শিক্ষা : উন্মুক্ত, প্রাতিষ্ঠানিক না অনলাইন

আপডেট: July 20, 2020, 12:38 pm

গোলাম কবির


উদার-উন্মুক্ত প্রকৃতি মানুষের আদি শিক্ষক। তাইতো কবি বলতে পারেন, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’। এই আদি গুরু ছেড়ে আমরা কৃত্রিম যান্ত্রিকতার পথে ধাবিত। অথচ এ যেন ‘রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস’। বিষয়টি কঠিনভাবে জানিয়ে দিয়ে যা”ে কোভিড-১৯। প্রকৃতিকে আমরা পরিহাস করেছি, এখন তার প্রতিফল কড়ায় গণ্ডায় ওয়াসিল হচ্ছে।
কোভিড তথাকথিত সভ্য মানুষকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য করছে। যে মিলন মানুষে মানুষে আনন্দের ধারা সৃজন করে, আজ তা প্রবলভাবে অন্তর্হিত, মিলনটাই যেন গর্হিত। জীবনের প্রায় সবক্ষেত্রে প্রগতির চাকা স্তব্ধ। যা চলছে, তা দায়সারা যন্ত্রের মত। এরই মধ্যে শিক্ষা নিয়ে নানা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। কার্যকরি পরিণতির কথা না ভেবে নতুন কিছুর উদ্ভাবক হবার আমরা অভিলাষী। যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে প্রকারান্তরে বৈষম্যের পথ দীর্ঘতর করছি। যারা সারাবিশ্ব লুন্ঠন করে যন্ত্রের সাহায্যে জীবনের গতি ফেরাতে ব্যস্ত তারা অনলাইনের প্রবক্তা। জীবনের অনেক কিছু আমাদের জন্য সহজ করেছে অনলাইন। কিন্তু পরিপূর্ণ শিক্ষা সে পথে কতখানি অর্জিত হবে, তা বোধকরি ভেবে দেখার অবকাশ আছে।
অনলাইলে ঘরে ঘরে শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। কিছু দেশ বিদেশি শিক্ষার্থী খেদিয়ে দেয়ার আয়োজন করেছে। আসল কারণটি উদঘাটনের চেয়ে নকল নিয়ে টানাটানি। মানুষ বাঁচাবার কৌশল সর্বাগ্রে, অতঃপর শিক্ষা। মানুষ নাই তো শিক্ষা কার জন্য! প্রকৃতির ভয়াল রূপে ভীত হয়ে মানুষ হারেনি কখনো, হারেনি বলে, ‘লক্ষযুগের সংগীত মাখা সুন্দর ধরণি’, আমাদের মানসিক স্নিগ্ধতা দান করছে।
অনলাইন শিক্ষা উচ্চতর শ্রেণির জন্য কিছুটা প্রতিকূল সময়ের সাথে যুদ্ধ করা। তবে সব শিক্ষার্থীর তাতে অংশ নেয়া সহজ নয়। তাছাড়া সিংহভাগ শিক্ষার্থীতো প্রাথমিক-মাধ্যমিকের। তাও আবার দারিদ্রসীমার ওপরে অনেক পরিবার উঠতে পারেনি। এদের ভাগ্যে কী জুটবে?
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানস-কর্ষণ। উপজাত হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা কৌশল আয়ত্ত করা। এখন উপজাতের প্রতি সবার আকর্ষণ, আর গুরুত্বও সেখানে। এর ফলে মনুষ্যত্ব যে দিনদিন হারিয়ে যাবার উপক্রম তার প্রতি আমাদের নজর দেয়ার সময় নেই। যে শিক্ষা মানুষকে আনন্দময় উজ্জ্বল জীবনের সাথে পরিচিত করে না, তা বোধকরি পূর্ণ শিক্ষা নয়। রবীন্দ্রনাথ তো বলেইছেন, ‘শিক্ষা আচরণের’ তা নানা পদ্ধতির এবং আসঙ্গ সহমর্মিতার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়। যার জন্য সবার সাথে মেশার প্রয়োজন আছে, অবশ্য চিহ্নিত চোর-বাটপার ছাড়া। আর আচরণের শিক্ষা ‘একলা ঘরে বসে বসে’ সুর বাজালেই চলে না। অথচ কোভিড মানুষকে নিদারুণভাবে একলা থাকার পথে নিয়ে যাচ্ছে। মানব কল্যাণের কর্মযজ্ঞ বিচ্ছিন্ন থাকলে ব্যাহত হয়।
সূচিত সভ্যতার আগে মানুষ দীর্ঘকাল উপজাত শিক্ষার সাথে পরিচিত ছিলো না, যেটুকু আয়ত্ত করেছিলো তা অভিজ্ঞতার ফসল। তাইতো বলা হয়, অভিজ্ঞতা সংস্কার সংস্কৃতি বিজ্ঞান। আজকের চোখ ধাঁধানো কৃত্রিম স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও সচ্ছলতার অভাব ছিলো না। ক্ষমতামদমত্ততা প্রদর্শন আর আমৃত্যু কর্তৃত্ব হাতের মুঠোয় রাখার অশুভ আয়োজন মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তার নিয়ামক আজকের এই কোভিড। একে লেজ গুটাবার ব্যবস্থা যতশীঘ্র হবে, ততই মঙ্গল। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা অসম্ভব নয়। তার আগে চিকিৎসা সেবা আর রোগ পরীক্ষার নামে যারা প্রতারণায় নেমেছে, তাদের নির্মমভাবে নির্মূল করতে হবে। তাতে ‘ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়’ হলেও হোক। একটা পরিশুদ্ধ জাতি গড়ে উঠুক। এ পথে না গিয়ে আমরা মানুষে মানুষে মিলনে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তুলছি। ঘরে বসে বিদ্যা আহরণে আমাদের বেশি সংখ্যক সন্তান উপকৃত হবে বলে মনে হয় না। এনিয়ে আয়োজনের তোড়জোড় কম নয়। এতে ভাগ্যবানেরা যে আচরণের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে রক্তমাংসের যন্ত্র হয়ে উঠবে এবং মানবাচারে আদিমতাকে হার মানাবে তা ভেবে দেখছি না। আমরা তাৎক্ষণিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। এ যেন অন্য উপায়ে মানুষে মানুষে বৈষম্যের ব্যাধি প্রকট করে তোলা!
মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক হলকে একেকটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট বানানো হয়েছিলো। প্রায় একবছর শিক্ষা স্বাভাবিক পথে এগোয়নি। দেশ স্বাধীন হলে আমরা তা সামলিয়ে নিয়ে উত্তরণের পথে পৌঁছার আগে ১৯৭৫ এর জাতীয় ট্রাজেডির পর যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে অশিক্ষককে শিক্ষক বানিয়ে, অযোগ্যদের সরকারি মর্যাদা দিয়ে শিক্ষার মান ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে আমরা হোঁচট খাচ্ছি। একি কেবল মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ! অর্থের অভাব, নাকি যথার্থ শিক্ষক এবং যথাযথ পরিকল্পনার!
আমরা খালকাটার হুজুক দেখেছি, দেখেছি বিজ্ঞান মেলার সারশূন্য আয়োজন। এতে কিছু ব্যক্তির কপাল খুলেছে, টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে, কাজের কাজ তেমন হয়নি।
আমাদের শিক্ষার্থীর সুবিধার জন্য দূরশিক্ষনের ব্যবস্থা হয়েছে। এমনকি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রবর্তিত হয়েছে। লাভের লাভ কতটুকু হয়েছে, গবেষকগণ তা বলতে পারবেন। অবশ্য কিছু শিক্ষাজীবীর পুনর্বাসন যে হয়নি তা নয়। তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে চলবে কেন! কভিডমুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিশু-কিশোর-তরুণদের আনন্দময় মিলন তীর্থে পরিণত করে আচরণের শিক্ষার পীঠস্থানে রুপান্তর করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা। শেকড় বহাল রেখে নতুন ধারার শিক্ষা প্রবর্তন, কতখানি সফলকাম হবে, তা সময়ই বলে দিবে।
কর্মহীন অন্নহীন মানুষের মিছিল সংক্ষিপ্ত করার জন্য অবশ্যই কভিড তাড়াতে হবে। এর জন্য যা যা করা দরকার, তা শক্তি প্রয়োগ করে হলেও করতে হবে। মানুষ বাঁচবে। মানুষ না থাকলে শিক্ষাগ্রহণ করবে কে? উন্নয়ন কার জন্য? কপিতয় ভাগ্যবান ছাড়া অধিকাংশ নিয়তি নির্ভর মানুষের সন্তানেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে।
করোনা পরীক্ষা নিয়ে নানা ধরণের নয়-ছয়ের কথা কানে আসছে। কে জানে এর পেছনে কোন অশুভ শক্তি কাজ করছে। এখন অবিলম্বে প্রয়োজন কভিড তাড়িয়ে যতসব মানবতার দ্বিপদ শত্রুদের নির্মূল করা। আশা রাখতে দোষ নেই, সেই ফেলে আসা তপোবন সংশ্লিষ্ট শিক্ষায় মানস কর্ষণের মৌলিক বিষয় ও উপজাত শিক্ষায় আমরা সমৃদ্ধ হবো। অনেকেই মনে করেন এর পথরেখা তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯০২ খ্রীস্টাব্দে ভুবনডাঙায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রবর্তন করে। পৃথিবীর অযুত নিযুত বয়ক্রমের কাছে আমাদের কটা মহূর্তের শিক্ষাবিরতি শেষে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াই। দৃঢ় সংকল্প হই। সংকট কেটে যাবে।
সুতরাং শিক্ষা নিয়ে অতি ভাবনার চেয়ে বাস্তব পথ পরিক্রম বুঝি জরুরি। আগেই বলা হয়েছে, আগে মানুষ অতঃপর শিক্ষা।