শ্রমিকের স্বার্থ নিশ্চিত করুন

আপডেট: মে ৪, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, শাসন-শোষণ, নিপীড়ন আর নির্যাতনের ইতিহাস অতি পুরনো। বঞ্চনার এ করুণ কাহিনী স্থান, কাল, পাত্রভেদে হয়তো খানিকটা ভিন্ন হলেও খুব কম স্থানেই মানুষ বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি তাদের ন্যায্য অধিকার পেয়েছে। উন্নত বিশ্বেও শ্রমিকরা আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষের মত অধিকার বঞ্চিত ছিল। যে কারণে ১৮৮৬ সালের ১ মে বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলে। দাবি ছিল কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করা। দুর্বার এ আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য সাধারণ শ্রমিকদের উপর পুলিশ লেলিয়ে দেয়া হয় এবং এক রক্তক্ষয়ী হৃদয় বিদারক দৃশের অবতারণা হয়। অকালে হারিয়ে যায় ৭ জন পুলিশসহ ১১ জন শ্রমিক। অবশেষে তাদের দাবি মেনে নেয়া হয়। সেই থেকে ১ মে সারা বিশ্বে মহান মে দিবস হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সাল থেকে এ দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। মেহনতী জনতার প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এ দেশের কল-কারখানাসহ সর্বস্তরের খেটে খাওয়া মানুষের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে, তাদের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নের জন্য আজীবন আন্তরিকভাবে কাজ করে গেছেন। দুঃখের বিষয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর জীবনাবসানের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তবে বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক ও আন্তরিক। যে কোন প্রতিষ্ঠানের ‘হার্ট’ হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানের শ্রমশক্তি। একটা প্রতিষ্ঠানের সব সম্পদের অন্যতম সম্পদ হচ্ছে তা শ্রমিক। সুতরাং, এ শ্রমিকদের যত ভালো রাখা যাবে প্রতিষ্ঠানের জন্য তত সফল হবে।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে যে সব শ্রমিক কাজ করে তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধাও ভিন্নতর। সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোন বেতন-ভাতা এবং সুবিধা না থাকায়ও শ্রমিকরা বঞ্চিত ও বিভ্রান্ত হয়। এখানে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় শ্রমশক্তির যোগান পর্যাপ্ত। কিন্তু প্রশ্ন আসে তাদের দক্ষতা নিয়ে। এদেশের গার্মেন্টস শিল্পসহ নানা কলকারখানায় যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তারা অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত। এছাড়াও থাকে না তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেবার সুযোগ। ফলে এদের নিকট থেকে মানসম্মত কাজ আশা করা যায় না এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা উন্নত বিশ্বের শ্রমিকদের চেয়ে কম দক্ষ। তবে একমাত্র সত্যি যে দক্ষতা রাতারাতি বাাড়নো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার সঠিক ও সফল বাস্তবায়ন। গঠনমূলক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে এসব শ্রমিকের কাজও প্রত্যাশিত মানের হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা এবং কাজের আর্থিক বা মৌখিক বা উভয় প্রকার স্বীকৃতি। মানুষ যখন তার কাজের স্বীকৃতি পায় তখন আপনাআপনিই কাজের প্রতি আগ্রহী হয়। কাজের প্রতি/প্রতিষ্ঠানে তার দায়িত্বের প্রতি তাদের অঙ্গীকার তৈরি করা প্রয়োজন। জোর করে করা কাজ আর দায়িত্ব ও অঙ্গীকার থেকে করা কাজের মানে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকে। অঙ্গীকার জোর করে আদায় করা যায় না। একজন শ্রমিক যখন তার সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সমস্ত রসদ প্রতিষ্ঠান থেকে পাবে তখন সে নিজেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধ বা অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে। দায়িত্ববোধ থেকে কাজের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মাবে যা তার দক্ষতা বৃদ্ধির অন্যতম সহায়ক হবে। সময় সকলকে তাড়িত করার প্রয়োজন হয় না। এমন অনেকেই থাকে যারা নিজেরাই তাদের কাজের প্রতি আন্তরিক থাকে, দায়বদ্ধ ও অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকে। তারাও কোন না কোনভাবে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি পেলে সম্মানিত বোধ করে। সুতরাং, সকলকে মূল্যায়ন করা ও তাদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া ভালো কাজ পাবার অন্যতম কৌশল।
শুধুমাত্র স্বীকৃতিই নয় শ্রমিকদের যদি কোন না কোনভাবে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কিংবা লাভের অংশীদার করা যায়, যতটুকু সম্ভব- তাহলেও তারা তাদের কাজের প্রতি বেশি আন্তরিক হবে, দায়িত্বশীল হবে। কারণ এক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ সরাসরি যুক্ত থাকবে বলে কাজে তারা বেশী মনোযোগী ও যতœশীল হবে।
শুধু তাই নয়, যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণে তাদের সম্পৃক্ত করা যায় তাহলেও তারা দায়িত্বশীল হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা উচিৎ কোন সিদ্ধান্তই যেন শ্রমিকদের স্বার্থাবিরোধী না হয়। কারণ শ্রমিক মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠানের গতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
শ্রমিকদের কাজের পরিবেশটি যেন কর্মবান্ধব হয়- সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র থেকে যদি বাসস্থান অনেক দূরে হয় তাহলে যাতায়াতে তাদের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবে যা তাদের বিরক্তির কারণ হতে পারে। এ সমস্যা নিঃসন্দেহে তাদের উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। নিয়মানুযায়ী এ দূরত্ব অতিক্রম করতে কাউকে যেন ২০ মিনিটের বেশি সময় দিতে না হয়।
তাদের কাজের সময় যেন কোনভাবেই ৮ ঘণ্টার বেশি না হয়। নারী- শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে নতুবা তারা তাদের কর্মক্ষমতার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রাখাও প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, কর্মক্ষেত্রে যেন ‘চাইল কেয়ার সেন্টার’ থাকে সেটাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সকলের কাজে বিঘœ ঘটবে যেটা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। কর্মরত শ্রমিকদের চিকিৎসার সুব্যবস্থা না রাখলে অসুস্থ কোন ব্যক্তির নিকট থেকে ভালো কাজ আশা করা যাবে না। তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে এবং নির্ভরশীল সকলের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটিসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা উচিৎ। কারণ বিনোদন মানুষের মানসিক, অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করে কর্মোদ্যোম বাড়ায়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উৎসব ভাতা ও বিনোদন ভাতার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
শ্রমিকদের বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা যদি কর্ম এলাকার আওতাভুক্ত থাকে তাহলে যাতায়াতের ধকল, সময় ও অর্থ বাঁচে এবং প্রকারান্তরে প্রতিষ্ঠানই লাভবান হয়।
বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা যাতায়াতের পথে নানা হয়রানির হাত থেকে রেহাই পাবে। শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের যদি সন্তুষ্ট রাখা যায় তাহলে তাদের দিয়ে সর্বোচ্চভাবে কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব। তারা কোন কারণে অসুখি থাকলে তাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব হলেও সেখানে আন্তরিকতার অভাবে কাজের মান ক্ষুণœ হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মালিকদের বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার মানুষের চাহিদার ধরন পাল্টে যাওয়ায় কাজের প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। শিল্প ছিল পূর্বে শ্রমনির্ভর কিন্তু এখন হয়েছে মূলতঃ প্রযুক্তিনির্ভর। সুতরাং, শ্রমিক শ্রেণিকেও প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করাতে না পারলে তাদের নিকট থেকে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। ক্ষেত্র বিশেষে বাইরে থেকে দক্ষ শ্রমিক আনা যেতে পারে। নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে অথবা অনেক শ্রমিককে একত্রে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব না হলে অন্য প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবে যা কিছুই ঘটুক না কেন শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে তাদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলে প্রত্যাশিত কাজ করিয়ে নিতে পারলেই উভয়পক্ষ লাভবান হবে। শ্রমিকদের গুরুত্ব দিলে এবং সুসম্পর্ক রাখলে তারা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে। সুতরাং, শ্রমিকদের গুরুত্ব দিন ও তাদের স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী ও আন্তরিক হোন।