শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভাপতি পদের যতো কদর! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে আসতে সুপারিশ, অর্থিক সুবিধা, স্বজনপ্রীতি

আপডেট: October 15, 2020, 12:05 am

শাহিনুল আশিক:


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তদারকি, লেখাপড়ার মান নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ম্যানেজিং কমিটি (স্কুলের ক্ষেত্রে) ও গভর্নিং বডি (কলেজের ক্ষেত্রে) গঠন করা হয়। কিন্তু শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিশ্চিত তরার চেয়ে অবৈধ আর্থিক সুবিধা ও খবরদারির প্রতিই অধিকাংশ সভাপতির নজর থাকে। ফলে কমিটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য যথার্থ ফলপ্রস্যু হয় না।
ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি আসলে কাজটা কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে এমন কথার উত্তরে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালাম জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক বিষয় দেখভাল করবে কমিটি। যেমন- বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, সংস্কার-নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে কমিটির সভাপতিসহ সদস্যরা। কিন্তু বাস্তব চিত্র আলাদা। তবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি অনেক আন্তরিক। তবে ব্যতিক্রমি কিছু সভাপতি আর্থিক সুবিধার জন্য পদ নেয়। আসলে শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে কমিটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করেন এই কর্তকর্তা।
তবে নগরীর টিকাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. ফেরদৌস জানায়, ‘স্কুলে জরুরি মিটিং হলে প্রধান শিক্ষক ডাকলেই আসি। এছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা দেখি। শিক্ষার্থী অনুপস্থিত হলে খোঁজ খবর দেওয়া হয়। এছাড়া মা সমাবেশ করা হয়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির এক সদস্য বলেন, কমিটিতে আছি। তবে স্কুলে তেমন যাওয়া পড়ে না। মিটিঙের বিষয়ে জানালে উপস্থিত হই। তেমন সময় দিতে পারি না, নিজের কাজের জন্য।
এই ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের কথা এখন প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়। কখনো পকেট ভারি, কখনো পছন্দের মানুষকে পদ পাইয়ে দিতে নানা অনিয়ম। শুধু তাই নয়, ঘটে রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষের ঘটনাও। হয় মামলাও।
সম্প্রতি রাজশাহী মসজিদ মিশন একাডেমী স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা কমিটি গঠনে জালিয়াতির ঘঠনা ঘটেছে। এ জালিয়াতিতে অধ্যক্ষের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা। এর আগে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক তদন্তভার দেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সচিব আবু হায়াত মো. রহমতুল্লাহকে। তদন্ত শেষে তিন পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে অধ্যক্ষর অনিয়ম জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ পান তিনি।
এবিষয়ে মুঠোফোনে সচিব আবু হায়াত মো. রহমতুল্লাহ জানান, ‘যে নিয়মে কমিটি হওয়ার কথা ছিলো, সে নিয়ম মানা হয়নি।’
২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় বাঘায় হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় ৫ জন আহত হয়। আহত জুলফিকারের স্ত্রী নাসিমা বাদি হয়ে সাবেক সভাপতি নওশাদসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় আলমগীর হোসেন, চমৎকার হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম জানান, সকালে এডহক কমিটির মিটিং হয়। সন্ধ্যায় মারামারি। তবে সাবেক সভাপতি নওশাদ আলী সাংবাদিকদের জানান, তাদের আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।
২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল তানোরের কামারগাঁ ইউণিয়নের হরিপুর দ্বিতীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন (সভাপতি) মনোনিত করাকে কেন্দ্র করে উত্তজেনা ছড়িয়ে পড়ে। জানা যায়, পরিচালনা কমিটির সভাপতি ব্যতিত অন্য সদস্যদের অনেক আগেই নির্বাচিত করা হয়। তবে দলাদলির কারণে সভাপতি মনোনিত করা হয়েছিলো না। স্থানীয়রা জানান, সভাপতি পদে শফিকুল ইসলাম, আব্দুল লতিব ও বাশাদ প্রার্থী হয়েছিল।
একই বছরের ৫ এপ্রিল পুঠিয়ার নন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে গোপনে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের অভিযোগ তোলা হয়। কমিটি বাতিলের জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের নিকট আবেদন করেন স্কুল কমিটির সদস্যরা।
জানা গেছে, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ ছিলো ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। তবে তফশিল ঘোষণা ছাড়াই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আফরোজ হোসেন (ছুম্মা) কাউকে না জানিয়ে গোপনে কমিটি করে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে জমা দিতে যায়।
এছাড়া ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর তানোরের কলমা ইউনিয়নের চন্দনকৌঠা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি করে পরিচালনা (ম্যানেজিং) কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনের বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বাকশিস) রাজশাহী জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, দেশের সিলেট অঞ্চলে স্কুল বা কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হন অনেকে সামাজিক মর্যাদার জন্য। আর রাজশাহীর এই অঞ্চলে অর্থিক সুবিধা, ক্ষমতা ইত্যাদি কারণে। তিনি আরও বলেন, এখনো জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশে স্কুল বা কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি গঠন করা হয়। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভালো অভিভাবককে এ সমস্ত পদে দিলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
রাজশাহী জেলা শিক্ষা অফিসার নাসির উদ্দিন জানান, কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। বিধি মোতাবেক ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়।
কমিটিতে আসার জন্য এতো আগ্রহ কেনো? এমন কথার উত্তরে তিনি বলেন, বিষয়টি তো আর জানা যায় না। তবে অনেক শিক্ষানুরাগী আসতে চাই কমিটিতে। তারা অনেক টাকা ডোনেট করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ