শিক্ষা থেকে ভ্রান্তি বিলাস অপসারিত হোক

আপডেট: September 21, 2020, 12:13 am

গোলাম কবির:


মাঝে মাঝে দেখি দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলো শিক্ষার নানাদিক নিয়ে সরগরম। এর প্রয়োজন আছে। পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনে সম্মার্জনীর মতো। তাই বলে দুর্বিনীত করোনাকালে প্রতারক-ধান্দাবাজদের মতো কিছু শিক্ষাজীবী ফন্দি আটলে, তা বোধকরি সবার ভালো লাগার কথা নয়। তবে পত্রিকাকে তো বিবেকের ভূমিকায় দাঁড়াতেই হবে। তাই নানামুনির নানা মত নিয়ে পত্রিকাগুলো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাঠক উজ্জীবিত হয়। তারপর অন্যান্য উদ্দীপনার মতো এক সময় তা মিলিয়ে যায়। এতদ্সত্ত্বেও মন্দের ভালো যে, আমরা আমাদের মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলোর একটি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি।
মানুষের সাধারণ প্রবণতা অতীত মোহমুগ্ধতা। অনেক কিছুর নষ্টের অপচ্ছায়া বর্তমান বলে অনেকের ধারণা। মহাকাল সেদিকে ঘুরেও দেখেনা। সে আপন গতিতেই এগিয়ে চলে।
ইতিহাস পড়ে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতায় একাধিক শাসনকাল দেখেছি। বৃটিশ শাসনের অন্তিমকালে শৈশব থেকে জেগে উঠেছি। খড়-বাঁশের তৈরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাথরের ভারী সিলেট বুকে ধরে বিদ্যা আহরণের জন্য উপস্থিত হয়েছি। দেখেছি, বিদ্যাদান এবং শাসন সমান্তরাল। ফাঁকি দেবার কৌশল কম। পড়া না পারলে কটুকাটব্য ছাড়াও বেত্রাঘাতের পুরস্কার মিলতো। এর ফলে শিক্ষার্থী শৈথিল্য প্রদর্শন করতো না বললেই চলে। তার পরিণতি শুভান্তিকই হতো।
দেশভাগের আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পাস শিক্ষক কদাচ দেখা যেত। অধিকাংশ শিক্ষকই নন-ম্যাট্রিক এবং প্রাথমিক পাস ছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে এঁদের পদপ্রান্তে বসে হাতেখড়ি পাবার। এঁরা যতখানি জানতেন উজাড় করে দিতেন। নিজেরা যেমন গোঁজামিল দিতেন না, তেমনি শিক্ষার্থীর ফাঁকিবাজি বরদাস্ত করতেন না। তাঁরা ছিলেন জননীর মতো, পকেটের দিকে না তাকিয়ে পরম স্নেহে মুখের পানে নজর রাখতেন। সব কালে ব্যতিক্রম থাকে, তার সংখ্যা ছিলো নগন্য। আজ আমরা এই যে, দু’এক কলম লেখার পণ্ডশ্রম চালিয়ে যাচ্ছি, এটা তাঁদের আন্তরিক বিদ্যা বিতরণের ফলের একটা অংশ। অবশ্য ভুলভালগুলো আমাদের মেধার অভাবজনিত।
কদিন আগে আমার এক বন্ধু, সেও অস্তাচলগামী, বলছিলো, হ্যারে সত্যি করে বলতো, ষাট বছরেরও আগে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে কিছু সনদের কাগজ ছাড়া কী অর্জন করেছি? লেখা বাহুল্য, আমরা মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি বন্ধুর প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি। তবে আমার এক অতুল মেধাবী ছাত্রের কাছে এর জবাব পেয়েছিলাম। সে ক্ষোভের সাথে বলেছিলো, ‘স্যার স্কুল-কলেজে, বিশেষ করে স্কুলে যে-সব মৌলিক বিষয় শিখেছিলাম, তা যেন ভুলতে বাধ্য করছে বিশ্ববিদ্যালয়। ছেলেটি ৪০ বছর আগে রাজশাহী কলেজে আমার ছাত্র ছিলো। আমাদের এতসব মহড়ার উদ্দেশ্য হলো, প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে আগেই শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতো, সত্যিকার শিক্ষকের কাছে। সনদের বোঝা কাঁধে নামমাত্র শিক্ষক তখন ছিলো না বললেই চলে।
জীবনকে সুশৃংখল রাখতে নিয়মানুবর্তিতা অপরিহার্য। তার জন্য প্রয়োজনে কঠোরতারও দরকার। কারণ মানবচরিত্রে মানবিকতা অপেক্ষা পাশবিকতা অধিকতর। এই পাশবিকতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মানব দানব হয়ে ওঠে। তাই প্রথম থেকেই সাবধানতা জরুরি।
কথায় বলে শাসন করা তারেই সাজে আদর করেন যিনি। আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীকে সন্তানতুল্য মনে করতেন বলে শাসন করতেন। এখন মূল্যবোধ উল্টে গেছে। তাই শাসন নেই। টাকা পেলেই শিক্ষক শিক্ষার্থীকে ‘স্বপ্নলোকের চাবি’ হাতে ধরিয়ে দিতে ব্যস্ত। নিজে অনিয়ম করবো, আর অপরকে বাধা দিব, তা হয়না। শোনা গেল কোনো এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়ম বহির্ভুতভাবে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। ঘটনা যদি সত্যি হয় তবে সাহেদ গং এবং শিক্ষকে পার্থক্য কোথায়! শিক্ষাব্রতী শিক্ষক নিজসন্তান এবং শিক্ষার্থী তথা মানসসন্তানের মধ্যে পার্থক্য রাখেন না। এখন তা বিপরীতমুখী, কিছু শিক্ষক নিজ সন্তানকে অবৈধ পথে পরিচালিত করেন। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার তাদের অনেকেই শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের শিরোপা পান। পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়ে কারো কারো সন্তানের রাতারাতি মেধার বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর অন্ধিসন্ধি করে সুলভ শিক্ষকতায় এনে জীবিকার পথ সুগম করে দেন। এখানেই শেষ নয় রঙ বদল করে মোসাহেবি করে হোক; আর কড়ির জোরে হোক, পদ-পদবি দখল করে লেখক সাজতে চান। এই দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা ‘ফেসবুক’ সয়লাব করছেন। শুদ্ধ মাতৃভাষা লেখতে পারেন না, অথচ ইংরেজয়ানা দেখান। পেছনের দরজা দিয়ে আসা শিক্ষা-ব্যক্তিত্বদের মোসাহেবরা জবাবে ‘ওয়াহ ওয়াহ’ করেন। ফলে উভয়ের বিদ্যার দৌড়ের ভয়াবহতা শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট নিষ্ঠ ব্যক্তিদের শংকিত করে। এই ভ্রান্তি-বিলাস কতকাল চলবে! ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত শেক্সপীয়রের ‘ঈড়সবফু ড়ভ ঊৎৎড়ৎং’ গ্রন্থখানি প্রায় আড়াইশো বছর পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৬৯ সালে ‘ভ্রান্তি-বিলাস’ নাম দিয়ে অনুবাদ করেন। শব্দটি ব্যবহারের ব্যঞ্জনা অসাধারণ। ২৬ শে সেপ্টেম্বর তার ছিয়াত্তরতম জন্মবর্ষ। বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, শিক্ষাভুবনের নষ্টামি প্রতিরোধ করোনা প্রতিরোধের মত জরুরি। না করতে পারলে ভরাডুবির অতলে পৌঁছুতে হবে।
প্রসংগত অন্য একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর অতুল ত্যাগের সৃষ্টি দলটি ক্ষমতায় থাকলে অনেকে রঙ বদলিয়ে কড়ি আর মালিসের কৌশল প্রয়োগ করে কেবল শিক্ষায় নয়, রাজনীতিতেও প্রভাব খাটিয়ে অনাচারে সয়লাব করে। অথচ অন্যদল ক্ষমতায় থাকাকালে কোষ্ঠী যাচাই করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সন্ধান পেলে তাকে নির্মমভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। তা সে প্রার্থী যতই মেধাবী হোক।
আজ এই যে, চারপাশে বঙ্গবন্ধু নামের কোরাস। এদের অধিকাংশই মেকি। নাহলে করোনাকালে নৈরাজ্যের নায়কদের অতীত কী সাক্ষ্য দিচ্ছে? এ জন্য প্রয়োজন সত্যিকার মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ এবং মুখোশধারীদের ঝেঁটিয়ে দূর করা। তাহলে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন অর্থবহ হবে আর জাতি হবে আবিলতা মুক্ত।
লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ