বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

শিক্ষা নিয়ে তুঘলকি পরিহার্য

আপডেট: December 11, 2019, 1:14 am

গোলাম কবির


আমার লেখার বিষয় শিক্ষা-সংস্কৃতি। মাঝে মাঝে সমাজের এপিঠ ওপিঠ ফিরে দেখতে গিয়ে লেখার আয়োজনে অনান্য বিষয়ও আসে। জানি সব লেখাই আবর্জনা। তবুও অভ্যাসের বসে কাগজকলম নিয়ে বসা।
একদা কলেজ পর্যায়ে পঠন-পাঠনে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। সুতরাং শিক্ষা ও শিক্ষকতার অর্জন ও অপচয়ের দিকটি সম্পর্কে আংশিক ধারণা আছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত তেমন নেই বললেই চলে। তবে নিজের পড়া এবং পুত্র-পৌত্রাদির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত দেখে আসছি। ধন্দ লাগে, আমাদের অগ্রগতি কতদূর!
প্রাথমিকে পড়ার সময় আমাদের স্মরণীয় শিক্ষকবৃন্দের অধিকাংশ ম্যাট্রিকুলেশান বা এনট্রান্স পাস ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন নন-ম্যাট্রিক। কদাচিত দু’একজন G.T। তাঁরা ভাষা এবং গণিতের যে ভিত গড়ে দিতেন, আজকের দিনে তা অনেকটা রূপকথার মতো। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ওয়ারি শিক্ষক ছিলেন না বললেই চলে। একজন শিক্ষক সমানতালে বাংলা-ইংরেজি, গণিত-ভূগোল-ইতিহাস দক্ষতার সাথে পড়াতেন। তখন বিস্মিত হতাম শিক্ষকের মেধার বিচিত্র বিচ্ছুরণ প্রভা দেখে। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে কী ঘোরে না, সে বিষয়ে সংশয়ের কিছু শিক্ষক ছিলেন না তা নয়, তবে তাদের আন্তরিকতার অভাব লক্ষ্য করা যায়নি। এখন দেখছি, গোড়া থেকেই বিষয়ওয়ারি শিক্ষক। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এঁদের কেউ কেউ শিক্ষক নামের বিপরীত শব্দ। তাঁরা গাইড নির্ভর। মূল পুস্তকের সাথে সম্পর্কহীন। গাইড কিনতে হয় না। কোম্পানি বিনে পয়সায় দিয়ে যায়। ক্রমান্বয়ে এক ধরনের বেশি-বিদ্যালয় পর্যন্ত একই ধারা। তাইতো দেখা যায়, শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে ক্লাস-প্র্যাক্টিক্যাল করে না। কেবল গাইড পড়ে পরীক্ষায় অংশে নেয়। ইন হাস্ত শিক্ষা নম্। যে সব শিক্ষার্থী ভালো করে, তারা নিজেদের মেধাগুণে। আজকের দিনের কিছু শিক্ষকের শিক্ষাদানে অবদান কতটুকু তা গবেষণার বিষয়। কারণ শিক্ষকতায় আমিসহ যারা জীবিকার পথ করে নিয়েছি, তারা তুলনামূলকভাবে দুর্বল মেধার মানুষ। নিজের কথা দিয়ে বলি, উচ্চমাধ্যমিকে মেধাবৃত্তি প্রাপ্ত কুড়িজনের মধ্যে আমরা তিনজন ছাড়া অন্যরা শিক্ষকতায় আসেন নি। এই তিনজনের মধ্যে আমি দুর্বলতম এজন্য যে, অন্য কোনো পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিলাম। দেখেছি আমাদের মাঝে কী ভয়াবহ শূন্যতা। এদের মধ্যে কেউ অ্যাড্হককে হক করা, আবার অনেকে আত্মীয়তার পর্যায়ের। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে ভাবছি, শিক্ষা নিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া আমার উচিত হয়নি। কেউ কেউ ভাবতে পারেন। এই অনুশোচনাবোধ প্রকারান্তরে দাম্ভিকতার নামান্তর। তা ভাবতে পারেন, ভাবনার তো পরিসীমা নেই! এদতসত্ত্বেও আমরা উচ্চারণ করবো, ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ব্যক্তিবর্গ তুলনামূলকভাবে দুর্বল মেধার। মেধা বিধিদত্ত, তা নিয়ে অনুযোগ কিংবা গর্ব করার কিছু নেই। তবে কোনো বিষয় নিয়ে পুনঃপুন অনুশীলন করলে, তার গভীরে প্রবেশ করা যায়। দুখের বিষয় হলেও সত্য আমরা শিক্ষক সমাজ অধরা কর্মসংস্থান সুলভে পেয়ে বই খুলতে চাই না। ফলে মেধাকর্ষণ হয় না। তিমিরাচ্ছন্নতাও কাটেনা। তবুও সন্তানাদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হয়। ভর্তির পর সংগতি থাকলে গৃহশিক্ষক অথবা ভালো ফলের দুরাশায় শিক্ষাবিক্রির দোকানে পাঠাই। মিষ্টি বিতরণের মতো ফলও হয় অনেকের। কারণ গাইড নির্ভর প্রশ্নপত্র আর উত্তরপত্র মূল্যায়নের নীতিহীনতায় কোনো বাধা থাকে না। শেষ পর্যন্ত উচ্চতর শিক্ষায় ভর্তি হতে গিয়ে বাধা পায়। তখন কেঁচেগণ্ডুষ করেও পার পাওয়া যায় না। বেসরকারিতে ধাবিত হতে হয়। এতে ডিগ্রি পায়। শেখেনা। শোনা যায় ভারতের একটি রাজ্যে নাকি কিছু ঝাড়ুদার পদের জন্য কয়েক হাজার এমবিএ ও ইঞ্জিনিয়ার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এমন অবস্থা আমাদের দেশেও ঘটতে দেরি নেই। অনেকে মনে করেন অপরিকল্পিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, পঠন-পাঠনে ঘন ঘন পদ্ধতি পরিবর্তন আর একাধিক পরীক্ষার বোঝা বিপণ্নতা ডেকে আনছে। আগে সালতামামি পরীক্ষা হতো। সারা বছরের বিষয় শিক্ষার্থী কতটুকু ধারণ করলো তার যথার্থ পরীক্ষা। আর বিশেষায়িত বা অন্যকোনো ডিগ্রির ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান থাকতো বলে শিক্ষার্থীর মেধায় ধারণের ক্ষমতারও পরীক্ষা হয়ে যেত। পরীক্ষার অর্থ কেবল সনদ নয়- শিক্ষা যথাযথ হলো কিনা তা যাচাই করা। এ বিষয়টি আমরা ভাবিনা। কেবল কৃতিত্ব দেখাবার জন্য বিদেশি ভাবনা ধার করে এনে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পরিণাম কী হয়েছে, তা আমলে আনি না।
ভাষা শেখার আগে ব্যাকরণ রপ্তকরাকে প্রমথ চৌধুরী মুখে কালি লাগার সাতে তুলনা করেছিলেন। (বিষয়টি মাতৃভাষার জন্য, বিদেশি ভাষার জন্য নয়।) রবীন্দ্রনাথ মালমসলা স্তূপীকৃত করার সাথে নির্মাণ কৌশল না শেখানোকে শিক্ষার অপচয় ভেবেছেন। বলেছেন: ‘সংগ্রহযোগ্য জিনিসটা যখনই হাতে আসে তখনই তাহার ব্যবহারটি জানা, তাহার প্রকৃত পরিচয়টি পাওয়া, জীবনের সংগে সংগে জীবনের আশ্রয়স্থলটি গড়িয়া তোলাই রীতিমত শিক্ষা’।
আমরা ভবিষ্যৎ না ভেবে, প্রজন্মকে অক্ষম করার তালে পদ্ধতি বদলাতে ব্যস্ত! যা শিক্ষার্থীর তেমন উপকারে আসেনা। দেখা যাচ্ছে, সর্বোচ্চ সনদ সংগ্রহ করে ইংরেজি দূরে থাক বাংলা ভাষাতেও শুদ্ধ দরখাস্ত লেখতে পারে না। যাহোক, বেচারা শিক্ষা নিয়ে গিনিপিগের হাল শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকের নির্লিপ্ততা এবং উন্নাসিকতা। শিক্ষক হবেন ধরিত্রীর মতো সর্বংসহা। তাঁর প্রকৃতি ললিতে-কঠোর। তিনি জননীর মতো লালন করবেন আবার প্রাচীন পণ্ডিত-ঋষির মতো প্রয়োজনে হবেন দুর্বাসা।
শোনা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশের শর্ত হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি আবশ্যিক হিসেবে ধরা হচ্ছে। তাই দিয়ে মেধা ও যোগ্যতার পরিমাপ কঠিন। কারণ ঘরে ঘরে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সনদ বেচার দোকান হিসেবেই সেগুলো গণ্য হতে চলেছে। আর পিএইচডি এখন পয়সা দিলে অনায়াসে পাওয়া যায়। অনেকে চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করে ডিগ্রি আয়ত্তে আনে। সুতরাং পিএইচডি মেধার মাপকাঠি নয়। দেখা গেছে অনেকে পিএইচডির পর আর কখনো এককলম লেখতে পারেনি। মেধা কেনার বিষয় নয়। তা বিধিদত্ত।
সামনে আমাদের সন্তানরা নতুন শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবার উদ্দীপনার দিন গুনছে। আবার বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হবার প্রাণান্ত পরিশ্রম করছে। সংশ্লিষ্টদের উচিত, স্থিতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা বজায় রেখে যথার্থ শিক্ষক দিয়ে মেধা পরিচর্যায় এগিয়ে আসা। হঠাৎ শিরোনাম হবার জন্য যেন তুঘলকি না হয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ