শিশুর ডায়রিয়া রোধ করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি

আপডেট: মে ১৫, ২০২২, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

মনোজিৎ মজুমদার:


গরম বাড়ার সাথে সাথে দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত এক মাসে এ সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বড়দের পাশাপাশি শিশুরা ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা বিভিন্ন রোগে সহজেই আক্রান্ত হয়। স্কুলগামী শিশুরা গরম এবং রাস্তায় ধুলাবালির সংস্পর্শে আসার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেক শিশু রাস্তার পাশে অস্বাস্থ্যকর মুখরোচক খাবার খেয়ে ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।

আইসিডিডিআরবি’র সম্প্রতি এক তথ্যে দেখা গেছে, গত এক মাসে সেখানে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। ঢাকার শিশু হাসপাতাল এবং ইনস্টিটিউটের অবস্থাও একই রকম। এছাড়া সারাদেশে সব হাসপাতালেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, দূষিত পানি পান, সঠিকভাবে হাত না ধোয়া, অপরিচ্ছন্ন উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণ ইত্যাদি ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।

ডায়রিয়া একটি সাধারণ রোগ হলেও অসচেতনতা এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসার অভাবে এ রোগে মৃত্যু হচ্ছে। শিশুরা এর প্রধান শিকার। ডায়রিয়া থেকে রক্ষার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রতিকারের ব্যবস্থা করাও জরুরি। এ জন্য ডায়রিয়া সম্পর্কে সবারই প্রাথামিক জ্ঞান থাকা এবং সচেতন হয়ে তা প্রতিরোধ করা একান্ত আবশ্যক।

দিনে তিন বা তার বেশি বার পাতলা পায়খানা হলে ডায়রিয়া বলে ধরে নেওয়া হয়। ডায়রিয়া মূলত একটি পানিবাহিত রোগ। দূষিত পানি পান বা দূষিত খাবার গ্রহণের জন্য এ রোগ হয়ে থাকে।

এছাড়া পরিপাকতন্ত্রে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী সংক্রমণের কারণে ডায়রিয়া হতে পারে। তাই নিরাপদ বা বিশুদ্ধ পানি পান করাসহ যাবতীয় কাজে বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর্সেনিক মুক্ত টিউবওয়েলের পানি অথবা পানি ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে পান করতে হবে। তাছাড়া, পানি শোধন ট্যাবলেট, ফিল্টার, ফিটকিরি ও বিচিং পাউডার দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করা যায়।

একসময় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ মারা যেত। আইসিডিডিআরবি’র ওরস্যালাইন আবিস্কারের ফলে ডায়রিয়ায় মৃত্যুহার অনেক কমেছে। শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।

সঠিক পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ও পরিস্কার হাতে স্যালাইন তৈরি করতে হবে। আইসিডিডিআরবি’র ওরস্যালাইন ডায়রিয়া প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এ স্যালাইন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। ১২ ঘণ্টার পর অবশিষ্ট থাকলেও তা ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন তৈরি করতে হবে।

ওরস্যালাইন হাতের কাছে না থাকলে ঘরে বসেও আধা লিটার বিশুদ্ধ পানি, এক চিমটি লবণ এবং এক মুঠো গুড় অথবা চিনি দিয়ে স্যালাইন তৈরি করা যায়। শিশুর ওরস্যালাইন খাওয়ানোর নিয়ম হলো- প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ২৪ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য ৫০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম, ২ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর জন্য ১০০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম। ১০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য চাহিদা অনুযায়ী খাওয়াতে হবে। দুই বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।

ডায়রিয়া সাধারণত তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পাতলা পায়খানার সঙ্গে যদি রক্ত, জ্বর, বমি এবং পেটব্যথা থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় জটিলতা হচ্ছে পানিশূন্যতা। পানিশূন্যতা হলে শিশু দূর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে।

পানিশূন্যতা বোঝার উপায় হল- শিশুর অবস্থা যদি অস্থির, খিটখিটে হয়, চোখ যদি বসে যায়, চোখে যদি পানি না থাকে, মুখ ও জিহ্বা যদি শুকনো থাকে, শিশুর পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়, শিশু যদি ঝিমিয়ে পড়ে, অজ্ঞান কিংবা ঘুম ঘুম ভাব থাকে তাহলে বুঝতে হবে শিশু মারাত্মক পানিশূন্যতায় আক্রান্ত। এ অবস্থায় শিশুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে।

০২
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে মায়ের বুকের দুধ, বিশুদ্ধ পানি, খাবার স্যালাইন, ভাতের মাড়, ডাবের পানি, চিড়া কসলানো পানি, জুস ইত্যাদি তরল জাতীয় খাবার বেশি করে খাওয়াতে হবে। শিশুর ডায়রিয়া পরবর্তী দুই মাস বাড়তি পুষ্টিকর খাবার প্রতিদিন খাওয়াতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ শিশুকে খাওয়ানো যাবে না। ডায়রিয়া রোধে পরিবারের সবাইকে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে খাওয়ার আগে এবং পায়খানার পরে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। শিশুকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে হবে। শিশুর চুল ও নখ নিয়মিত কাটতে হবে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। মায়ের বুকের দুধ জীবাণুমুক্ত এবং রোগ প্রতিরোধকারী।

শিশুর রোগ প্রতিরোধে যাবতীয় পুষ্টিগুণ মায়ের বুকের দুধে বিদ্যমান। শিশুর বয়স ছয় মাসের পর থেকে দু’বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি অন্যান্য পরিপূরক খাবার খাওয়াতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা দু’বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খেয়েছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কৌটার দুধ বা গুড়া দুধ খাওয়া শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি।

ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার এবং পায়খানার পর সাবান দিয়ে হাত ধুলে শিশুর ডায়রিয়ার আশঙ্কা ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। ছোট ছোট শিশুরা যেকোনো জিনিস হাত দিয়ে ধরে, মুখে দেয়। তাই শিশুর হাত পরিস্কার রাখতে হবে। খাবার সব সময় ঢেকে রাখতে হবে। পরিষ্কার স্থানে খাবার রাখতে হবে যাতে মশা, মাছি খাবার দূষিত করতে না পারে। বাসায় সবসময় ওরস্যালাইন ও জিঙ্ক ট্যাবলেট রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে জিঙ্ক ট্যাবলেট খাওয়ালে শিশুর ডায়রিয়া পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যায়।

বিশ্বে প্রতি বছর সাত লাখ শিশু মারা যায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। এসব শিশুর ৭০ শতাংশ মারা যায় জন্মের প্রথম দু’বছরের মধ্যে। ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার লক্ষে সরকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। জনগণের দোর গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শিশুমৃত্যু রোধে বাংলাদেশ এমডিজি পুরস্কার অর্জন করেছে।

আমাদের দেশে অসতর্কতায় মাঝে মাঝে ডায়রিয়া মারাত্মক আকার ধারন করে। শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে আতংকিত না হয়ে সাথে সাথে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। হাতের নাগালেই রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র। জরুরি প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বাতায়ন হটলাইন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করেও ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া যায়।

কথায় আছে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’। তাই ডায়রিয়াসহ সব সংক্রামক রোগ সম্পর্কে পারিবারিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সবার সচেতনতাই শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে, নিশ্চিত করতে পারে ডায়রিয়া মুক্ত সুস্থ জীবন।
লেখক: প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক তথ্য অফিস রাজশাহী