শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন নির্যাতনকারীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২০, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শিশু আইন এবং উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা থেমে নেই। মাঝেমধ্যে স্কুলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসছে। যেখানে শিশুকে শারীরিক কিংবা মানসিক- কোনোভাবেই নির্যাতন করা যাবেনাÑ সেখানে শিক্ষকের দ্বারা নির্যাতনে শিশু রক্তাক্ত পর্যন্ত হচ্ছে। এই নির্যাতন কেন বন্ধ হচ্ছে না- সেটা এখনো প্রশ্ন হয়েই থেকে যাচ্ছে।
পাবনার ঈশ্বরদিতে এক শিক্ষার্থীকে নির্মম নির্যাতন করার একটি ঘটনার প্রতিবেদন দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী একটি প্রশ্নের উত্তরে দুটি বানান ভুল থাকার কারণে শিক্ষক ছাত্রীর হাতে যে বেত্রাঘাত করেছেন তাতে ওই ছাত্রীর হাত ফেটে রক্তাক্ত হয়। ঘটনাটি গত সোমবার ঈশ্বরদীর ফতেমোহাম্মদপুর এলাকার সানরাইজ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের। শিক্ষক সাথী খাতুন বেত্রাঘাতের বিষয়টি স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
আাইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভুল স্বীকার ও অনুতপ্ত হলেই অপরাধের মাত্রাটি শেষ হয়ে যায় না। কারণ শিশু নির্যাতনের সাথে আইনের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যা- তাতে তারা বিষয়টি সমঝোতা করার কথাই বলেছেন। কিন্তু এটি দায়মুক্তির ব্যাপার নয়। শিশু আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির অধিনে কোনো শিশু হেফাজেতে থাকলে তাকে আঘাত, বর্জন, পরিত্যাগ, অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ বা অশালিন আচরণ নিষ্ঠুরতা বলে গণ্য হবে। এবং এর জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে। বাবা-মায়ের শাসন আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য, তবে তা নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে গেলে তারাও আইনের আওতায় আসবে। সে ক্ষেত্রে ওই নিপীড়ক শিক্ষক শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কম কথা হচ্ছে না। সভা-সমিতিতে, গণমাধ্যমে নানাভাবে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তথ্য দেয়া হচ্ছে। অথচ স্কুলের শিক্ষকগণই সে ব্যাপারে মোটেও সচেতন হচ্ছে না। পুরোনো ধারণাকে সম্বল করে অনেক শিক্ষক আছেন যারা ভাবেন শিক্ষার্থীদের একটু-আধটু মারপিট না করলে ভাল পড়াশোনা হয় না। কিন্তু ওই শিক্ষক নির্যাতন করে পড়া লেখা যে হয়- সে তথ্যও তার কাছে থাকে না। একটি ধারণার বশীভুত হয়ে কিছু শিক্ষক আছে যারা শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে তৃপ্তি লাভ করেন। এই মানসিকতা বিকৃতিস্বরূপ। এমন মানুষের শিক্ষকতা পেশায় আসা উচিৎ নয়Ñ কিংবা এ পেশায় নিয়োগ দেয়াও সমীচীন নয়।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন বলেছেন, ‘‘শিশুদের জন্য সহিংসতা তাদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন, আমাদের সমাজের একটা বিঘ্নকর বাস্তবতা। শৃঙ্খলামূলক কারণ বা সামাজিক ঐতিহ্য যাই হোক না কেন, কোনোভাবেই এর পক্ষে যুক্তি খাড়া করা যায় না। সহিংসতার একটা ‘যুক্তিসঙ্গত’ পর্যায় হিসাবে এমন কিছু নেই যা গ্রহণযোগ্য। একদিক থেকে আইনি বিধানের ভিত্তিতে শিশুদের প্রতি সহিংসতার মধ্যে সাধারণ শিশুদের প্রতি সহিংসতার ব্যাপারে সহিষ্ণুতার ঝুঁকি থাকে।’

প্রকাশ্যে বা নিরবে যেভাবে হোক না কেন শিশুর প্রতি সহিংসতাকে মেনে নিলে তা একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যা সেই সহিংসতাকে স্থায়ী করে। কোনো রাষ্ট্র সহিংসতার হোতাকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে ব্যর্থ হলে তা একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যাতে বিচার অস্বীকৃতি হয়। অপব্যবহার অব্যাহত থাকলে শিশুর প্রতি সহিংসতা স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, অসমতা বেড়ে যায়, যা গড়ে তোলে এক অশুভচক্র।
তাই এটি দায়মুক্তির ব্যাপার নয়- নিপীড়ক শিক্ষকের শাস্তি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ব্যবস্থাটা দৃশ্যমান না হলে তা অন্যের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক হবে- এতে এই ধারণা তৈরি করে যে, অপরাধ করলে মাফ পাওয়া যায়। বা শিশুদের প্রতি নিপীড়ন চালালে পার পাওয়া যায়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ