শিবগঞ্জে সংগ্রামী দুই নারী || গরু কিনতে না পারায় নিজেরাই তেলের ঘানি টেনে সংসার চালান

আপডেট: আগস্ট ২৪, ২০১৭, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ


স্বামীর রেখে যাওয়া মাত্র দেড় কাঠা জমি ও  একটি সরিষা তেলের ঘানী। এই দুইটিকে পূঁজি করে স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সংসার চালিয়ে আসছি। বাকিতে ছয় কেজি করে সরিষা কিনে নিজেই ঘানী টেনে তেল বিক্রি করে লাভের মাত্র ৭৫/১শ টাকায় তিন সদস্যের সংসার চলছে।
কাঁদতে কাঁদতেই কথাগুলো বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের তেলকুপি গ্রামের হিন্দু পরিবারের অর্চনা রানী।
তিনি জানান, দুই সন্তান রেখে পাঁচ বছর আগে তার স্বামী বনপতি সাহা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তার ঘরে খাবার ও পরার মতো কিছুই ছিল না। শুধু ছিল একটি তেলের ঘানী। ঘানী টানার জন্য গরু কোনো দিনই কিনতে পারেন নি তার স্বামী। এ অবস্থায় জনৈক ব্যক্তির নিকট হতে মাত্র ছয় কেজি সরিষা বাকিতে কিনে নিজেই ঘানি টেনে তেল বের করে সেই তেল ও খৈল গ্রামে বিক্রি করে সরিষার দাম পরিশোধ করে  মাত্র ৭৫ টাকা লাভ পেয়েছিলাম। তা দিয়ে সংসার শুরু করেছিলাম। তখন থেকেই প্রতিদিন গ্রামের স্বচ্ছল কৃষকদেরকে অনুরোধ করে বাকিতে সরিষা কিনে বাড়ি এসে ঘানিতে দিয়ে নিজেই একটানা তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘানী টানি। তেল বের করে তেল ও খৈল বিক্রি করে লভ্যাংশ দিয়ে কোন রকমে সংসার চালায়। অভাবের তাড়নায় বেশি করে সরিষা কিনতে না পারায় প্রতিদিনই গ্রামে ঘুরতে হয়।
তিনি আরো জানান, এর মধ্য থেকেই আবার পিতৃহারা দুই সন্তানের মধ্যে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হয়। এখন পর্যন্ত সেভাবেই চলছি। সরকারি সহযোগিতা পাওয়া বলতে ইউপি সদস্যের মাধ্যমে একটি ভিজিডি কার্ডের অর্ধেক ভাগে মাত্র ১২ কেজি চাল পাই। বিধবা ভাতা বা অন্য কোন সহযোগিতা পাই নি।
কখনো হেরে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১শ টাকা করে লাভ হয়। তবে কোনদিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ঘরে বসে অনাহারেই থাকতে হয়। ভগবানের দয়ায় এভাবেই চলছি। প্রয়োজনে আরো কঠোর শ্রম দিয়ে হালাল রুজির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করবো। তবুও কোনোদিন ভিক্ষা করবো না। তবে সরকার বা কোন সংস্থা একটা গরু ও সামান্য কিছু সরিষার ব্যবস্থা করে দিলে আমার জন্য খুব ভাল হতো। এক প্রশ্নের উত্তরে অর্চনা রানী বলেন, কিছু পাওয়ার জন্য বাপ-দাদার আমল থেকে আওয়ামী লীগ ভালবাসি না। গুরুজনরা শিখিয়ে গেছেন শেখ মুজিবই আমাদের নেতা। এজন্যই তাকে ও তার দলকে ভালোবাসি।
এলাকার কলেজ শিক্ষক আবদুর রহিম ও ব্যবসায়ী বাদল ও ইউপি সদস্য মোফাজ্জল হোসেন জানান, অর্চনা রানী অত্যন্ত সৎ ও কর্মঠ হওয়ায় সংসার সামাল দিতে পেরেছেন।
অন্যদিকে একই  ইউনিয়নের কাগমারীচাঁদপুর গ্রামের রতন চন্দ্র সাহা ও স্ত্রী মতি কল্যাণ সাহা একইভাবে শুধু একটি ঘানীকে পুঁজি করে নিজেরাই ঘানী টেনে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছেন। সরজমিনে গিয়ে কথা হয় তাদের সঙ্গে। স্বামী-স্ত্রী দুইজনে জানান, পূর্ব পুরুষদের সূত্র ধরে তারা পেশায় তেলী (তেল বিক্রি করে)। আগে গরু ও পুঁজি দুটোই ছিল। ব্যবসা ভালোই চলতো। কিন্তু গত কয়েক বছর আগে ছোট বোনের বিয়েতে যৌতুক দিয়ে গিয়ে ঘানীর বলদ বিক্রি করতে হয়েছে। তারপর আর গরু কিনতে পারে নি। জমিজমাও নেই। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া  মাত্র পাঁচ শতক জমিতে ছোট ছোট দুইটি ঘর করে একটি ঘরে পরিবার নিয়ে থাকি এবং একটি ঘরে ঘানী রাখি। স্বামী স্ত্রী কখনো একসঙ্গে কখনো পালাক্রমে ঘানী টানি। প্রতি ঘানীতে সাড়ে সাত কেজি সরিষা দিতে হয়। তেল হয় সোয়া দুই কেজি এবং খৈল হয় সাড়ে কেজি। বিক্রি করে পাই পাই সাড়ে ৬শ টাকা। লাভ হয় ১৭৫ টাকা।
তারা জানান, এলাকার একটি এনজিও হতে সামান্য কিস্তির টাকা উত্তোলন করে সেই টাকা দিয়ে সরিষা কিনি। লাভের টাকা দিয়ে সংসার চালায় এবং সাপ্তাহিক কিস্তি দিই। পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচ জন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটি বড়। পার্শ্ববর্তী সাহেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। গ্রাম থেকেই সরিষা কিনে ঘানী চালাই। কোন দিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে সেদিন বাড়িতে বসে থাকতে হয়। কোনদিন খেতে পাই কোনদিন পাই না। এ পর্যন্ত ইউপি বা অন্যকোথাও থেকে সাহায্য সহযোগিতা পাই নি। ইচ্ছা আছে এভাবে ঘানী টেনে সংসার চালার পাশাপাশি তিন সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ গড়ে তুলবো। এই আমাদের সংসার, এই আমাদের স্বপ্ন। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান রাষ্ট্রে সংখ্যালঘিষ্ঠ হয়েও কোন নির্যাতনের শিকার না হয়েই নির্ভেজাল জীবনযাপন করতে পারছি, যা একমাত্র শেখ হাসিনার আমলেই সম্ভব হলো। আর কি চাইবো। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে বঙ্গবন্ধু সব কিছুই দিয়ে গেছেন।
এ ব্যাপারে শাহাবাজপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক বলেন, আমার সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এলাকার অসহায় পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করা চেষ্টা চলছে।