শিল্পী সংগ্রামী সত্যেন সেন

আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

জুলফিকার আহমেদ



উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মেহনতি মানুষের এক পরম সুহৃদ শিল্পী সংগ্রামী সত্যেন সেন। তাঁর আন্দোলন ও নানামুখি সৃজনশীল কর্মকা-ের উপজীব্য শোষিত নিপীড়িত মানুষ। তিনি ছিলেন কৃষক আন্দোলনের নেতা, শ্রমিকদের বন্ধু, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক সর্বোপরি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃত, সংগঠক।
সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ বিক্রমপুরের সোনারং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সত্যেন সেন মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত প্রাণ মানুষ। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি শোষণ মুক্ত সমাজ। যে সমাজে মানুষ প্রকৃত মানুষের মত বাঁচবে, মানুষের দ্বারা মানুষ শোষিত হবে না, পেশীশক্তির দাপট থাকবে না, অনাচার অবিচার থাকবে না।
রাজনীতিকেই তিনি করেছিলেন জীবনের ধ্রুবতারা। স্বদেশের প্রতি অনুরাগ থেকে এবং উপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীন করার ব্রতে ১৯২১ সালে স্কুল জীবনে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। কংগ্রেসের অহিংস জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম তাঁকে তুষ্ট করতে পারেনি। ১৯২৪ সালে কলেজ জীবনে স্বশস্ত্র স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হন। স্বদেশ মুক্তির আকাক্সক্ষা থেকে তিনি উপলব্ধি করেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও মানুষের প্রকৃত মুক্তি সাধিত হবে না। ত্রিশ দশকে মানবমুক্তির পথ হিসেবে তিনি মার্ক্সীয় ভাবাদর্শে দীক্ষা নেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির শোষণ মুক্তির সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। আর তাই তাঁর অনিবার্য পরিণতি (!) আত্মগোপন ও কারাবাস। ১৯৩১ সালেই কারাবাস হয় তিন মাসের জন্য। ১৯৩৩ সালে আবার কারাজীবন শুরু হয় এবং তিনি পাঁচ বছর কারাভোগ করেন। ১৯৪২ সালে সোমেন চন্দ নিহত হলে তিনি ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘে সক্রিয় হন। চল্লিশের দশকে মেহনতি মানুষ শোষণ মুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার প্রেরণা সংবলিত অনেক গান রচনা করেন। তাঁর রচিত অনেক গণসংগীত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হয়েছে। অনেক গণসংগীত আজও মুক্তিযুদ্ধ ও শোষণ মুক্তির চেতনাকে শাণিত করে চলেছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর কারাগার হয়ে উঠে সত্যেন সেনের অনিবার্য বাসস্থান। ১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ চার বছর, ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৫ এক বছর, ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ ছয় বছর এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ তিন বছর, পাকিস্তানের তেইশ বছরের মধ্যে চৌদ্দ বছরই তাঁর জেলে কাটে। তিনি কারাগারকেই পরিণত করেন আন্দোলন সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ারে। কারাভ্যন্তরে নিরবিচ্ছিন্ন অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টির অন্বেষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক সত্যেন সেন লেখক সত্ত্বার জাগরণে উদ্ভাসিত হন। সত্যেন সেন লেখা শুরু করেন ১৯৫৭ সালে যখন তাঁর বয়স ৫০ বছর। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পঁচিশ বছরে তাঁর রচিত গ্রন্থসংখ্যা ৪২। তিনি লিখেছেন উপন্যাস, ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ক, শিশুতোষ, বিভিন্ন সংগ্রামী জীবন কাহিনিসহ বিচিত্রমুখি গ্রন্থ। তাঁর লেখা উপন্যাস কোনটি ঐতিহাসিক, কোনটি সামাজিক আবার কোনটি রাজনৈতিক। মার্ক্সীয় দর্শন সূত্রের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী ও বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি বিজ্ঞান চর্চায় ও ইতিহাস অন্বেষায় প্রয়োগ করেছেন। মানুষের শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব সংগ্রামকে তিনি ইতিহাসের মধ্যে খুঁজেছেন অহর্নিশ।
তার রচিত গ্রন্থ
আলবেরুণী, ভোরের বিহঙ্গী, জীববিজ্ঞানের নানাকথা, সেয়ানা, গ্রামবাংলার পথে পথে, ইতিহাস ও বিজ্ঞান ১ম খ-, ইতিহাস ও বিজ্ঞান ২য় খ-, বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম, সীমান্ত সূর্য গাফ্ফার খান, অপরাজেয়, কুমারজীব, মানব সভ্যতার ঊষালগ্নে, বিদ্রোহী কৈবর্ত, মনোরমা মাসীমা, পাপের সন্তান, বিপ্লবী রহমান মাস্টার, শহরের ইতিকথা, উত্তরণ, পাতাবাহার, মসলার যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহের কাহিনী, অভিশপ্ত নগরী, প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ, পুরুষমেধ, সাত নম্বর ওয়ার্ড, রুদ্ধদার মুক্তপ্রাণ, মা, একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে, পদচিহ্ন, অভিযাত্রী, এটমের কথা, আমাদের এই পৃথিবী, মেহনতি মানুষ, আইসোটোপ, বিকিরণ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা, প্রাচীন চিন, প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ, ইতিহাস ও বিজ্ঞান ৩য় খ-, বিশ্বমানবের মহাতীর্থ, কমরেড মনিসিং, ইতিহাস ও বিজ্ঞান ৪র্থ খ- (অপ্রকাশিত)।
এটমের কথা, জীববিজ্ঞানের নানাকথা, ইতিহাস ও বিজ্ঞান প্রভৃতি গ্রন্থে মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও বিজ্ঞানের অবদানকে সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছ বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। আমাদের এই পৃথিবী, মসলার যুদ্ধ, মানব সভ্যতার ঊষালগ্নে, প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কৃষকদের সংগ্রাম, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা, গ্রাম বাংলার পথে পথে গ্রন্থে প্রথাগত ইতিহাস চর্চার বিপরীতে ইতিহাস আন্বেষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমি দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি জীবন প্রকৃতি রচনার ক্ষেত্রে অনেক ব্যক্তিত্বকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন। সমাজ রূপান্তর ও মানব মুক্তির সংগ্রামে বিশিষ্ট অবদানের জন্য সত্যেন সেনের লেখক সত্ত্বার কাছে তাঁরা বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন, ইতিহাসে নায়কোচিত মর্যাদা লাভ করেছেন। সাত নম্বর ওয়ার্ড, উত্তরণ, মা প্রভৃতি উপন্যাসে সত্যেন সেনের রাজনৈতিক বোধের প্রকাশ ঘটেছে। এসব গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চেতনাকে আলোড়িত ও নিয়ন্ত্রিত করে। রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ, সেয়ানা, পদচিহ্ন, একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে প্রভৃতি উপন্যাসে তিনি সাম্প্রদায়িক চেতার সম্পূর্ণ ঊর্দ্ধে উঠে মানুষকে কেবল মানুষ হিসেবে দেখেছেন, নি¤œবর্গের জীবনে তিনি খুঁজেছেন কেবল মনুষত্বের মহিমা। ফলে পকেটমার, খুনি, ডাকাত, ধর্ষক, প্রতারক ও নিঃস্ব চরিত্রগুলো অসাধারণ হয়ে উঠেছে। পুরুষমেধ, অভিশপ্ত নগরী, পাপের সন্তান, বিদ্রোহী কৈবর্ত, আলবেরুনী, অপরাজেয় প্রভৃতি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসে ইতিহাস আন্বেষায় প্রতিনিয়ত রাজশক্তি ও ধর্মীয় রক্ষণশীল শক্তির আঁতাত ও দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। অপরদিকে ক্ষমতা কাঠামোর বাইরের নি¤œবর্গীয় জনগোষ্ঠীর উত্থান প্রচেষ্টায় সভ্যতার অগ্রগতিতে সর্বদা সহায়ক বলে তিনি মনে করতেন। ইতিহাস জাগতিকতা ও মানবতাবাদে আস্থাশীল, ইতিবাচক জীবনবোধ উজ্জীবিত ও বিজ্ঞানমনস্ক সত্যেন সেনের কাছে শোষণ বৈষম্যমুক্ত সমাজ নির্মাণই ছিল সার্বক্ষণিক ধ্যান।
সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক সত্যেন সেন বুঝেছিলেন স্বাধীনতা আর মুক্তির ঠিকানা সাম্যবাদী সমাজ গড়ার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন জরুরি। আর সেই সাম্যবাদী চেতনায় দীপ্ত সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী সত্যেন সেনের ভাবনায় ছিল এমন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন যা মুক্তির পথ দেখাবে, যে সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাংস্কৃতিক কর্মকা- গণমানুষকে যুক্ত করবে সংস্কৃতির সঙ্গে, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে শৈল্পিক অবয়বে প্রকাশিত হবে শোষিত জনতার মুক্তির চেতনা। এই লক্ষ্য নিয়েই ১৯৬৮ সালে ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় সত্যেন সেনের নেতৃত্বে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। হঠাৎ করে নয়- উপমহাদেশের প্রগতিশীল, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঐতিহ্যের ধারা বেয়ে অগ্রসর হয়ে অনেক বাধা ডিঙ্গিয়ে প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায় এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটি। আত্মপ্রকাশের পর উদীচী সত্যেন সেনের মতো নিবেদিত প্রাণ আদর্শবাদী সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নেতৃত্বে সংগঠনটি দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। উদীচী শুধু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয় উদীচী একটি আন্দোলন। উদীচী সংস্কৃতি চর্চা করে এবং গণমানুষের সাংস্কৃতি চর্চার পথ নির্দেশ  করে। জন্মলগ্ন থেকে উদীচী তার সংগামী লক্ষ্য দেশ ও জনগণের আকাক্সক্ষা, সুখ দুঃখ উপলব্ধি করে মানুষকে সচেতন ও জাগিয়ে তোলার কাজে সত্যেন সেনের পধ ধরে অবিচল রয়েছে। দেশ বিদেশসহ প্রায় চারশত শাখা নিয়ে উদীচী এখন উপমহাদেশের সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগঠন। উদীচীর দৃঢ়তা সহ্য হয় না প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের শক্তির। তাই তারা বার বার আক্রমণ করেছে উদীচীকে। ১৯৯৯ সালে ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর সম্মেলনে তাদের বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয়, ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় উদীচীর উপর হামলায় ২ জন উদীচীর কর্মীসহ ৮ জন নিহত হয়। কিন্তু উদীচীর পথ চলাকে থামাতে পারেনি। এটা সম্ভব হয়েছে সত্যেন সেনের আদর্শের অনুসারীদের একাগ্রচিত্ততা, অদম্য ও নিরলস পরিশ্রম এবং সাধারণ মানুষের সাথে অকৃত্রিম সম্পৃক্ততার জন্য।
সত্যেন সেন তাঁর সাহিত্য কর্মের জন্য তিনটি পুরস্কার পান। তা হলো ১৯৬৯ সালে আদমজি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৮৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ২০১৩ সালে শিল্পকলায় একুশে পদক পেয়েছে। এই পদকের বড় ভাগীদার তিনি।
৬৫ সালের পর থেকে সত্যেন সেনের শরীর খারাপ হতে থাকে। চোখে কম দেখছিলেন। শারীরিক দুর্বলতার জন্য হাঁপানিও বাড়তে থাকে। নতুন কিছু লেখা বন্ধ হবার উপক্রম হয়। এটি ছিল তাঁর জন্য খুবই কষ্টের। ডিকটেশন দিয়ে লেখার চেষ্টা করতেন। এই অবস্থায় ১৯৭৩ সালে তিনি আশ্রয় নেন তাঁর সে জদি প্রতিভা সেনের কাছে কলকাতায়, শান্তি নিকেতনে। ১৯৮১ সালে ৫ জানুয়ারী তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সেখানেই।
শিল্পী সংগ্রামী সত্যেন সেনের মতো মানবধর্মে বিশ্বাসী, শোষিত নিপীড়িত মানুষের সুহৃদ, সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতার ঊর্দ্ধে ওঠা বিশ্ব নাগরিক, প্রকৃত ইতিহাস নির্মাতা, স্বচ্ছ রাজনৈতিকবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব আদর্শনিষ্ঠ, আড়ম্বরহীন সাধক শিল্পী সংগ্রামী আজ খুবই প্রয়োজন।
লেখক: উদীচী কর্মী, রাজশাহী।