শিক্ষা নিয়ে যত সব ভাবনা

আপডেট: অক্টোবর ১৬, ২০১৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ণ

অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা
শিক্ষা নিয়ে ‘যত সব ভাবনা নামক’ প্রবন্ধে ইতিপূর্বে বিভিন্ন ধারার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা নিয়ে আমার উপলদ্ধি বিষয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম। তবে কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম ও সিলেবাস নিয়ে কিছু লিখিনি । পরবর্তীতে কওমি মাদ্রাসা নিয়ে পৃথকভাবে লিখার ইচ্ছা রইল ।
কোন স্তর থেকে ইংরেজি পড়ানো হবে এ নিয়ে র্দীর্ঘদিন থেকে আমাদের শিক্ষাবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই ইংরেজি বিষয়টি চালু করেছেন। বর্তমানে আমরা প্রথম শ্রেণি থেকে ডিগ্রি স্তর পর্যন্ত ইংরেজি বিষয়টি বাধ্যতামূলক রেখেছি। বিভিন্ন শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব যে, ছাত্র/ছাত্রীরা অধিকাংশই ইংরেজি বিষয়ে ফেল করছে। জেএসসি/ জেডিসি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরে ফলাফল বিশ্লেষণ করলেই এটা আমাদের নজরে আসবে। ১৩ বছর বাধ্যতামূলক ইংরেজি পড়েও অধিকাংশ ছাত্র/ছাত্রী শুদ্ধভাবে ইংরেজি উচ্চারণ, শুদ্ধ বানান, আবেদনপত্র, প্রতিবেদন বা প্রবন্ধ এখনও লিখতে পারে না। এর কারণ হয়তো বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখবো, যেহেতু এটা একটি বিদেশি ভাষা আমরা কেউঁ প্রাথমিক জীবনে বাড়িতে বা বাড়ির বাইরে এ ভাষা ব্যবহার করি না, ছাত্র/ছাত্রীরাও নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক কথোপকথন ইংরেজিতে করে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উপযুক্ত ইংরেজি শিক্ষকের অভাব রয়েছে। পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি আছে যেমন- চিনা, জাপানি, শুধুমাত্র নিজেদের ভাষায় শিক্ষা অর্জন করেই নিজেকে উন্নত বিশ্বের কাতারভুক্ত হয়েছে। যে সকল শিক্ষার্থী ইংরেজি কেন যে কোনো ভাষা শিখতে চায় তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া যায়। বিদেশে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি একই সাথে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং একই সাথে বিভিন্ন ভাষা শিখেছে। আমার বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের বয়স ও ধারণ ক্ষমতা বিবেচনা করে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে ইংরেজিকে যদি রাখতেই হয় তাহলে তৃতীয় শ্রেণি থেকে রাখা যেতে পারে।
বর্তমান শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রথম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত। যদিও একাজ এখনও চুড়ান্ত হয়নি, প্রক্রিয়াধীন আছে। এখনও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো তৈরি হয়নি। এছাড়াও ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। বিদ্যমান মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অধিকাংশ স্কুলে অবকাঠামো ও শিক্ষক আছে। ৯ম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর করা হয়েছে। বিদ্যমান, মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োজিত শিক্ষকবৃন্দ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর যোগ্যতা রাখে কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার। তবে আমার হিসাব মতে, মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৫০% শিক্ষক ¯œাতোকত্তর ডিগ্রিধারী। সাময়িকভাবে হয়তো মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পড়ানোর কাজ চালানো যাবে। তবে আমাদের বক্তব্য সকল ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে পারলে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে। জাতীয়করণের ফলে মাধ্যমিক স্তরে প্রয়োজনীয় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের মাধ্যমিক স্তরে বদলি করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। অবশিষ্টদের যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ¯œাতক/সম্মান শ্রেণি চালু আছে সেখানে বদলি করা যেতে পারে। ঠিক একইভাবে বিদ্যমান মাধ্যমিক স্তরে নিয়োজিত যে সকল শিক্ষকদের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পড়ানোর যোগত্য নেই তাদের নি¤œ মাধ্যমিক স্কুলে বদলি করলে হয়তো কম সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে নি¤œ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষককের সংকটের সমাধান করা যেতে পারে ।
এবারে আমি বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলাম ও সিলেবাস নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করবো। ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত সকল বই আমি পাঠ করার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে ছাত্র/ছাত্রী ও অভিভাবকদের সাথে আলোচনাও করেছি । তাদের বক্তব্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রায় অধিকাংশের মতে বিদ্যমান নি¤œ মাধ্যমিক স্তরে ২টি বিষয় বাদ দেয়া যায়। শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকর্ম ও জীবনমুখি শিক্ষা। প্রথমতঃ শারীরিক শিক্ষা ও কর্মমূখি শিক্ষাসহ পাঠের অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে। কর্মমূখি শিক্ষা ও জীবনমুখি শিক্ষার অনেক বিষয়গুলো বাংলা সাহিত্যে এবং বাংলা দ্বিতীয় পত্রে রচনার মধ্যে নিয়ে আসা যায়। স্বাস্থ্য অংশটুকু বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত করা যায়। এছাড়াও অভিভাবকেরা বলছেন যে, এ দুটি বিষয়ের অধিকাংশই ব্যবহারিক অথচ ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত কোন ব্যবহারিকের ব্যবস্থা নেয়। এছাড়াও অভিভাবকেরা বলছেন যে, বিষয় ২টি যদি রাখা হয় তাহলে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী পরীক্ষার সাথে ব্যবহারিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে বহু নির্বাচনী প্রশ্নের সাথে ব্যবহারিক সংযুক্ত করা দরকার। আমি অবশ্য সকল বিষয়ে ক্রমান্বয়ে বহু নির্বাচনী প্রশ্নের সংখ্যা কমিয়ে আনার পক্ষে। যদি বিষয় ২টি রাখা হয় সেক্ষেত্রে জেডিসি ও জেএসসি পরীক্ষাতেও ব্যবহারিক রাখতে হবে।
বর্তমান মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র/ছাত্রীদের ১২ টি বই এবং ১৪ টি বিষয়ে পড়তে হয়। এখানেও অবিভাবক এবং ছাত্র/ছাত্রীদের ব্যক্তব্য হচ্ছে বইয়ের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে শারীরিক শিক্ষা, খেলাধূলা ও ক্যারিয়ার শিক্ষাকে ঐচ্ছিক বিষয়ের সাথে সংযুক্ত করা যতে পারে এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক অংশটুকু বিজ্ঞানের সাথে সংযুক্ত করা যায়। সম্প্রতি সরকার মাধ্যমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী প্রশ্নে ৩০ নম্বর করা হয়েছে। অপরদিকে সৃজনশীল অংশে ৬টির পরিবর্তে ৭টি প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ছাত্র/ছাত্রীরা ৬টি প্রশ্নের প্রতিটি উত্তরের জন্য গড়ে সাড়ে ২৩ মিনিট সময় পায় এবং ৭টি প্রশ্নের প্রতিটি উত্তরের জন্য গড়ে ২০ মিনিট সময় পাবে। ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য এ ব্যবস্থাটি কষ্টকর। আমার মনে হয় প্রশ্নের সংখ্যা না বাড়ানোই ভাল। যদি ৭টি সৃজনশীল প্রশ্ন রাখতেই হয় সেক্ষেত্রে সৃজনশীল ও বহু নির্বাচনী পরীক্ষার মাঝে যে ১০ মিনিট বিরতি থাকে তা না রাখা উচিৎ।
লক্ষনীয় বিষয় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল প্রশ্ন করার জন্য এখনও দক্ষ শিক্ষক তৈরি করা যায়নি। প্রায়শঃ লক্ষ করছি শিক্ষকেরা নিজেরা প্রশ্ন তৈরি না করে কোন গাইড বই থেকে প্রশ্ন হুবহু তুলে দিচ্ছেন। এছাড়াও লক্ষ্য করছি সরকারের নাকের ডগায় বিভিন্ন শিক্ষক সমিতি পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত বইয়ের বাইরে পাবলিশার্সদের নিকট থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন গাইড বই, নোট বই ও গ্রামার শিক্ষা বই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিনতে বাধ্য করছেন। এটা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।
একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞানের বিষয়গুলো অনেক উন্নতমানের করা হয়েছে তবে বিষয়বস্তুগুলো অনেক সংক্ষেপে লেখা হয়েছে ফলে ছাত্র/ছাত্রীদের এখনও পুরাতন বইয়ের সাহায্য নিতে হচ্ছে। এ বিষয়টি ভেবে বইগুলো পুনঃলিখন করা প্রয়োজন অথবা বিজ্ঞান শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আজকে আমরা সবাই  উপলব্ধি করছি যে, ছাত্র/ছাত্রীদের মানসিক বিকাশের জন্য সহপাঠ কার্যক্রম ক্লাশ রুটিনের অংশ হিসাবে চালু করা প্রয়োজন। এক সময় সহপাঠ কার্যক্রমকে এক্সট্রা কারিকুলাম বলা হতো পরবর্তীতে কো-কালিকুলাম হয়। আমার মনে হয় এসব না বলে বিষয়টিকে কারিকুলামের অংশ বলায় ভালো। এক্ষেত্রে আমি লক্ষ্য করছি অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব। এ কাজগুলো করার জন্য পারদর্শী শিক্ষক গড়ে তুলার জন্য বিশষে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়াও সম্ভব হলে সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য অতিথি শিক্ষক নিয়ে এসে একাজটি আপাতঃ চালানো যায়। তবে সম্ভব হলে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে দরিদ্রতা ও ফলাফল বিবেচনা করে ছাত্র/ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেয়া হয়। আমার বিবেচনা খেলাধূলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কাজে যে সকল ছাত্র/ছাত্রী ভাল তাদের জন্য পৃথক উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।  আমি মনে করি বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে আমরা আসলে শিক্ষার্থী তৈরি না করে পরীক্ষার্থী তৈরি করছি। একটি পাবলিক পরীক্ষা দিয়েই ছাত্র/ছাত্রীদের মেধা ও পারদর্শিতা বিবেচনা করা যায় না। ছাত্র/ছাত্রীদের প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্য সারা বছরের মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসবে যেমন- শ্রেণিতে উপস্থিতি মূল্যায়ণ, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলাফল, আচরণ, সহপাঠ কার্যক্রম ইত্যাদি গ্রহণ করতে হবে ।
ক্রমশ…
লেখক: শিক্ষা কর্মী