শিবগঞ্জে হাঁস পালনে স্বাবলম্বী জিয়াউর রহমান

আপডেট: জুলাই ২৪, ২০২০, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ(চাঁপাইনবাবগঞ্জ)সংবাদদাতা


‘মাত্র ৫ বছরের সাধনায় হাঁস পালনের মাধ্যমে প্রতিমাসে গড়ে ৪০/৪৫ হাজার টাকা আয় করার মাধ্য নিজে স্বাবলম্বী হয়েছি, পাশাপাশি ৫ জন লোকের কর্মসংস্থান করতে পেরেছি। ৫ বছরের ব্যবধানে বসতমাটি কিনে বাড়ি করেছি। ১৬ কাঠা জমি কিনেছি। নিরাপদে আছি। কোনো হতাশা বা ভয়ভীতি নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠের বিভিন্ন ডোবায় হাস চরায়। সন্ধ্যায় খামারে ফিরে এসে হাঁসগুলোকে খামারের মধ্যে সুরক্ষার ব্যবস্থা করে নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারি। এরচেয়ে আর সুখ ও শান্তি চাইবো?’Ñ কথাগুলো বললেন, হাঁসের খামারের মালিক শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জিয়াউর রহমান (৪৫)। সরেজমিনে খামারে গেলে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় জিয়াউর রহমানের। তিনি বলেন, বর্তমানে আমার দুটি খামারে ১ হাজার ৬শ পাতি হাঁস ও ২৬৮টি রাজহাঁস আছে। একটি চৌকার মাঠে ও অন্যটি মনোহরপুর মাঠে ভাটের কাছে। বর্তমানে ৬শ পাতিহাঁস ডিম দেয়। ডিম বিক্রি করে আয় হয় প্রতিদিন ৬ হাজার টাকা। তবে কিছুদিন পর অন্য হাঁসগুলো ডিম দেয়া শুরু করলে আয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে। ৫ জন কর্মচারী রয়েছে। তাদের প্রতিজনকে মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতন ও অন্যান্য খরচ দিতে হয়। তাছাড়া হাঁসের ওষুধ ও খাওয়া খরাচ আছে। সমস্ত খরচ বাদে মাসের শেষে ৪০/৪৫ হাজার টাকা আয় করতে পারি। আমার দুই মেয়ে ও ১ ছেলে রয়েছে। বড় মেয়েকে কিছুটা লেখাপড়া করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। মেঝো ছেলে আই এ পড়ছে ও ছোট মেয়েটি ৯ম শ্রেণিতে পড়ে। বর্তমানে সংসারে কোনো অভাব অনটন নেই বললেই চলে। জিয়াউর রহমান আরো বলেন, গত ৫বছরে আমার দুটি খামারে ৩হাজার ৩শ হাঁস ছিল। করোনা ভাইরাসে বিরাট একটা হোঁচট খেূেয়ছি।করোনায় আতঙ্কিত হয়ে বাড়ির বাইরে যায়নি। অর্থিক সংকটে পড়ে ১০লাখ টাকায় ১ হাজার ৭শ হাঁস বিক্রি করে কর্মচারীরাকে বেতন দিয়েছি। সংসারে খরচ চালিয়েছি এবং হাঁসের খাবার ও ওষুধ কিনেছি। শুধু করোনার সময়েই নয় গত ৫ বছরে সরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি। শুধু খামারের নিবন্ধন পেয়েছি। আগে প্রাণিসম্পদ অফিসের কোনো লোকজন আসতো না। কিছুদিন হতে লিটন নামে একজন মাঝে মাঝে আসে এবং কিছু পরামর্শ দেয়। হাঁসের চিকিৎসা ও অন্যান্য পরামর্শ নেয়ার জন্য নওগাঁ জেলার সাপাহারের এক পশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখি এবং মাঝে মাঝে খামারে আসেন। খাবার ও ওষুধ বাবদ প্রতিদিন খামার প্রতি ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। ইচ্ছা আছে, আমার খামারের পরিধি আরো বাড়াবো এবং প্রমাণ করবো যে শুধু চাকরি বা ব্যবসা করেই মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারে, এমনটি নয়। খামার তৈরি করে হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হওয়া যায় এবং অনেক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। কিভাবে হাঁস পালনের ইচ্ছা হলো- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু আমদানি করে গরুর ব্যবসা করতাম। সারা বছর ব্যবসা করে বছর শেষে হিসাবে করে ১১ লাখ টাকা লোকসান হয়। বাড়ির যা কিছু ছিল তার বিক্রি করে দেনা শোধ করি। হাঁস পালনের অনুপ্রোরণা সম্পর্কে তিনি বলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুখুরিয়া ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের হাঁসপালন কারী বাবুলের সাথে পরামর্শ করে অনুপ্রেরণা পেয়ে ২০১৫ সালে তিনজন মিলে প্রতিটি হাঁস ৩৯০ টাকা দরে ১ হাজার ১শটি হাাঁস ক্রয় করে খামারের কাজ শুরু করি। কিছুদিন পর দুইজন শেয়ারদার সরে গেলে আমি একাই হাঁসপালন করতে শুরু করি। অল্প সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত আয় হওয়ায় হাঁসের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৩ হাজার ৩শ টিতে পরিণত করি। কিন্তু সর্বনাশা করোনার কারণে হোঁচট খেয়ে ১ হাজার ৭শ হাঁস বিক্রি করেছি। তবে আগামীতে হাঁস ও খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি করবো ইনশাল্লাহ। ক্ষতি সম্পর্কে তিনি বলেন হাঁস পালনে তেমন কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। তবে প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও শীতকালে হঠাৎ করে পাতলা পায়খানা ও প্যারালাইসিক সহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে হাঁস মারা যায়। তবে এ সম্পর্কে খুব সচেতন থাকতে হয়। আমি নিজে সচেতন থাকায় এধরনের ঘটনার সম্মুখীন এখনো হয়নি। এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কমকতা(এল,ই ও) রনজিত চন্দ্র সিংহ বলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে জিয়াউর রহমানের হাাঁসের খামার সবচেয়ে বড় এবং তিনি হাঁস পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে আর্থিক অনটনে পড়ে কম দামে ১ হাজার ৭শ হাঁস বিক্রি করে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাংসরিক ৪% মুনাফায় লোন প্রদান করা হবে। যা আমাদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসেও কিছু নির্দেশনা এসেছে। সে অনুযায়ী আমরা তালিকাভুক্তি করেছি। হাসঁপালনকারী খামারিদের তালিকায় জিয়াউর রহমানের নাম আছে। তার নিবন্ধন আছে। তাকে এ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা চলছে। আশাা করি সে প্রায় ৫ লাখ টাকা লোন পাবে। যা দিয়ে তিনি তার খামারের পরিধি বাড়াতে পারবে। তাছাড়া তার খামারের প্রতি আমাদের লক্ষ্য রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সরবরাহ করেছি। তিনি আরো বলেন, শিবগঞ্জে হাঁসের ১০টি খামার রয়েছে। তারাও প্রায় স্বাবলম্বী হতে চলেছে। হাঁস পালনের জন্য শিবগঞ্জ উপজেলার যে সমস্ত এলকায় খাল-বিল নদী বেশি আছে, যেখানে প্রাকৃতিক খাবার বেশি পাওয়া যায়, সেখানে হাঁসের খামার তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ