শোকাবহ ১৫ই আগস্ট

আপডেট: আগস্ট ২৪, ২০১৭, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


১৯২০ সালের ১৭ মার্চে টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি জাতির পিতা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার। বিশ^সভায় যিনি নন্দিত এবং ক্রমান্বয়ে যাঁর অমর কীর্তির স্বীকৃতি বেড়েই চলেছে, নতুন নতুন আঙ্গিকে দেশ থেকে দেশান্তরে।
অন্তর যাঁর নিমগ্ন থাকতো মানব কল্যাণ আর দেশ মাতৃকার শৃংখল মুক্তির মাধ্যমে পরাধীনতার, দাসত্বের, শোষণ ও নিপীড়নের চির অবসান।
তাঁর অন্তরে ছিল মানুষের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা। অন্যায়, অত্যাচারকে কখনো তিনি প্রশ্রয় দেননি। এদেশের মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। শীতার্ত মানুষকে নিজের গায়ের চাদর খুলে দেয়া কিংবা দুর্ভিক্ষের সময় নিজের বাড়ির গোলার ধান মানুষকে বিলিয়ে দেবার কথা কারো অজানা নয়। শিশুদের প্রতি ছিল তাঁর অপত্য ¯েœহ ও গভীর ভালোবাসা। ধনী-গরীব, আবাল-বৃদ্ধ বনিতা সকলের অন্তরের গভীরে ছিল এবং তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
স্কুল জীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। তিনি ছিলেন, একজন ভালো ফুটবল খেলোয়াড়। তাঁর সংস্কৃতিবোধ এবং সংস্কৃতির প্রতি ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ কিংবা অন্যান্য কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, ছড়াকার তাঁকে আকৃষ্ট করলেও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যে একটু বেশিই ছিল সেটা বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের রচিত গানকে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচিত করায়।
অকুতোভয় এ মহামানব জীবনের সুদীর্ঘ সময় কারাভ্যন্তরে কাটিয়েছেন। নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব সময়ই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। আজ যে যতই প্রশ্ন তুলুক না কেন এদেশের বিভিন্ন লড়াই সংগ্রামের মত স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অনন্য-সাধারণ অবদানের কথা সর্বজনবিদিত। একথা সত্যি কেউই একা এত বড় গুরুদায়িত্ব করতে পারেন না কিন্তু স্বাধীনতার সংগ্রামের সংগঠক, জনমত তৈরির কারিগর, ৬ দফা আন্দোলনকে ১ দফায় (স্বাধীনতা) উজ্জীবিত করা, এদেশের আপামর জনগণকে এদেশের মুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য ভূমিকা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এ প্রসঙ্গে কবি নজরুলের “কান্ডারী হুঁশিয়ার” কবিতার দুটি চরণ উল্লেখ্য-
‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?’
বাঙালি জাতির সেই ক্রান্তিলগ্নে যিনি হাল ধরেছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধু। জাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে সুস্পষ্টভাবে। তাঁর সে ঐতিহাসিক বক্তৃতা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়কে আজও আলোড়তি করে, আন্দোলিত করে। বিশ^ নেতাদের বিখ্যাত বক্তৃতার তালিকায় বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা ৪র্থ স্থান পেলেও, সার্বিক বিচারে এর অবস্থান হওয়া উচিৎ এক নম্বরে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পুরো বিশে^ যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যেভাবে নতুন নতুন আঙ্গিকে বিচার বিশ্লেষণের আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাতে করে একদিন বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতাই নয় তিনিও যে প্রথম স্থানটি অধিকার করে নিতে পারেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ¯্রষ্টা হিসেবে এটা কোন অবিশ^াস্য বা অলীক বিষয় নয়।
মানুষের ভেতরে অধিকার সচেতনতা, স্বাধীনতার জন্য প্রবল আকাক্সক্ষা তৈরি করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানিদের শাসন, শোষণ, নিপীড়ন ও বঞ্চনায় দিশেহারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তিনি। তাঁর বজ্রনিনাদ কণ্ঠে ঘোষিত সে অমর কবিতাখানি আজও শিহরণ জাগায়, রক্তে আগুন জ¦ালায়। “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে… রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ… এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
বাঙালি জাতি যখন অসহায়, দিশেহারা তখন তিনি দিয়েছেন এদেশের মানুষকে পথের দিশা।
কবি নজরুলের লেখা-
“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ
কান্ডারী! আজি দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।”
শক্ত হাতে হাল ধরে তিনি বাঙালি জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়ে শুধুমাত্র বাঙালি জাতিই নয় পুরো বিশে^র অসহায়, নির্যাতিত ও পরাধীন জাতিকে জাগিয়ে তোলার মহামন্ত্র দিয়ে গেছেন।
দেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত শ্মশানপুরীকে নতুনভাবে বিনির্মাণেই কেটে গেছে সুদীর্ঘ সময়। যে অসাম্প্রদায়িক, স্বাধীন, সার্বভৌম, ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ তিনি দেখতে চেয়েছিলেন তার বিনির্মাণে দেশ বিদেশে ঘুরে ঘুরে তিনি সকলের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলেন এবং একইসাথে তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা চেয়েছিলেন। যে চিন আজ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ওই সময় তাদের ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। ভারত, রাশিয়াসহ অনেক দেশই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু চিন্তা- চেতনায় ছিলেন উদার ও মহৎ। নারী স্বাধীনতা, নারী- পুরুষের সমতা, নারী মুক্তি এগুলোও ছিল তাঁর ভাবনায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের “বীরঙ্গনা” খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, মেয়েদের সামাজিক সম্মান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং- ১৭-৩ নারী পুরুষের সমতার কথা উল্লেখ আছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। কৃষকের বন্ধু ছিলেন তিনি। কৃষকের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য তিনি সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ-ব্যবস্থা, এমনকি কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছেন সহজ শর্তে। তিনি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের ভেতরে যে সম্পদের বৈষম্য রয়েছে সেটা দূরীকরণের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
আপাদমস্তক তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন, তুখোড় রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি নির্দ্বিধায় মানুষকে বিশ^াস করতেন। তিনি বিশ^াস করতেন, “মানুষের প্রতি বিশ^াস হারানো পাপ।” সবাইকে তিনি বিশ^াস করতেন, ভালো বাসতেন। এ বিশ^াসই কাল হয়েছিল তাঁর জীবনে। যার মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাংলার আকাশ থেকে অস্তমিত হলো ‘মুজিব’ নামের স্বর্ণালী সূর্য- যিনি দিয়েছেন এদেশকে অনেক-আরো দিতে পারতেন যিনি। আমরা  তিনি সহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে নিহত সকল আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাঁদের অমর আত্মার শান্তি কামনা করি।