শুরুটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ- কিন্তু কীভাবে?

আপডেট: জুলাই ৫, ২০২১, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল মজিদ:


স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বার্ষিকী উদযাপন এবং সাথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের স্বর্ণালী সময়ে শিরোনামে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে অর্থাৎ বাংলাদেশ কীভাবে তথাকথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে উন্নয়নশীল এবং সেখান থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হলো? উত্তরে বলা যায়, ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জাতীয় দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে বহুগুণ। বলতে গেলে তা বেড়েছে অনেক অনেক। ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু আয় গিয়ে পৌঁছেছে ২২২৭ ডলারে যা শুরুর দিকে ছিল মাত্র ৯০ ডলারেরও কম। বিশেষজ্ঞদের ধারণা চলমান উন্নয়নের ধারা অক্ষুন্ন রাখতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৮ তম বড় অর্থনীতির দেশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এ দেশ ২৩ তম স্থানে নিজের অবস্থান সংহত করতে পারবে। জিডিপি ২০৩০ সালে ১৩২৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৫০ সালের দিকে যা গিয়ে দাঁড়াবে ৩০৬৪ বিলিয়ন ডলারে।
এখন প্রশ্ন হলো এ ধরনের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন বা প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি কী? বলা যায় প্রণিধানযোগ্য বিষয়গুলো হলো :
ক. কৃষিক্ষেত্রের প্রবৃদ্ধি;
খ. শিল্পক্ষেত্রের প্রবৃদ্ধি;
গ. সেবাখাতের বিস্তার;
ঘ. তৈরি পোষাকের রফতানি আয়;
ঙ. সর্বোপরি বিদেশে কর্মরত মানুষের পাঠানো কষ্টার্জিত আয়।
এর সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কিছুটা নিম্নগামী হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কমবেশি ভূমিকা রাখছে বললে ভুল বলা হবে না। লেখা বাহুল্য আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে বা অব্যবহিত পরেও জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ছিল শতকরা ৫০ ভাগের মতো। অন্যদিকে শিল্প ও সেবাখাতের অবদান যথাক্রমে ১৩ এবং ৩৭ ভাগ। অপরপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থাৎ ২০২০ সালে এসে যা দেখি তা হলো কৃষিতে ১৩.৩ ভাগ, শিল্পে ৫১.৩ ভাগ এবং সেবাখাতে ৩৫.৪ ভাগ যা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো আমাদের দেশের কৃষিখাতে বেশ উন্নতি সাধিত হয়েছে, কৃষিজমি কমে যাওয়া সত্ত্বেও খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চারগুণ। চালের উৎপাদন ১৯৭১-৭২ এ ছিল ৯.৭৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন যা ২০১৮-১৯-এ এসে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৪০ মিলিয়ন টনে। গমের উৎপাদন বেড়েছে ০.১১ মিলিয়ন টন থেকে ০১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে। চোখে পড়ার মতো এ বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে যে জন্য তা হলো সেচ সুবিধাসহ সার ও উন্নতমানের বীজ এবং উন্নত কারিগরি জ্ঞানে কৃষকদেরকে আগ্রহী করে গড়ে তোলা হয়েছে বলে। কৃষিপণ্যের সাথে সাথে গত কয়েক দশকে সারা দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ যা প্রায় ৫০ লক্ষ টনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে মাছ রফতানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করা সম্ভব হয়নি।
শিল্পখাত নিয়ে কিছু বলতে গেলে যা বলতেই হয় তা হলো আমাদের দেশ স্বাধীনতা লাভের সময়ে এ ক্ষেত্রে বেশ দুর্বল ভিতই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। সত্তুর দশকের শেষ এবং আশির দশকের প্রথমের দিকে শিল্পক্ষেত্রের বিস্তার এবং প্রসার বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে মুক্তবাজার অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারের নানা রকম সহায়ক কৌশল ও নীতি প্রণয়নের ফলে নব্বইয়ের দশক থেকেই শিল্পক্ষেত্রে বড় ধরনের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি হয়েই চলেছে। তবে এক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় বাধা-বিপত্তির সম্মুখিন হতে হলেও তৈরি পোষাক শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়। এইটি এমন একটি খাত যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যান্য শিল্পকারখানা যেমন ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প, জাহাজ ভাঙ্গা এবং নতুন জাহাজ তৈরি শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিক, সার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি তৈরির শিল্পকারখানাও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। বড় বড় শিল্পকারখানার সাথে সাথে কুটির শিল্প, ছোট ও মাঝারি মানের শিল্প এবং শিল্পোদ্যোক্তারাও অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা গরিবি হটাও ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার বাহাদুরও বর্তমানে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও নীতি, কর্মপন্থা সংস্কার সাধনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির ধারা নিরবচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেবাখাতের উন্নয়নের সাথে সাথে বাণিজ্য নীতি, শিল্প নীতি, মুদ্রা নীতি ইত্যাদিসহ বৈদেশিক বিনিয়োগকেও (এফডিআই) আকৃষ্ট করার ব্যাপারে সরকার সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
১৯৭২-৭৩ সালের দিকে যেখানে রফতানি বাণিজ্য ছিল ৩৮০ মিলিয়ন ডলারের মতো যা আজকে এসে দাঁড়িয়েছে (২০১৮-১৯) ৪০.৫ বিলিয়ন ডলারে। যদিও বর্তমানে চলমান প্যান্ডেমিকের প্রভাবে রফতানি বাণিজ্যের আয়ে বেশ খানিকটা নি¤œগামিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। লেখা বাহুল্য, আমদের দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোষাক রফতানি খাত থেকে আয় নিঃসন্দেহে বিশাল ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের মোট রফতানির ৮২ ভাগই এ খাতের পণ্য। এ খাতের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। ২০০৫ সালে যা ছিল ৬.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেÑ যদিও বর্তমান সময়ে কভিড-১৯ বিপর্যয়ে কিছুটা অধোগামিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে বলা যায় তৈরি পোষাক খাত অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য তিনটি বিষয়ে গুণগত পরিবর্তন এনেছে যা নিম্নরূপ –
ক. বর্ধিত রফতানি আয়ে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে;
খ. নিজেদের তৈরি পণ্যের ওপর আস্থালাভের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল হওয়া সম্ভব হয়েছে;
গ. দেশের খেটে খাওয়া মানুষের বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়নে তথা কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান উন্নতি সাধন হয়েছে।
তারপরও যেহেতু আমাদের দেশে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের সংখ্যা অধিক তাই প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ কাজের খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন বিধায় বাৎসরিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে বহুগুণ। ১৯৮০ সালের দিকে যা ছিল মাত্র ৩৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তা ২০২০-২১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২২.৭ বিলিয়ন ডলারে। রফতানি আয় এবং আমদানি ব্যয়ের মধ্যে এক ধরনের ধনাত্মক ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। রেমিট্যান্স বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে অনেক। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের হার বেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসে দাঁড়িয়েছিল শতকর ২২ ভাগে যা স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ছিল শতকরা ৮০ ভাগের কাছাকাছি। বর্তমানে এই বিপর্যয়ের ফলে আবার তা বেড়ে শতকরা ৩০ ভাগের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে এবং সাথে সাথে আয় বৈষম্যও আস্তে আস্তে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। বড় ধরনের ছন্দপতন বৈ কি!
প্রধানতম সামাজিক সূচকগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের দেশে মানুষের জন্মহারও বেশ কমেছে। শতকরা তিনভাগ থেকে কমে এক দশমিক একভাগে এসে পৌঁছেছে। জন্ম ও মৃত্যু হার যেমন কমেছে তেমনি মানুষের গড় আয়ুও বেশ বেড়েছে। ১৯৭১ সালের দিকে যা ছিল ৪৬ বছর তা বর্তমানে ৭৩ বছর। স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিপ্রাপ্তির ব্যাপারেও মানুষ আগের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে- যদিও এক্ষেত্রে সমতা বিধান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য দরিদ্র শ্রেণির জনসাধারণের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেবা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে সরকার দৃশ্যমান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পানের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থাকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা সরবরাহ এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ইত্যাদি আগের চেয়ে ঢের বৃদ্ধি ঘটেছে এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়। শিক্ষায়তনসমূহে লিঙ্গবৈষম্যও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মানবিক উন্নয়ন সূচকেও (এইচডিআই) বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯০ সালে ইনডেক্সের মান ছিল ০.৩৯৪ যা বেড়ে ২০১৯ সালে ০.৬৩২ এ পৌঁছেছে। আশা জাগানিয়াতো বটেই।
তবে একথা ঠিক উন্নয়নের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। নানা রকম বাধা-বিপত্তির সম্মুখিন হতেই হয়।
যেমন অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা, আয় বৈষম্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার অভাব, প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা,স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব ইত্যাদি নানাভাবে উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে যা স্বাভাবিকভাবেই অনভিপ্রেত। এর সাথে আবার যুক্ত হয়েছে মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো প্যানডেমিক বিপর্যয় যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে নির্মমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ কমেও গেছে। কর্মহীনতা তথা কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। ফলশ্রুতিতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যাহোক, এ অবস্থায়ও আমাদের হতোদ্যম হওয়া চলবে না বরং বলা যায় যত বাধাবিঘœই আসুক আমাদেরকে তা মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।
পরিশেষে যা বলতে চাই তা হলো মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজেদের দেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে পৃথিবীর বুকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে নিজেদের দেশকে দেখতে চাইলে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে যুগোপযোগী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নপূর্বক সবার সর্বাত্মক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সাহসের সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করার বিকল্প নাই।
লেখক : প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।