শীতের খেলা ব্যাডমিন্টন

আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০১৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

মাহবুবর রহমান সুমন



আমাদের দেশে ক্রিকেট, ফুটবলের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এদেশের তরুণদের কাছে ব্যাডমিন্টন একটি জনপ্রিয় ‘মৌসুমী’ খেলা। নভেম্বর-ডিসেম্বরে পাড়ায় ব্যাডমিন্টন কোর্টগুলোই জানান দেয়, খেলাটির প্রতি তরুণদের আগ্রহের পরিমাপ। শরীর-স্বাস্থ্য ফিট রাখার জন্যও খেলাটি বেশ উপকারী। জায়গার দিক থেকেও ঝামেলা কম। তাই খেলার নাম ‘ব্যাডমিন্টন’ হলেও চর্চাটা ‘ব্যাড মানে খারাপ’ নয়। আসুন জেনে নেয়া যাক এ খেলার আদি-অন্ত।
পরিচয় : ব্যাডমিন্টন এক প্রকার র‌্যাকেট খেলা। এটি একক বা যুগ্মভাবে খেলা হয়। ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য নেট দ্বারা বিভক্ত একটি আয়তাকার কোর্ট প্রয়োজন হয়। খেলোয়াড় র‌্যাকেটের সাহায্যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কোর্টে শাটলককটি ছুঁড়ে দিয়ে স্কোর সংগ্রহ করেন। শাটলকক একবার মাটি স্পর্শ করলেই একটি র‌্যালি শেষ হয়।
উৎপত্তি : প্রায় ২০০০ বছর আগে যীশুখ্রিষ্টের জন্মের সময়ে প্রাচীন গ্রীসে এক বিশেষ ধরনের খেলার প্রচলন ছিল, যাতে প্রাচীন গ্রীকরা শাটলকক ব্যবহার করতো। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, এই খেলাটি পরবর্তী সময়ে পূর্বদিকের দেশগুলোর অধিবাসীগণ পছন্দ করেন ও খেলা শুরু করেন। কালক্রমে এই ক্রীড়া রীতিটি পূর্বদিকের ব্রিটিশ, ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের মাঝে এই খেলাটি (ইধঃঃষবফড়ৎব ধহফ ংযঁঃঃষবপড়পশ) ব্যাটলডোর অ্যান্ড শাটলকক নামে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এই খেলাটি ব্রিটেনের গ্রামগুলোতে শিশুদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সপ্তদশ শতাব্দীতে বিভিন্ন ইউরোপিয়ান দেশসমূহে ব্যাটলডোর অ্যান্ড শাটলকক খেলাটি একটি উচ্চ শ্রেণির আধুনিক খেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
অন্যদিকে উইকিপিডিয়ার মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ সেনা অফিসাররা এই খেলা উদ্ভাবন করেন। তাঁরা ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী খেলা ব্যাটলডোর ও শাটলককে একটি নেট যুক্ত করে এই খেলা চালু করেছিলেন। ব্রিটিশ গ্যারিসন নগরী পুনরায় এই খেলা বিশেষ জনপ্রিয় ছিল বলে এই খেলার অপর নাম পুনাই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই খেলা ইংল্যান্ডে ব্যাপক প্রচার পায়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা : ব্যাডমিন্টনের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থা হলো ইধফসরহঃড়হ ডড়ৎষফ ঋবফবৎধঃরড়হ (ইডঋ)। যা ২০০৬ সালের আগে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ইধফসরহঃড়হ ঋবফবৎধঃরড়হ (ওইঋ) নামে পরিচিত ছিল। ১৯৩৪ সালে ব্রিটেনের এষড়ঁপবংঃবৎংযরৎব অঙ্গরাজ্যের ঈযবষঃবহযধস শহরে আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন গঠিত হয়। ১ অক্টোবর ২০০৫ সালে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় ব্রিটেন থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত সদস্য দেশগুলোর অংশগ্রহণে এক সাধারণ সভায় এই সংস্থার নাম পরিবর্তন করে (ইধফসরহঃড়হ ডড়ৎষফ ঋবফবৎধঃরড়হ, ইডঋ) ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন রাখা হয়। এখন পর্যন্ত এর সদস্য দেশের সংখ্যা ১৬৯, বাংলাদেশও এই আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য।
অন্যদিকে ১৯৯২ সালে পাঁচটি ইভেন্টসহ ব্যাডমিন্টন অলিম্পিকের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ইভেন্টগুলো হল- পুরুষ ও নারীদের সিঙ্গলস, পুরুষ ও নারীদের ডাবলস এবং মিক্সড ডাবলস।
খেলার উপকরণ : র‌্যাকেট/ব্যাড, শাটলকক, মাঠ/কোর্ট, জাল, পোশাক, উপযুক্ত স্থান।

খেলার নিয়ম ও পরিমাপ : ব্যাডমিন্টনের কোর্ট: ব্যাডমিন্টনের কোর্ট সমতল আয়তাকৃতির হয়ে থাকে। একক ও দ্বৈত উভয়ক্ষেত্রে যার দৈর্ঘ্য ১৩.৪ মিটার (৪৪ ফুট)। প্রস্থের মাপ বাড়ে দ্বৈতের ক্ষেত্রে। দ্বৈতের জন্য কোর্টের প্রস্থ ৬.১ মিটার (২০ ফুট), এককে ৫.১৮ মিটার (১৭ ফুট)। নেটের উচ্চতা ১.৫৫ মিটার (পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি)।
র‌্যাকেট/ব্যাট: একটি র‌্যাকেটের দৈর্ঘ্য সর্বাধিক ৬৮ সেন্টিমিটারের চেয়ে বেশি হবে না, প্রস্থ ২৩ সেন্টিমিটার চেয়ে বেশি হবে না। জাল বোনা মাথার দৈর্ঘ্য সর্বাধিক ২৮ সেন্টিমিটারের চেয়ে বেশি হবে না। জাল বোনা মাথার প্রস্থ সর্বাধিক ২২ সেন্টিমিটারের চেয়ে বেশি হবে না। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে আধুনিক র‌্যাকেটসমূহের মাপ সর্বোচ্চ মাপের তুলনায় কিছুটা ছোট হয়।
শাটল (কক): শাটলটির ওজন ৪.৭৪ গ্রামের কম অথবা ৫.৫০ গ্রামের বেশি হবে না। এর মধ্যে ১৪ থেকে ১৬টি পালক থাকবে।
খেলোয়াড়: একক ম্যাচে উভয়পক্ষে ১ জন করে সর্বমোট ২ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করে। দ্বৈত খেলায় উভয়পক্ষে ২ জন করে সর্বমোট ৪ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করে।
খেলার নিয়ম: একক ও দ্বৈত উভয় খেলায় সাধারণত ১৫ থেকে ২১ পয়েন্টে গেম হয়। উভয় খেলোয়াড় বা দল ২০-২০ পয়েন্ট অর্জন করলে সেক্ষেত্রে ২ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয়লাভ করতে হবে, অর্থাৎ ২২-২০, ২৫-২৩ ইত্যাদি। উভয় দলের পয়েন্ট সমান হওয়াকে ডিউস বলে।
মনে রাখতে হবে, এভাবে সর্বোচ্চ ৩০ পয়েন্টের মধ্যে অবশ্যই গেম শেষ করতে হবে। তিনটি গেমের মধ্যে যে বা যে দল দুই খেলায় জিতবে, তারাই বিজয়ী হবে। একক খেলার সময় সার্ভিসকারীর পয়েন্ট শূন্য বা জোড় সংখ্যা হলে খেলোয়াড় তাদের ডান দিকের কোর্ট থেকে সার্ভিস করবে এবং বেজোড় সংখ্যা হলে বাম দিকের কোর্ট থেকে সার্ভিস করবে। প্রতি পয়েন্টের পর খেলোয়াড়রা তাদের সার্ভিস বা রিসিভ কোর্ট বদল করবে। দ্বৈত খেলার সময় প্রথম সার্ভিসের জন্য ডানদিকের খেলোয়াড় কোণাকুণি বিপক্ষের কোর্টে সার্ভিস করবে। যাকে সার্ভিস করা হবে কেবল সেই খেলোয়াড় সার্ভিস গ্রহণ করবে। কোনো খেলোয়াড় পরপর দুইবার সার্ভিস করতে পারবে না। প্রথম গেমে বিজয়ী খেলোয়াড় দ্বিতীয় গেমে সার্ভিস শুরু করবে। সার্ভিসের সময় সার্ভারের দুই পা মাটি স্পর্শ করে থাকবে। সার্ভিস করার সময় শাটল নেটে লেগেও যদি ঠিক কোর্টে পড়ে তবে সার্ভিস ঠিক হয়েছে বলে ধরা হবে। শাটল দাগ স্পর্শ করলেই শুদ্ধ হয়েছে বলে ধরা হবে। নেট অতিক্রম করে কেউ শাটলে আঘাত করতে পারবে না এবং খেলা চলাকালে কেউ র‌্যাকেট বা শরীরের কোনো অংশ দিয়ে নেট ও পোস্ট স্পর্শ করতে পারবে না।
উপকারিতা : ব্যাডমিন্টন একটি উচ্চ শারীরিক কসরতের খেলা। এই খেলার জন্য উচ্চমানের শারীরিক ফিটনেস প্রয়োজন। দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করার কারণে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম হয়, শরীরের মেদ কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেললে শারীরিক ফিটনেস বৃদ্ধি পায়। অলসতার কারণে যাদের শরীরে মেদ জমেছে কিংবা রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিসের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে তারা নিয়মিত খেললে মেদ ও রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। অন্যদিকে শীত তাড়াতে এই খেলার জুড়ি নেই।
সতর্কতা : কোর্ট অবশ্যই সমতল হতে হবে, উঁচু-নিচু হলে পা ভাঙার সম্ভাবনা রয়েছে। যাদের রাতকানা রোগ অথবা চোখের সমস্যা আছে তারা দিবালোকে অথবা পর্যাপ্ত আলোতে খেলুন নতুবা উচ্চ গতিতে ছুটে আসা শাটলকক চোখে লেগে সমস্যা হতে পারে। পায়ে অবশ্যই কেডস ব্যবহার করুন। ঢিলা জোড়া ও ত্রুটিপূর্ণ র‌্যাকেট পরিহার করুন। এটি অন্য খেলোয়াড়দের আহত করতে পারে। রাতে খেলার জন্য আলোর বন্দোবস্ত করতে অবশ্যই ইলেক্ট্রিশিয়ানের সাহায্য নেয়া উচিত। জোশের বশে নিজেরাই বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করতে গেলে অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া খেলাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়াটাও সমীচীন নয়।-ফিচারটি জাগোনিউজ থেকে নেয়া।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ