষা বান্ধব সরকার এ লক্ষ্যে কর্মমূখি, উৎপাদনমুখি এবং কারিগরি শিক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সে জন্য সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪ প্রণয়ন করেছে। সরকার এই আইনে স্পষ্টত বলেছেন “শিক্ষায় সুযোগ বঞ্চিত জনগোষ্ঠিকে সাক্ষর জ্ঞানদান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকায়ন, দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করণ, আত্ম কর্মসংস্থানের যোগ্যতা সৃষ্টিকরণ এবং বিদ্যালয় বহির্ভুত ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার বিকল্প সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্য বিধান প্রণয়ন কল্পে প্রণীত আইন।” বস্তুতঃ আমাদের মনে হতে পারে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা মানেই বঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রবর্তিত প্রাথমিক শিক্ষা, বয়স্কদের জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা।
আমরা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে পারি চধঁষড় ঋৎবরৎব উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার ভূমিকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি সকল রকমের বন্ধন থেকে ব্যক্তির মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ধারণা করা যেতে পারে কার্যকরি সাক্ষরতা কর্মসূচি হচ্ছে লেখাপাড়ার সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা যা মূখ্যত উপানুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া হয়ে থাকে।
দীর্ঘদিনের পরাধিনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত আমাদের স¦াধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের ফসল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনকের স্বপ্নেঘেরা বাংলাদেশে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঞ্চিত শিশু কিশোর ও বয়স্কদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নেই। সরকারের এই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যক্তিকে তার  প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানের উপযোগী করার জন্য এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি, সংবোধন ক্ষমতা ও দক্ষতা বিকাশে সাহায্য করবে।
নারী ও পুরুষে এবং শহরের ও পল্লী এলাকার জনসংখ্যার সাক্ষরতার হারে যে বিরাট অসমতা বিরাজমান সেটা দূরীর্ভুত হবে। আর হ্যাঁ, সমাজে যারা আর্থিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে পশ্চাদপদ তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক ও উপযোগী শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা গ্রহণের এক্ষুণি সময়। যে ধরনের কাজই একজন বয়স্ক ব্যক্তি বা শিশু কিশোররা নিয়োজিত থাকুক না কেন সেই কাজটি যাতে সে যথেষ্ট পারদর্শিতা ও দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারে সেই উপযোগী অনুরাগ, দৃষ্টিভঙ্গি, তথ্য ও দক্ষতা তাকে দেয়াই এই শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যক্তিকে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে সক্রিয় ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে এবং প্রধান প্রধান জাতীয় সমস্যায় চিন্তা ভাবনা করতে সাহায্য করবে। শুধু তাই নয়, এই শিক্ষা ব্যক্তিকে পড়া, লেখা ও হিসেব নিকাশে এতোখানি দক্ষতা দেবে যাতে সে ভবিষ্যতে তার শিক্ষা হয় নিজে নিজে অথবা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার অন্যান্য লভ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে অব্যাহত রাখতে সমর্থ হবে। একমাত্র উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে চিন্তা, বিচারশক্তি ও সামাজিক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে নিরক্ষর মানুষকে উৎপাদনক্ষম ও দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এরই মধ্য দিয়ে তাদের পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা, চিন্তা ও বিচারশক্তির বিকাশ, মানবিক গুণাবলির বিকাশ, জ্ঞানার্জন মূল্যবোধের উজ্জীবন, সমাজ সচেতনতা ও ঐক্যবোধ, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি, পরিবার পরিকল্পনা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন দ্রুততর হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা লক্ষ্য দলের (টার্গেট গ্রুপ) সবাই বুদ্ধি, বিবেচনা ও বিচারবোধ সম্পন্ন। তারা সব কিছুই যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়। তাই শিক্ষার বিষয়বস্তু বাস্তব হওয়া প্রয়োজন। বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষা তাদের কাছে নিরর্থক। যে জ্ঞান সঙ্গে সঙ্গে জীবনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে, যাতে লাভবান হওয়া যাবে, যাতে বর্তমানের প্রয়োজন মিটবে সেরকম জ্ঞানই তাদের দিতে হবে। দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধান ও সুন্দর জীবনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সে সবই থাকবে শিক্ষার মধ্যে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা যা ব্যক্তিকে সাক্ষরতা দেবে, যার জন্য পৃথিবীর জ্ঞান তার কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। পরিবেশের সঙ্গতি বিধান আর অর্থনৈতিক উন্নততর অবস্থার জন্য কারিগরি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া শেখাবে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠির জন্য স্বাস্থ্যবিধির জ্ঞান দেবে। এটা তাকে নাগরিকত্বেরও শিক্ষা দেবে যাতে সে রাষ্ট্রের শান্তি, উন্নয়ন ও প্রগতির জন্য  সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে সাহায্য করতে পারে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, সরকারি যেমন- গণশিক্ষা সর্মসূচি, কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, বৃত্তিমূলক কার্যক্রম, ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, গ্রামীণ সমাজ সেবা প্রকল্প, মাদার্স ক্লাব, স্বায়ত্বশাসিত পর্যায়ে গৃহীত কার্যক্রম যেমন- বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)। বেসরকারি পর্যায়ে গৃহিত কার্যক্রম যেমন- পল্লী সম্পদ ব্যবহার শিক্ষা কেন্দ্র, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, আহছানিয়া মিশন, এছাড়াও বাংলাদেশ গণশিক্ষা সমিতি, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, জাগরণী, প্রশিকা, ইউসেপ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ এডুকেশন ইন ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ইত্যাদি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবি সংস্থা নানা ধরনের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশব্যাপী বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক উন্নত অবস্থার জন্য উন্নত  কারিগরি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া শেখাবে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠির জন্য স্বাস্থ্যবিধির জ্ঞান দেবে। এটা তাকে নানা বিষয়ের শিক্ষা দেবে যাতে সে রাষ্ট্রের শান্তি ও প্রগতির জন্য সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে সাহায্য করতে পারে।
আশার কথা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কর্তৃক প্রণীত মৌলিক সাক্ষরতা ও অব্যাহত প্রকল্প (৬৪ জেলা) নামক বৃহৎ প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১১-৪৫ বছর বয়েসী ৩ কোটি ৭৩ লক্ষ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদানসহ জীবনদক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা দেয়া হবে এবং একই সঙ্গে সাক্ষরতা দক্ষতা অর্জনের পর ১৫-২৫ বছর বয়েসী ১ কোটি ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার নব্য সাক্ষরকে (মোট শিক্ষার্থীর ৩২%) অব্যাহত শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় জীবীকায়ন দক্ষতার উপর প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে কর্মদক্ষ ও আতœনির্ভরশীল নাগরিকে পরিনত করা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১০ সালের জরিপ অনুযায়ী বর্তমান সাক্ষরতার হার ৫৯.৮২ শতাংশ। ১৯৬৫ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের ঘোষণার পর থেকে প্রতিবছর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। সাক্ষরতা দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে সাক্ষরতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়।
সাক্ষরতা হচ্ছে- পড়া, অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে এবং শিখার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং গণনা করার দক্ষতা। এটি একটি ধারাবাহিক শিখন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজস্ব বলয় এবং বৃহত্তর সমাজের  উন্নয়ন কর্মকা-ে অংশগ্রহণের জন্য সমতা ও জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বর্তমান সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ এর অন্যতম লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়া যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ লক্ষ্য অর্জনে সকল স্তরের নাগরিককে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে শুধু লেখাপড়া নয়, মানুষের জ্ঞান, সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায় যা সুস্থ সমাজ ও উন্নত দেশ গঠনে কার্যকরি ভূমিকা রাখে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানব সম্পদের কোন বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং দেশের নিরক্ষর জনগোষ্ঠিকে কর্মমূখি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বান্তবায়ন করতে হবে। এর আলোকে সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এবং যষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
পরিশেষে প্রাসঙ্গিক ভাবনায় এ সমস্ত পর্যালোচনা করে আমরা আশা করবো যারা হবেন আমাদের সুজলা সুফলা বাংলাদেশের নতুন মানব সম্পদ। যাদের কারণে দেশ খুব জলদি স্থায়ী টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে সক্ষম হবে। রাজনৈতিক সন্ত্রাস, সামাজিক সন্ত্রাস ও পরিবারিক অশান্তি দূরীভুত হয়ে দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও মানবীয় পরিবেশ। বাংলাদেশ হবে আামাদের সোনার বাংলা, শান্তির বাংলা।

লেখক:  সহকারী অধ্যাপক ও টিউটর, বাউবি, মাস্টার ট্রেইনার, মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা),
অনুষ্ঠান ঘোষক, বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহী।