শিবগঞ্জে ইটভাটা কারণে হুমকির মুখে শিক্ষার্থী ও শতাধিক একর কৃষি ফসল || প্রতিকার চেয়ে পাঁচ হাজার জনগণের স্বাক্ষরিত আবেদন

আপডেট: এপ্রিল ৬, ২০১৭, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি



শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নে পাশাপাশি চারটি ইটভাটার কারণে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৬ কিলোমিটার রাস্তা ও শতাধিক একর ফসলি জমি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। প্রতিকার চেয়ে প্রায় পাঁচ হাজার জনগণের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি আবেদনপত্র জেলা প্রশাসক বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
এর অনুলিপি মাননীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, দুর্নীতি দমন অধিদফতর, বন ও পরিবেশ অধিদফতর এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়েছে।
আবেদনপত্র সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের কয়লার দিয়ার গ্রামের দক্ষিণে কয়লার দিয়াড় মৌজার রাস্তার পার্শে প্রভাবশালী আবু তালেবের মালিকাধীন সেভেন স্টার ইটভাটা, লাইসেন্স নম্বর ২২/০৫, মেয়াদ ০৯/০৩/০৮, তৌফিকুল ইসলামের মালিকাধীন সাথী ইটভাটা লাইসেন্স নম্বর  ৪৩/০৬, মেয়াদ ০৯-০৩-০৮ ও শ্রী জগন্নাথ প্রামানিকের মালিকাধীন সনি ইটভাটা ১ লাইসেন্স নম্বর ১১১/২০০৯ মেয়াদ ১৫-১১-২০১২এবং সনি ইটভাটা ২’র কোন লাইসেন্স নাই, তবে ইটভাটা রয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, সাম্প্রতিককালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষের  নির্দেশ মতো শ্যামপুর  ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিবেদক তহশিলদার  শামসুজ্জামান উল্লেখ করেছেন যে চারটি ভাটার মধ্যে সনি-২এর কোন লাইসেন্স নেই।
সরজমিনে দেখা গেছে, এ চারটি ইটভাটার চতুরদিকে ফসলি জমি ও আমবাগান রয়েছে। আরো রয়েছে ৮-১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষক ও অভিভাবকেরা প্রহরা দিচ্ছে যাতে তারা দুর্ঘটনার কবলে না পড়ে।
এ ব্যাপারে উপর কয়লার দিয়াড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর কবির বলেন, আমার বিদ্যালয় থেকে মাত্র ৩শ গজ দূরে সনি ও সাথী ভাটা রয়েছে। ফলে প্রতিদিন ট্রলি ও ট্রাক্টর যাতায়াতের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রহরা দিয়ে রাখতে হয়। অনেকে ভয়ে বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। শিক্ষার্থী  ফাহিম, সনিরুল, বর্ষা, তাফরিকা ও শিমুয়ারাসহ অনেকে জানান, ইটভাটা থেকে ট্রলি ও ট্রাক্টর যাতায়াতের কারণে আমরা বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার সময় ভীষন আতঙ্কের মধ্যে থাকি। তাছাড়া ধূলাবালির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ি।
পল্লি চিকিৎসক আবু সাইদ লিটন বলেন, ধূলাবালি ও কালো ধূয়ার কারণে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ শাসকষ্ট, এ্যাজমা, ঠান্ডাসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
আবেদনে আরো বলা হয়েছে, ইটভাটার পার্শবর্তী খড়কপুর হতে শাহাবাজপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার রাস্তার বেহাল দশা। এ রাস্তা দিয়ে এলাকার কোন রোগি চিকিৎসা করাতে হাসপাতাল নিয়ে যেতে ভিষন কষ্ট হয়।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোকবুল হোসেন বলেন, ভাটাতে শতশত যানবাহন লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধভাবে যাতায়াত করায় রাস্তা তৈরির অল্পদিনের মধ্যেই ভেঙে যায় এবং ছোট বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। ফলে একদিকে জনগণ পড়ে দুর্ভোগে, অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা নষ্ট হচ্ছে।
আবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ভাটার পার্শবর্তী শতাধিক একর জমির আমবাগান ও ফসলি জমি হুমকীর মুখে রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাটার পার্শবর্তী কয়েকজন আম চাষি জানান, সারাবছর লাখ লাখ টাকা খরচ করে আম বাগান মেরামত করি, আর ফেব্রুায়ারি ও মার্চ মাসে ভাটার কালো ধূয়ার কারণে আম নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আমরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আমিনুজ্জামান বলেন, ইটভাটার কালো ধূয়ার কারণে আমের পিছনে কালো দাগ পড়ে, আম আকারে ছোট হয়ে স্বাদ কমে যায় এবং বাজারে বিক্রি হয় না। তবে যে জমির উপর ইটভাটা অবস্থিত সে জমি ছাড়া অন্য কোন জমির ফসল নষ্ট হয় না।
সেভেন স্টার ইটভাটার মালিক ও ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবু তালেব বলেন, শিবগঞ্জে সরকার অনুমোদিত ২৬টি ভাটারই পার্শে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও আম বাগান রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কর দিয়ে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ভাটা চালাচ্ছি। সরকার নির্দেশ দিলে ভাটা অপসারণ করে নিব। তাছাড়া আমার ভাটার এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান আবেদনের কপি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শুধু শিবগঞ্জেই নয়, জেলার কোথাও আইন সংগতভাবে ইটভাটা স্থাপন করা হয় নি। আইনগতভাবে ভাটা স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। ২০১৬ সালে তদন্ত সাপেক্ষে বেশিরভাগ ভাটা অপসরণের নির্দেশ দিলেও হাইকোর্টে ইটভাটা মালিকদের রীট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলার ১০৮টি ইটভাটার মধ্যে প্রায় ৮৫টি ভাটা অপসরণের আদেশ স্থগিত হয়ে গেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ