শ্রীলঙ্কার সংকট অর্থনৈতিক না অন্যকিছু?

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২২, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

মজিবুর রহমান:


স্বীকার করতেই হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে আমাদের প্রদেয় ছয়দফা দাবি পাকিস্তানিদের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যেমনটি করে তার পূর্বে কাঁপিয়ে দিয়েছিল আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষার দাবি। সে সকলের মজেজার প্রেক্ষিতে আমরা ১৯৭১ সালে আমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিলাম। বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেই তবে ঘরে ফিরেছে। গোটা বিশ্বকে আমরা জানিয়ে দিয়েছি বাঙালি জাতি বীরের জাতি। বাঙালি যা বলে তা করেই ছাড়ে। আমরা পাকিস্তানিদের নিকট শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই তুলে ধরিনি, ধরেছি আমাদের ভাষাগত, সংস্কৃতিগত এবং রাজনৈতিক সংকটও। অর্থাৎ ধাপে ধাপে আমরা বৈষম্যমূলক নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি এবং বিশ্ববাসীর কাছে আমরা নিজেদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে দেইনি।
লক্ষণীয় যে, বর্তমানে শ্রীলঙ্কা একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। তাদের সংকট কি আলাদা কিছু ? শুধ্ইু কি অর্থনৈতিক, শুধুই কি রাজনৈতিক, নাকি অন্যকিছু? এগুলো গবেষণার বিষয় বটে। তবুও আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। দৃশ্যত অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ার কারণে আন্দোলনের মধ্যদিয়ে দেশটির সরকার বদল হয়েছে। আন্দোলনকারীরা সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়াকে যেমনটি চায়নি তেমিন নতুন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহেকেও চায়নি। উভয়কে না চাওয়ার পেছনে বিশেষ কারণ মূলত রাজনীতি ও সমাজনীতির গভীরে প্রোথিত বলে মনে হয়। রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলো এই সংকট মোকাবেলাই কোনো পথ দেখাতে পারেনি। শ্রীলঙ্কাবাসীর মনের ভাষাও তাদের বোধগম্য হয়নি কিংবা হলেও তা এড়িয়ে গেছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট আসাতেই শিগগিরই সৃষ্ট পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। শ্রীলঙ্কার এই সংকটকে অনেকেই গোতাবায়ার অপশাসন ও কর্তৃত্ববাদের ফল হিসেবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন। অথচ এই অপশাসন ও কর্তৃত্ববাদের উৎস হিসেবে দেশটির স্বাধীনতার পর ধারাবাহিকভাবে জাতিতান্ত্রিক হয়ে ওঠা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিদের রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা কুক্ষিগত করা এবং সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করাই মূল কারণ। তাছাড়াও তাদের বৌদ্ধ ধর্মকে শ্রেষ্ঠত্বে স্থান দিয়েছে। তাদের এ দাবী ও শ্রেষ্ঠত্ব তাদের পতাকাতেও লক্ষণীয়। এ সম্পর্কে ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভারসিটির অধ্যাপক ‘নিল ডেভোটা’ ফরেন ফলিসি সাময়িকীতে বলেন, শ্রীলঙ্কার পতাকায় তলোয়ার হাতে সিংহ সংখ্যাগুরু সিংহলিদের সাহসের প্রতীক এবং তার মুখোমুখি থাকা ফিতাগুলো হচ্ছে সংখ্যালঘুদের প্রতীক। অধ্যাপক ডেভোটা আরো বলেন, এই ফিতাগুলোই সংখ্যালঘুদের অবদমিত করে রাখার প্রমাণ বহন করে।
১৯৪৮ সালে দেশটির স্বাধীনতার পর ১৯৫৬ সালেই প্রেসিডেন্ট এস.ডি.আর.ডি বন্দরনায়েকে সিংহলীদের ভাষাকে একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তামিলদের ৩০ থেকে ৫ শতাংশে এবং সেনাবাহিনীতে ৫ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে দেয়া হয় এবং আরো দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে তামিলদের জন্য অধিক নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। এভাবে রাষ্ট্রীয় সুবিধার ক্ষেত্রে ১৫ শাতাংশ তামিল এবং ১০ শাতংশ মুসলমানদের নানাভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তামিল তরুণেরা বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে ওঠে বলে প্রতীয়মান হয়। তামিলসহ অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলায় এম.পি, সচিব, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষাবিদদের হত্যার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৩ সালে এক হামলায় নিহত হন তখনকার প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসা। এই সংখ্যালঘু বিচ্ছিন্নতাবাদকে দমনেই মূলত রাজাপক্ষের পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভাই গোতাবায়াকে দেশে ফিরিয়ে এনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী করেন। এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা গোতাবায়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর ক্ষমতা পেয়ে বিদ্রোহী দমনে আবির্ভূত হন।
রাজাপক্ষে ভ্রাতাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ২০১৫ সালে মাইথ্রিপালা সিরিসেনা নির্বাচনে জয়ী হন। জয়ী হয়ে তিনি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কমানো এবং পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগের হারানো ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দুর্নীতি দমনে হাত দেন। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাউত্তর সরকারের পরিণতির মতো তাদের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করে মাহিন্দা রাজাপক্ষকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়। ২০১৯ সালে গোতাবায়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক গতিধারা ভিন্নতা পেতে থাকে।
শ্রীলঙ্কার এই নেতিবাচক বিভাজন অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক গতিপথকে বিদ্রোহীদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা ধরেই নেই বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকৃষ্ট দেশে অনেকাংশেই অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বিরাজমান। সেটি কোভিট-১৯ এবং জাতিগত বিরোধের কারণে বলতেই হয় মুখ থুবড়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে প্রায়। এছাড়া গোতায়াবার অদূরদর্শী কর রেয়াত, রাসায়নিক সার নিশিদ্ধকরণ, উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেশামাল ঋণ গ্রহণ- নানাবিধ কারণে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি আজকের অবস্থানে পতিত হয়েছে।
তাদের এই নেতিবাচক পরিণতিতে মূলত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং জাতিগত বিরোধ বৈষম্যের অবসান ঘটলেই শৃঙ্খলা তার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ অভিমত ব্যক্ত করেন।
লেখক .: শিক্ষাবিদ ও প্রবন্ধকার