শিশু-কিশোর অপরাধ বাড়ছে সমাজ-পরিবারের জন্য অশনিসংকেত

আপডেট: জুন ২০, ২০১৭, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

শিশু-কিশোর অপরাধ এখন আর বিশেষ কোনো শ্রেণিগোষ্ঠির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং উদ্বেগজনকভাবে তা দরিদ্র থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক যে, আমাদের শিশুদের উন্নত ভভিষ্যত মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষার ভীষণ ঘাটতির দিকটাই এ থেকে উন্মোচিত হচ্ছে।
নাটোরের বড়াইগ্রামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী অপহরণ নাটক সাজিয়ে বাবার কাছ থেকে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে। এই অভিযোগে শনিবার রাতে রাজশাহী মহানগরীর ভদ্রা এলাকা থেকে তিন স্কুল ছাত্রসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দৈনিক সোনার দেশে প্রকাশিত হয়েছে।
শিশুরা কেন এমন সর্বনাশা পথ বেছে নিচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই সমাজ-রাষ্ট্রকেই সন্ধান করতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ যে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে শিশু অপরাধের মাত্রা তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। তারা নিজ পরিবারকেও বুঝতে পারছে না। নিজ বাবা-মাকে কিংবা স্বজনকে জিম্মি করছে কিংবা খুন-খারাবির মতো হিং¯্রতাও প্রদর্শন করছে।
তোলপাড় করা পুলিশদম্পত্তি হত্যাকাণ্ডের কথা আমরা সবাই জানি। নিজ কিশোরী কন্যার হাতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হতে হয়েছিল তাদের। কন্যা ঐশী কফির সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে বাবা-মাকে তা খাইয়ে অচেতন করে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বাবা-মাকে হত্যার আগেই ঐশী স্কুলের খাতায় সুসাইডাল নোট লেখে। সেই নোটে উঠে আসে ঐশীর মনের একান্ত কিছু কথা। সে লিখেছে, তার বাবা-মা তাকে বোঝার চেষ্টা করেনি কখনো। তার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করেছে কিন্তু কখনো ভাল দিকগুলো দেখার চেষ্টা করেনি। ঐশীর এই সুসাইডাল নোট আমাদের পরিবারগুলোর ভঙ্গুর অবস্থার ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরে। যে শিশু পরিবারের মধ্যে বাবা-মার সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে কিন্তু পরিবারকে সে নিজের করে ভাবতে পারে না, কেন? এর উত্তর খুঁজে বের করা দরকার। পরিবারগুলোর মধ্যে অস্থিরতা, সন্তানদের প্রতি অবহেলা, অর্থ-বিত্তের পেছনে ছুটে চলাই যদি জীবনের ব্রত হয়Ñ সে ক্ষেত্রে মূল্যবোধের সঙ্কট অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শিশুর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ঘটনা, বৈষম্য-বিভেদ, বড়দের নৈতিক অবক্ষয় আমাদের ভবিষ্যত সমাজ জীবনের অস্থিরতারই প্রতিচ্ছবি। শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের মধ্যেই কেবল সুস্থ ও সুন্দর সমাজের প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতায় অধিকাংশ শিশুই অবহেলিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও অপমানজনক জীবন-যাপন করে থাকেÑ এমনকী স্বচ্ছল পরিবারেও। আজকের সামাজিক অস্থিরতার জন্য এই পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে দায়ি।
শিশুর মনস্তত্বকে বুঝতে অক্ষম হয়ে শিশুর ওপরই দোষ চাপানো যায় বটে তাতে সমাজে অস্থিরতা, পরিবারের ভঙ্গুরতাকে ছাপানো যায় না। আর তা যাচ্ছে না বলেই শিশুরা তার নিজ পরিবারকেই নিজের জ্ঞান করতে পারছে না। এসব ঘটনা আমাদের সমাজ-পরিবারের জন্য অশনিসংকেত বটে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকেই খুঁজে বের করতে হবে। নতুবা আমাদের ভবিষ্যত সংঘাত ও অস্থিরতাকেই বেশি করে উৎসাহিত করবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ