শীত মৌসুমেও সিরাজুলের বাগানে ঝুলছে আম

আপডেট: জানুয়ারি ১৯, ২০২১, ৭:৩৬ অপরাহ্ণ

আল-মামুন বিশ্বাস, গোমস্তাপুর


চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলা পার্বতীপুর ইউনিয়নের মহেশপুরে বারমাসি আম বারি-১১ পরীক্ষামূলকভাবে চাষাবাদ করে সাফল্যের মুখ দেখছেন আম উদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলাম। তিনি ১২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে এ আম উৎপাদন শুরু করেছে। শীত মৌসুমে তার বাগানে ঝুলছে গাছে গাছে আম, সাথে মুকুলের সমারহ। এছাড়া আশ্বিনা আমেরও উৎপাদন শুরু করেছেন তিনি। ২০১৯ সালের জুন মাসে থেকে ওই বাগানে বারমাসী ম্যাংগো ফার্মে আমরুপালি আম গাছের চারা নিয়ে শুরু করে পরিচর্যা। প্রথমে নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ১৫’শ গাছের সাইনিং শুরু করেন। তার বাড়ি হচ্ছে, উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামে।
আম উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম বলেন, ১৫ বছর আগে চিন্তা করেছিলেন, মানুষ বার মাস ধরে আম খেতে পায়না কেন? যখন মানুষ বছর জুড়ে আগ্রহ করে আম খেতে চাই, তখন ইচ্ছেমত মানুষ পাইনা, ১২ মাস ধরে আর থাকে না কিন্তু আম পছন্দ সবাই করে। সারা বিশ্বে আমের একটা চাহিদা আছে, পরিচিতিও আছে। যথাসময়ে আম শেষ হয়ে গেলেও,আম খাওয়ার আনন্দটা হারায় না। এ সব সখের কথা ভেবে পনের বছর আগে একটি জাত সংগ্রহ করা হয়, পরে বোয়ালিয়া এলাকায় এক বিঘা জমিতে ওই গাছের চারা লাগিয়ে বাগান তৈরি করি। আম পাকার পরে তা আর খাওয়া যেত না। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে ২০১৮সালে তার ভাই কমান্ডার রেজাউল করিমের পরামর্শে আরেকটি বাগান তৈরি করি। বাগানে একটি প্রজেক্ট উপস্থাপন করি। সেই প্রজেক্টে পরীক্ষামূলকভাবে আম উৎপাদনে সফলতা অর্জন করি এবং ভালো একটা মুনাফা পায়। এর সূত্র ধরে উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে ১২ বিঘা জমিতে বাড়ি-১১ জাতের আম চাষাবাদ শুরু করি। ২০১৯ সালের জুন মাসে আম বাগানের প্রজেক্ট হিসেবে আমরুপালি আমগাছ থেকে সাইনিং করে বাড়ি-১১ আমের উৎপাদন শুরু করি। ওই বাগান তৈরি করতে জমির মালিকের কাছে বছরে বিঘা প্রতি ২৫ হাজার করে, ১২বছরে ৩০ লক্ষ টাকায় জমি লিজ নেয় এবং প্রজেক্ট হিসেবে কাজ শুরু করে এখন সফলতার মুখ দেখছেন।
পরিচর্যার বিষয়ে সেরাজুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন রকম বই পড়া থেকে শুরু করে , নিজে মেধা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে গাছের পরিচর্যা করে ভালো মানের গাছ তৈরি করেছেন। অন্য কৃষকের থেকে তার পরিচর্যা একটু অন্যরকম। অন্যরকম বলতে তিনি বলেন, রাসায়নিক ও জৈব সারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেহেতু খরচ অনেক বেশি, তাই তিনি গাছের ফলন আসার পূর্ব মুহূর্তে সঠিক পরিচর্যায় কম খরচে উপযুক্ত সময়ে গাছে রাসায়নিক ও জৈব সারের পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্ট ও কিছু পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন । তিনি হপার ও উইপোকার আক্রমণ থেকে রক্ষায় যথাসময় কীটনাশক বিষ ব্যবহার করতে দমন করতে সক্ষম হয়। এক কথায় তিনি বলেন, গাছের খাদ্য সঠিক সময়ে দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায় সেটায় করে থাকি সবসময়।
তার বাগানে ১ বছর ৬ মাসে তার আনুমানিক ২০ থেকে ২২ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যেহেতু প্রথম বছরে তার ইচ্ছে ছিল লাভবান হওয়ার ,তাই তিনি নানা প্রতিকূলতা পের করে ৮ লক্ষ টাকা আয় করতে সক্ষম হয়েছেন।
আম উৎপাদনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাড়ি-১১ একটি আম গাছে ৬০ থেকে ৬৫টি আম ধরে,আনুমানিক ২০ কেজি পর্যন্ত হয়। অর্থাৎ একটি আমের পরিমাণ ৩৫০-৭৫০ গ্রাম হয়ে থাকে। আম খেতে মাঝারি মিষ্টি,যার মিষ্টতা অর্থাৎ টি,এস,এস প্রায় ১৮/১৯, হালকা আঁশযুক্ত খুব সুস্বাদু।
উপজেলার সফল উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলামের সম্ভাবনায় আম উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এলাকায়, তিনি সরকারি প্রণোদনা পেলে বেশি বেশি আম উৎপাদন করে বাংলাদেশ তথা বিশ্বে রফতানি করে দেশ ও বিদেশের মানুষকে অসময়ে আমের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবেন। লক্ষ্য করা গেছে, তার বাগানে পরিক্ষামূলক ভাবে ১২০টি কাটিমন আমের গাছ ও ৪০টি আশিনা আমের চাষ পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন । ওই বাগানে গড়ে প্রতিদিন ১০-১৫জন শ্িরমক কাজ করে থাকে।
এ বিষয়ে বাগানের শ্রমিক সমুর জানান, সেরাজুল ইসলাম বাগান তৈরি করার ফলে নিজের ও আশেপাশের খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার একটি সন্ধান হয়েছে। দৈনিক মজুরি হিসেবে ২৫০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকি। বাগানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের একটি জায়গা হয়ে গিয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইব্রাহিম আলী জানান, সেরাজুল ইসলামের বাগান তৈরি করার পর অনেকবার পরিদর্শন করেছি। বাগান পরিচর্যা বিষয়ে তাকে নানা পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। সিরাজুল ইসলামের বাগান দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি আরোও জানান, এ উপজেলা এ বড় বারোমাসি আম বাগান সিরাজুল ইসলামের ছাড়া আর কোথাও চোখে পড়ে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে সেরাজুল ইসলামের বাগান পরিদর্শন যায়। তাকে বাগান পরিচর্যার বিষয়ে অনেক রকম পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ উপজেলার মধ্যে অসময়ে এতো বড় বারমাসি বাগানের আম চাষী ও নতুন উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলামের লক্ষ্যমাত্রা দেখে তিনি মুগ্ধ। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তাকে প্রয়োজনীয় যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা সম্ভব তা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এছাড়া তার বাগানের প্রজেক্ট বৃদ্ধি বা অন্যান্য বিষয়ে সর্ব্যক্ত সহযোগিতা করে যাবে উপজেলা কৃষি বিভাগ।