শ্রমিক নেতৃত্ব এবং গার্মেন্ট শ্রমিকের মজুরি

আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


বাংলাদেশে বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকরা নায্যতার দাবিতে আন্দোলন করে কতটুকু নায্য অধিকার পেয়েছে, তা বিগত ৪৫ বছরের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়। প্রতি বছরেই শ্রমিক আন্দোলনের দ্রোহে ফুসে উঠে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। আর এই শ্রমজীবী মানুষগুলির আন্দোলনের ফসলটা এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগীরা ভোগ করেছেন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে মধ্যস্বত্ব ভোগীরা ব্যবসা করে আর শিল্প  বা পরিবহনের শ্রমিকদের শ্রমকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করে তথাকথিত শ্রমিক নেতারা। শ্রমিক রাজনীতি পরিণত হয়ে গেছে এক ধরনের ব্যবসায় আর এর উপরকরণ হচ্ছে শ্রমজীবীর মানুষের শ্রম। সরকারের অধীন নিয়োজিত কর্মীদের বেতন ভাতার স্কেলের সাথে শ্রমিকদের বেতন ভাতার মিল কোন কালেই ছিল না। গত ৪৫ বছরেও কোন সেক্টরের শ্রমিকের মজুরি প্রচলিত বাজারের বিভিন্ন পণ্য এবং সেবার দামের সাথে সংগতি রেখে নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে চলমান বাজার ব্যবস্থায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন ধারণ ক্রমেই কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। প্রচলিত বাজারের সাথে সংগতি রেখে মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি এর জন্য দায়ী করা? সরকার, শিল্প মালিক না শ্রমিক নেতারা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শ্রমিক নেতারা নিজেদের দায় স্বীকার করেন না। তারা এই ব্যবস্থার জন্য দায়ী করেন শিল্প মালিকদের আর বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সরকারকে। এই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অটুট রাখার অন্যতম উপাদান হলো এই শ্রমিক নেতারা। অথচ এরাই বুর্জোয়া শিল্পপতিদের গালি দেয়। তাছাড়া দেখা যায়, মালিক এবং শ্রমিকদের সম্পর্ক তিক্ততায় মধ্যস্থতা করতে  এসে ভাগ্যের পরির্বতন করে নেয় শ্রমিক নেতারা। কৃষি শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, বিভিন্ন ধরনের শিল্প, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নানা ধরনের পরিবহনের শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শ্রমিক সংগঠন। এই গড়ে উঠা শ্রমিক সংগঠনগুলো ডান বামসহ নানা রাজনৈতিক আদর্শের মদদপুষ্ট। এই অসংখ্য সংগঠন আদৌ কি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সহায়ক হিসাবে গড়ে উঠতে পেরেছে। বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলনে গামের্ন্ট সেক্টরের শ্রমিক আন্দোলন হলো বড় ইস্যু। গার্মেন্ট সেক্টরের শ্রমিকের নায্যতা আদায় করার লক্ষে বাম ডান দক্ষিণ মধ্যপন্থি মতাদর্শের গড়ে উঠেছে নানা গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন। এই শ্রমিক প্লাটফরমগুলিই শ্রমিকদের নায্যতা আদায়ের অন্তরায় বলে মনে হয়। বামপন্থি অনেকেই এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা আদৌ গার্মেন্ট শ্রমিক নন। এই কথা বললে তারা উদাহরণ হিসাবে বলবেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এবং সোভিয়েতের বিপ্লবের নেতৃত্বের কথা। বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতির সাথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও সোভিয়েট রাশিয়ার সমাজ সংস্কৃতি বা জীবন-প্রণালির মিল নেই। কিছু বিদেশি তাত্বিক বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়, বিপ্লবী হওয়া যায় না। বিপ্লবী হতে হলে সমাজ সংস্কৃতির সম্পর্ক আগে জানতে হবে। তাই বিদেশি বিপ্লবী আঙ্গিকে বাংলাদেশে শ্রমিক নায্যতা আদায়ের আন্দোলন ভাবাটা উচিত নয়। আশির দশকে এ দেশের পাটকলগুলিতে শ্রমিক আন্দোলন এবং শ্রমিক সংগঠন বেশ জোরেশোরে গড়ে উঠেছিল। তারপর দেখা গেল, শ্রমিকরা তো নায্যতা পেলই না উপরন্ত মিলগুলি লোকসানের ফলে লেফ ঘোষিত হয়ে গেল, আর হাজার হাজার শ্রমিক হয়ে পড়ল কর্মহীন। আশির দশকে শ্রমিক নেতারা মিল গেটে এসে বসতেন, শ্রমিকদের নায্যতা আদায়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা নিতেনÑ তারা ফুল টাইমার হিসাবে কাজ করতেন রাজনৈতিক সংগঠনে। আর শ্রমিকের দেয়া চাঁদার টাকায় বেনসন গোল্ডফ্লেক ফুঁকতেন আর শ্রমিকরা সেই সময় পেত না পাতার বিড়ি। লেফ ঘোষিত হওয়ার পর শ্রমিকরা অনাহারে দিন কাটালেন আর রাজনৈতিক নির্দেশে নেতারা নিয়োজিত হয়ে গেলেন অন্য সেক্টরের শ্রমিক আন্দোলন গড়তে। শ্রমিক খায় বিড়ি নেতারা শ্রমিকের টাকায় খায় গোল্ড লিফ এই নেতাদের আন্দোলনের মাধ্যমে আদৌ কি এদেশে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে? এদেশে এমন নজির রয়েছে শ্রমিক থেকে পার্টি নেতা বনে গিয়ে পার্টির সম্পদসহ নানা ভাবে প্রতারাণা করে অর্থ হাতিয়ে নেয়। ১৪ দলকে বুর্জোয়া বলে গালাগাল দেয় আর ১৪ দলের কাছ থেকে নির্বাচন করে দেয়ার নাম করে টাকা নেয়। এই বৈসাদৃশতাধারীদের দিয়ে কোন দিন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন প্রতিষ্ঠা পাবে না।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের এক বাম শ্রমিক নেতা পরিবহন শ্রমিকদের ভাগ্য পরির্বতন করে দেবেন বলে আন্দোলন করেন। আর এই সেক্টর থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে নিজে বিত্ত বৈভবের মালিক বনে গেছেন আর পরিবহনের প্রকৃত শ্রমিকরা এখনও নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। যাক এ রকম বহু উদাহরণ দেয়া যাবে। তবে এই ধরনের নেতাদের লোভাতুর দৃষ্টির করাল গ্রাসে পড়েছে গার্মেন্টস সেক্টর। বর্তমানে বাংলাদেশে যে কোন শিল্পের চেয়ে অধিকতর অগ্রসরমান হলো পোশাক শিল্প। এই শিল্পে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া এখানে কাচা পয়সারও গন্ধ পেয়েছেন এই কথিত শ্রমিক নেতারা। তাই সংঘবদ্ধভাবে নামতে শুরু করছেন এই পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ভাগ্য পরির্বতন করার আন্দোলনে। গত ডিসেম্বরের দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় একটি বিক্ষোভ মিছিলের ছবি দেখলাম। মিছিল করার উদ্যেশ্য হলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং আটক শ্রমিকের মুক্তির দাবি। এই মিছিলের অগ্রভাগের বেশ কয়েজনকে দেখা গেল, যারা ফুলটাইম রাজনীতিতে নিয়োজিত। তারা রাজনীতি করার বিনিময়ে মাসিক সম্মানি পান তা দিয়ে তাদের সংসার চলে। গতর খাটিয়ে অর্থ উপার্জন করতে পারে না তারা। যারা অলসভাবে পরজীবী হয়ে জীবন নির্বাহ করে তারা শ্রমের অধিকারের মর্মটা কি উপলব্ধি করতে পারবে? আর এদের আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হবে?  নিজের শ্রমটা বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে  যারা পারছে না এ ধরনের বেতনভুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের আন্দোলনে কি গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকের নায্যতা আসবে?  তা দেখার বিষয়। দেশের গার্মেন্টস সেক্টরের মজরি সবচেয়ে কম আর দৈনিক কর্মঘণ্টা বেশি আর এই সেক্টরের অধিকাংশ শ্রমিক নারী। এই সুযোগটা যেমন মালিক পক্ষ নিচ্ছে তেমনি ওই বেতনভুক রাজনীতিকরাও নিচ্ছেন।  নায্য মজুরি পাইয়ে দেয়ার নাম করে শ্রমিকদেরকে আন্দোলনে এই নেতারা মাঠে নামান। শ্রমিকরা যখন আন্দোলনে মাঠে নামে নেতারা শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়। অন্যদিকে  মালিকদেরকে মধ্যস্থতা করিয়ে দেয়ার নামেও অর্থ আয় করার পথ বের করেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং নৃশংস দুর্ঘটনা ঘটেছে পোশাক  শিল্পে। সবচেয়ে নি¤œতম মজুরির কর্মক্ষেত্র হলো পোশাক কারখানা। কিন্তু  বিগত কয়েক বছরের সবচেয়ে বেশি আন্দোলন হয়েছে এই সেক্টরে। তারপর দেখা যায়, পোশাক শিল্পের শ্রমিকেরা নায্যতা তো পায়নি। উপরন্ত সৃষ্টি হয়েছে আরো বেশি বৈষম্যর। তাহলে এই নেতারা কী করছেন?
দেশের পোশাক শিল্প নিয়ে দেশি বিদেশি চক্রান্তের কথা শুনা যায়। আর্ন্তজাতিকভাবে নাকি অনেকেই চাচ্ছেন এদেশের পোশাক শিল্পটা ধ্বংস হয়ে যাক। এই ধরনের কথাগুলি পোশাক শিল্পের মালিক এবং যখন যারা সরকারের থাকেন তারা বলেন। তবে এ কথা গুলির সত্যতা যাই থাকুক দেশের জনসম্পদের একটা বিরাট অংশ এই শিল্পের সাথে জড়িত। তাই নানা অজুহাত দেখিয়ে দেশের বিরাট অংশের শ্রমজীবী মানুষের শ্রমকে কম মজুরি দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত না। সরকার রাষ্ট্রীয় দফতরগুলিতে নিয়োজিত কর্মীদের নূন্যতম মাসিক মূল বেতন নির্ধারণ করেছেন  ৮ হাজার ২ শত টাকা। একজন সরকারি সর্বনি¤œ স্তরের কর্মী সব ভাতাদি মিলিয়ে মাসিক বেতন পান প্রায় ১৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে একজন পোশাক শ্রমিকের সর্বনি¤œ সাকুল্যে বেতন ৫ হাজার ৩শ টাকা। যা সরকারি কর্মীর বেতনের এক তৃতীয়াংশ। বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের বড় অংশের যোগানদাতা পোশাক শিল্প। সরকার তার জন্য পোশাক শিল্প মালিকদের নানা সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন। তবে বাস্তÍবতা হলো যাদের শ্রমের বিনিময়ে এই বৈদেশিক আয়ের যোগানটা আসছে তারা কিন্তু সরকারি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না। যদি শ্রমিকদের বেতন বাড়ালে পড়ংঃ ড়ভ ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ  বাড়ে আর এই কারণে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পোশাক শিল্প টিকে থাকাটা কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারের উচিত প্রণোদনা সরাসরি শ্রমিকদের দেয়া। বর্তমান সরকার হতদরিদ্র মানুষের মাঝে ১০ টাকা কেজি চাল দেয়ার ব্যবস্থা চালু করেছেন। এ ধরনের ব্যবস্থা পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বেলায় নেয়া উচিত। প্রকৃত পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের পরিবার পিছু মাসে যে চাল লাগে সরকার রেশনিং এর মাধ্যমে ১০ টাকা মূল্যে তা প্রদানের ব্যবস্থা করলে এই শিল্পের  অসন্তোষ অনেকটা লাঘব হবে। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ভাড়া থাকা বাড়িগুলির ভাড়া মালিক বাড়াতে পারবে না এ ধরনের পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করবেন। এটা কি আদৌ যুক্তিসংগত বিষয় হবে কারণ মালিকদের সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কতগুলি স্থানে পোশাক শিল্প গড়ে উঠেছে তাই সরকারি ভাবে ওই সব স্থানে আবাসিক ভবন নির্মাণ করা- যাতে করে এই শ্রমিকরা স্বল্পমূল্যে বাসস্থান পায়। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের নায্যতা আদায়ের নামে চলে নানা ধরনের রাজনীতি। এই রাজনীতির কবলে পড়ে পোশাক শিল্প যেন ধ্বংস না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। তাই প্রতিটি পোশাক শিল্প কারখানায় শ্রমিক সংসদ গড়ে তোলা দরকার। যে পোশাক কারখানায় এ ধরনের সংসদ হবে ওই  সংসদের প্রতিনিধিরা ওই কারাখার শ্রমিক কর্তৃক ভোটে নির্বাচিত হবেন। নির্দিষ্ট মেয়াদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আর নির্বাচনে প্রতিনিধি প্রার্থী হিসাবে প্রকৃত শ্রমিকরাই অংশ নেবেনÑ কোন শ্রমিক নামধারীরা এই নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য প্রার্থী হতে  পারবে না। আর এই নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধিরা তাদের বেতন ভাতাসহ নানা সুযোগ সুবিধা নিয়ে মালিক এবং সরকারের সাথে আলোচনা করবেন। পোশাক শিল্পে এই ধরনের নিয়ম চালু করার দরকার। বাইরের ভাড়াটিয়া রাজনৈতিক বা এনজিওর কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকৃত পোশাক শ্রমিকদের নায্যতা প্রতিষ্ঠা পাবে না।
লেখক: কলামিস্ট