শিবগঞ্জে ৪০ দিনের কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ ।। শ্রমিকের তালিকায় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনের নাম!

আপডেট: মার্চ ২২, ২০১৭, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ অফিস


চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের উজিরপুর ইউনিয়নে অতি দরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকল্পে অতিদরিদ্র শ্রমিকের তালিকায় নিজেদের স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, শশুর, ভগ্নিপতি, মামাতো-খালাতো ভাইয়ের স্ত্রীসহ নিকট আত্মীয় স্বজনদের নাম দিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দিন ও তার ঘনিষ্ঠ ইউপি সদস্যরা কর্মসূচির বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাত করেছেন বলে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ তদন্তে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর দেয়া অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দিন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই কর্মসৃজন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচির টাকা অবাধে লোপাট করে যাচ্ছেন। ফলে এলাকার গরীব দুঃখী মানুষেরা চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতি দরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচির জন্য ফয়েজ চেয়ারম্যান তার ইউনিয়নে ৮৩ শ্রমিকের একটি বরাদ্দ পান। গ্রামীণ দরিদ্র মানুষদের দিয়ে বিভিন্ন সড়ক ও হাটঘাটের মাটি ভরাটের কাজ করিয়ে প্রতিজন শ্রমিককে ৮ হাজার টাকা করে দেয়ার কথা রয়েছে। এলাকার অতি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের জন্যই মূলত সরকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু উজিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফয়েজ ফয়েজ ও ইউপি সদস্যরা দরিদ্র শ্রমিকের তালিকায় নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের নাম দিয়ে ভুয়া তালিকা করে ৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকার একটি বিল প্রস্তুত করে জমা দিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসে। শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকা এসব ব্যক্তিদের অধিকাংশই গরীব নয়। তাদের কেউ না কেউ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের স্বামী, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, খালাতো ভাইয়ের স্ত্রী, ভগ্নিপতি, মামাতো ভাইসহ নিকট আত্মীয়-স্বজন।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ইউপির ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নারী সদস্য মাহমুদা খাতুন তার এলাকার শ্রমিকের তালিকায় তার স্বামী শফিকুল ইসলামের নাম জমা দিয়েছেন। এই ইউপি সদস্য একই সঙ্গে তার দুই মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন ও আয়েশা খাতুনের নামও শ্রমিকের জমা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলিয়েছেন। আবার ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ফরজন আলী ৪০ দিনের কর্মসূচিতে নিজের ছেলে রাসেল আলী, শশুর আফসার আলী ও ভাগ্নে জিল্লুর রহমানের নাম দিয়েছেন। তাদের নামে বিলও জমা দিয়েছেন।
অভিযোগ মতে, ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য নজরুল ইসলাম তার ছেলে রেজাউল ছাড়াও আরেক ছেলে শাহীন ও শাহীনের স্ত্রীর নামে ৪০ দিনের কর্মসূচির শ্রমিকের তালিকা করে টাকা উত্তোলনের জন্য অফিসে জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দিন তার বোনের স্বামী সামশুদ্দিন, খালাতো ভাই ধুলুর স্ত্রী তাসনারা বেগম, মামাতো ভাই রকিবুলসহ ৮ জন নিকট আত্মীয়ের নাম শ্রমিকের তালিকায় দিয়েছেন টাকা তোলার জন্য। এছাড়া চেয়ারম্যান ফয়েজের বডিগার্ডসহ ক্যাডারদের নামেও বিল জমা করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফয়েজের নিজস্ব ক্যাডার (বডিগার্ড) বাবুল একটি নিউব্র্যান্ড পালসার মোটরসাইকেলে করে এলাকা চষে বেড়ায়। তার নাম ৪০ দিনের কর্মসূচির তালিকায় রেখে বিল করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের আরো দুই ক্যাডার জাহাঙ্গীর, ফারুক, ডলার আলী, শরিফুল, জেম, শাহীনের নামও রয়েছে ৪০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচির তালিকায়।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, ফয়েজ চেয়ারম্যান তার ভোটার বিবেচনায় একই পরিবারের দুরুল হোদা, তার ছেলে নজরুল ও নজরুলের স্ত্রী নাজরীনকে অতি দরিদ্র শ্রমিক দেখিয়ে বিল জমা করেছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগে আরো জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজ শিবগঞ্জ থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত একজন সন্ত্রাসী। তার নামে অপহরণ ও ছিনতাইসহ চারটি মামলার ওয়ারেন্ট রয়েছে শিবগঞ্জ থানায়। এলাকায় চলাফেরার সময় একদল সশস্ত্র ক্যাডার তার সঙ্গে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে শোডাউন করে। ভয়ে এলাকার লোকজন তার বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারে না। আর এই সুযোগে ইউনিয়ন পরিষদে আসা বরাদ্দও ইচ্ছেমতো লোকজনের নাম দিয়ে তুলে আত্মসাত করছেন তিনি।
কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে শ্রমিকের তালিকায় নিজের আত্মীয়-স্বজনদের নাম রাখার বিষয়টি স্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দিন বলেন, সারা বাংলাদেশেই এভাবে কাজ হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এমন অভিযোগ তিনিও পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।